এক চক্রই পাঁচ হাজার জন্মসনদ বানিয়েছে

এক চক্রই পাঁচ হাজার জন্মসনদ বানিয়েছে

ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ খুলে জন্মনিবন্ধন তৈরি করে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেয় একটি চক্র। মাঠ পর্যায়েও থাকে তাদের একাধিক কর্মী। যাদের জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হয়, তারাই এ চক্রের গ্রাহক। চক্রটি টাকার বিনিময়ে সরকার নির্ধারিত ওয়েবসাইটে ওই ব্যক্তির ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে প্রাথমিক নিবন্ধন করে। এরপর এসব তথ্য চক্রের মূল হোতার কাছে পাঠানো হয়। তিনি অবৈধভাবে জন্মনিবন্ধন সার্ভারে প্রবেশ করে জাল জন্মসনদ প্রস্তুত করে তা আবার চক্রের সদস্যদের কাছে পাঠান।

গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরিতে জালিয়াত চক্রের কাজের বর্ণনা দেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন। পুলিশ বলছে, সারা দেশে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরির এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে আরও একাধিক গ্রুপ।

এদিকে জাল জন্মনিবন্ধন বানানোর ঘটনায় এবার মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল চসিকের সেই পাঁচটি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেছে দুদকের এনফোর্স টিম।

এর আগে চট্টগ্রামে জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। গ্রেপ্তাররা হলো জহির আলম, মোস্তাকিম, দেলোয়ার হোসাইন সাইমন ও আব্দুর রহমান। তাদের কাছ থেকে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত চারটি সিপিইউ, তিনটি মনিটর, একটি স্ক্যানার ও প্রিন্টার, দুটি প্রিন্টার এবং চারটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ মঞ্জুর মোরশেদ বলেন, একেকটি চক্রে সদস্য সংখ্যা ৩০ থেকে ১০০ জন। গ্রেপ্তার সদস্যদের চক্রটি ৫ হাজারের বেশি জন্মসনদ তৈরি করেছে। এতে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গার জন্মনিবন্ধন থাকতে পারে বলে ধারণা করছি। তাদের কাছ থেকে জব্দ ডিভাইসে বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। প্রতিটি জন্মনিবন্ধন তৈরি করতে তারা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা নেয়। তবে ঘটনায় জড়িত চক্রের মূল হোতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, জন্মনিবন্ধন তৈরির সিস্টেমটি মেনিপুলেট করে চক্রটি জাল জন্মনিবন্ধন তৈরি করে। চক্রের কিছু সদস্যকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছি। জন্মনিবন্ধন তৈরির ঘটনাটি ওয়েবসাইট হ্যাক করে করা হচ্ছে নাকি পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে করছে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। তদন্ত করে দেখছি। জালিয়াতির ঘটনায় নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ সহযোগিতা করছেন কিনা, এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, তারা যার কাছে নিবন্ধনের জন্য তথ্য পাঠাত, তিনি জন্মনিবন্ধনের সার্ভারে প্রবেশ করতে পারেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তবে সিটি করপোরেশনের কারও জড়িত থাকার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

গত ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটির ৩৮ নম্বর বন্দর ওয়ার্ডে ৪০টি, ৯ জানুয়ারি ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১০টি ও ২১ জানুয়ারি ৪০ নম্বর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অফিসের সার্ভারে ৮৪টিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে অর্ধশতাধিক ভুয়া জন্মনিবন্ধনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে সাধারণ ডায়েরি করলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে জন্মনিবন্ধন জালিয়াতি কার্যক্রমে জড়িত একাধিক চক্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, ভুয়া জন্মনিবন্ধনের ঘটনায় এর আগে দায়ের করা দুটি মামলার তদন্ত করছে সংস্থাটি।

তদন্তে দুদক জাল জন্মনিবন্ধন বানানোর ঘটনায় এবার মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল চসিকের সেই পাঁচটি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেছে দুদকের এনফোর্স টিম। দুদক চট্টগ্রাম-১-এর উপপরিচালক নাজমুস সাদাত বলেন, ‘যেসব ওয়ার্ডে আইডি হ্যাক করে জন্মনিবন্ধন বানিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোতে পরিদর্শন করেছে দুদকের টিম।’ দুদক চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক ফয়সাল কাদের কালবেলাকে বলেন, ‘বিস্তারিত জানতে আরও তদন্তের প্রয়োজন। আজ (গতকাল) বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠিয়েছি। এরপর অফিসিয়ালি যে নির্দেশনা আসবে, সেভাবেই এগোব আমরা।’

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com