নির্বাচনকালে সরকারে থাকতে পারবেন বিরোধী এমপিরা, বিএনপি নয়

শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা

নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি অনুসরণ করি। ব্রিটেনে কীভাবে ইলেকশন হয়, তারা কীভাবে করে, আমরা সেভাবেই করব। পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যারা আছেন, তাদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে, নির্বাচনকালীন সরকারে আসতে চান, আমরা নিতে রাজি আছি। এটুকু উদারতা আমাদের আছে, আগেও আমরা নিয়েছি। গতকাল সোমবার সদ্যসমাপ্ত জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সরকারি সফর নিয়ে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে আমি খালেদা জিয়াকেও নির্বাচনকালীন সরকারে আসার আহ্বান করেছিলাম। তারা তো আসেনি। আর এখন তো তারা সংসদে নেই। কাজে ওটা নিয়ে চিন্তারও কিছু নেই। সংলাপের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা (বিএনপি ও সমমনা দল) যত পারুক আন্দোলন করুক, তাদের কেন ডাকতে যাব? আমি বলে দিয়েছি, আন্দোলন করুক কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু জ্বালাও-পোড়াও যদি করতে যায়, মানুষকে যদি আবারও পোড়ায়, তাহলে কাউকে ছাড়ব না। মানুষের ক্ষতি আর করতে দেব না। তিনি বলেন, তারা মাইক লাগিয়ে আন্দোলন করেই যাচ্ছে।

সরকার হটাবে। আমরা তো তাদের কিছু বলছি না। আমরা যখন অপজিশনে ছিলাম আমাদের কি নামতে দিয়েছে? গ্রেনেড হামলা করে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। আমাদের ২১ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের ২০ দলীয় ঐক্যজোট সিট পেয়েছে ৩০টি। তারা আবার বড় বড় কথা বলে। আর দালালি... কার পয়সায় আন্দোলন করছে, কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে? হাজার হাজার কোটি টাকা তো লুট করে নিয়েই গেছে, আর কাদের মদদে করছে সেটা একটু খোঁজ নেন। এত লোক নিয়ে আসে আর প্রতিদিন মাইক লাগিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে, এগুলো তো বিনা পয়সায় হচ্ছে না।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো ভয়ে নেই। নির্বাচন আসছে বলে ভয় পাব, কেন ভয় পাব? আমি জনগণের জন্য কাজ করেছি, জনগণ যদি ভোট দেয় আছি, না দিলে নাই।

বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রিজার্ভ এখন যে পর্যায়ে আছে, তাতে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। যদি কোনো আপৎকালীন সময় হয়, খাদ্য কিনতে হয় বা ঘাটতি দেখা দেয়, সেই খাদ্য কেনার মতো, অর্থাৎ তিন মাসের খাদ্য কেনার মতো ডলারটা যেন আমাদের হাতে থাকে। ওইটা নিয়েই রিজার্ভের জন্য চিন্তা। এ ছাড়া রিজার্ভের এত চিন্তা নেই।

তিনি বলেন, জাতির পিতা যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে শুরু করেন, তখন তো এক পয়সাও রিজার্ভ ছিল না। আমরা কি চলিনি, আমরা কি এগোতে পারিনি? যখন বিএনপি ক্ষমতায়, তখন রিজার্ভ কত ছিল? ০.৭৪৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার, মানে এক বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম।

যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি থাকে জানিয়ে রসিকতা করে শেখ হাসিনা বলেন, এমনই প্রস্তুতি নিলাম যে ঘূর্ণিঝড় চলে গেল, আঘাত হানতেই সাহস পেল না। তবে আবার আসবে। একটা নিয়ম আছে, একটার পরপরই আরেকটা আসে, সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের সময় বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও তারা প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সে সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান গলফ খেলায় ব্যস্ত ছিলেন।

নিষেধাজ্ঞা দেওয়া দেশের কাছ থেকে কোনোকিছু কেনাকাটা না করার বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে দেওয়া নির্দেশনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কী কারণে স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) দেবে? যাদের দিয়ে (র্যাব) আমরা সন্ত্রাস দমন করলাম, জঙ্গিবাদ দমন করলাম। হলি আর্টিসানের পর বাংলাদেশে আর তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। কারণ, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গোয়েন্দা নজরদারি এবং আরও কিছু ভালো কাজ করেছে। যার ফলে আর কিছু তেমন হয়নি। এর পরও স্যাংশন কেন?

তিনি আরও বলেন, আমাদের দুশ্চিন্তার কী আছে? কথা নাই, বার্তা নাই, স্যাংশনের ভয় দেখাবে! আমরা ভয় পেয়ে বসে থাকব কেন? যারা আমাদের সপ্তম নৌবহরের ভয় দেখিয়েছিল, আমরা সেটি পার করে বিজয় অর্জন করেছি। সেটি ভুললে চলবে না, আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, মহার্ঘভাতা (সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য) বলে কিছু নেই। মূল্যস্ফীতি যত বাড়বে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা একটি নির্দিষ্ট হারে বেতন বাড়াই। তা ছাড়া আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধাও দিচ্ছি। বৈশাখী ভাতা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ভাতা, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার লোন। মহার্ঘভাতা দেওয়ার কোনো প্ল্যান নেই। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতার কথা হিসাব করে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো, মহার্ঘভাতা বা অন্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সরকারের দেখভালের বিষয় নয়। এটি বেসরকারি খাতের বিষয়।

বিদ্যুতের ভর্তুকির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশে এমন ভর্তুকি দেয় না। বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়ায় কে বেশি লাভ পায়? যে সবচেয়ে বেশি এয়ারকন্ডিশন চালায় তার লাভ হয়। গরিব মানুষের তো লাভ হয় না। আসলে লাভবান হচ্ছেন বিত্তশালীরা। সব জায়গায় জ্বালানি তেল, পরিবহন এত বেড়েছে। এটা টানা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। যে দামে উৎপাদন হবে সেই দামে কিনতে হবে। যে যতটুকু পারবেন ততটুকু কিনবেন। সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে এসব জায়গায় ভর্তুকি দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

আইএমএফের লোন নিয়ে সমালোচকদের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সংকটের এ সময় বাজেট যে করতে পারছি এজন্য ধন্যবাদ জানান। বাজেটের প্রস্তুতি ঠিকঠাক করে দিয়েছি। কোনো অনাথ এসে কী বলছে সেই দায়িত্ব তো আমরা নেব না। আইএমএফ লোন তাদেরই দেয় যাদের ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এত অনাথ হয়নি। ঋণ ফেরত দেওয়ার মতো সামর্থ্য আছে বলেই আমরা নিয়েছি।

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হবে বলে জানিয়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের আগামী নির্বাচনের ইশতেহার হবে স্মার্ট বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে সংস্থাটির প্রধানের কাছে পদ্মা সেতুর একটি চিত্রকর্ম (পেইন্টিং) উপহার দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেইন্টিংটা আমরা এজন্য নিয়ে গেছি যে, আমাদের দেশে খুব ভালো পেইন্টার আছে, তারা খুব চমৎকার পেইন্টিং করতে পারেন, সেটা জানানোর জন্য যে, বিশ্বের কারও যদি পেইন্টিং প্রয়োজন হয়, আমাদের কাছে চাইতে পারবেন। আর পেইন্টিংয়ের বিষয়বস্তুটা হচ্ছে— বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটা হলো—পদ্মা সেতু। এটাই, আর কিছু না সেখানে।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.
logo
kalbela.com