হুজুগে ধ্বংস, হুজুগে বাঁচা

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

সেদিন বাজারে একজন পরিচিত ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শুনেছেন এবছর ২১শে ডিসেম্বর নাকি পৃথিবী ধ্বংস হবে ?’

কদিন থেকেই এই প্রশ্নটা বিভিন্ন জায়গায় শুনতে পাচ্ছি । আসলে গত এক বছর থেকেই ত এ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি । কিন্তু পৃথিবীর সৃষ্টি এবং ধ্বংস সম্বন্ধে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত । অগত্যা ‘হতে পারে’ বলে কাটিয়ে যেতে চাইছি এমন সময় পাশ থেকে আর একজন মুখচেনা মানুষ বলে উঠলেন, ‘তা সে যাই হোক না মশাই, মাংস কি তা বলে পঞ্চাশ টাকায় পাওয়া যাবে ?’ এরপর শেষ অবধি এই গুরুত্বপুর্ণ আলোচনা কতদূর এগিয়েছিল আমি ঠিক বলতে পারব না । তবে আমার মনে তখন থেকেই কিছু কথা ঘোরপাক খাচ্ছিল । আপনাদের বরং সেই কথাগুলোই বলি ।

কথায় কথায় বাঙালীকে দোষারোপ করে ত লাভ নেই, বেঁচে থাকতে গেলে আমাদের সকলেরই কিছু হুজুগ লাগে । মানে যেটা নিয়ে একটু টেনশন করা যায়, একটু স্বপ্ন দেখা যায়, একটু তর্ক করা যায় এই আর কি । আর যদি সেই হুজুগটা আমদের পরিবার, পাড়া, অফিস বা রাজ্য ছাড়িয়ে লোকপাল বিল বা ওয়ার্ল্ড কাপের মত দেশব্যাপী হয় তাহলে ত কথাই নেই । কিন্তু এইবারে এমন একটা বিষয় পাওয়া গেছে যা কিনা একেবারে আন্তর্জাতিক মানের । মানে হ্যারি থেকে হরি, ম্যাডোনা থেকে মদ্‌নার মা, সকলেই একইরকম এবং খুবই গভীরভাবে ‘ইনভল্‌ভড্‌’ এই একটি ঘটনার সাথে । নিন্দুকে বলবে সে ত ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা ‘রিসেশন’ ও তাই । কেউ কেউ হয়ত মিন মিন করে ‘বিশ্বভ্রাতৃত্ব’ বা ‘বিশ্বশান্তি’-র কথা বলতে পারে । তবে ওগুলোকে আঁতেলবাজি বলে দাবড়ে দেওয়া যাবে । আসলে এই সকল ব্যাপার-স্যাপারগুলো হয় বড্ড রসহীন অথবা ‘ব্যাকডেটেড’ । সেদিক থেকে পৃথিবী ধ্বংস হবার ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর । বাঙালীর আন্তর্জাতিক হওয়া এবার আটকায় কে ! ‘সাস্‌পেন্‌স’, বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, ভূগোল, ধর্ম, জ্যোতিষ সব একেবারে মিলেমিশে জমে ক্ষীর । আসলে কি বলুন ত, সেই ছোটবেলা থেকে ঐসকল বিশ্বভ্রাতৃত্ব, বিশ্বশান্তি রচনা লিখে লিখে ‘যাস্ট্‌’ হেজে গেছি । আর ইদানিং ‘গ্লোবাল-ওয়ার্মিং’ আর ‘’রিসেশন’ এসব শুনে শুনে মাঝে মাঝে বউ-ছেলের নামও ভুলে যাই । আর ঐ ব্যাপারগুলো কেমন যেন একটা বিমূর্ত আধুনিক আর্ট টাইপের । অথচ ফুটপাথ থেকে সস্তায় ডি.ভি.ডি. কিনে যেদিন ‘২০১২’ সিনেমাটা দেখেছি তারপর থেকে কতবার যে স্বপ্নে, জ্যামে, ফ্লাইওভারে ছবিগুলো ভেসে উঠেছে তার কোন হিসেব-কিতেব নেই ।

এ নিয়ে আমি একটা নতুন দর্শন আমদানি করেছি । প্রেমিকা ল্যাং মেরেছে ? ট্যাক্স দিতে গিয়ে বেতন শেষ ? ছেলের কলেজে ভর্তির ডোনেশন দিতে গিয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স খালি ? মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না ? বস্‌ গালি দিয়েছে ? সহকর্মী টিটকিরি দিয়েছে ? ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে ? পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হচ্ছে না ? সচিনের সেঞ্চুরি হচ্ছে না ? চিন্তার কী আছে ! পৃথিবীই ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে । অনেক ভেবে দেখলাম, ঘষে ঘষে টিকে বেঁচে থাকা অনেক হয়েছে । আর নয় । লোককে খুশি করতে অনেক অনেক কিছু করেছি । আর নয় । আমি তাই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছি পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছেই হচ্ছে । আমার হলদে জীবনের হাজারো সমস্যা থেকে ছুটি নিয়ে আমি তাই এবার নতুন করে বাঁচব । মান-অভিমান, রাগারাগি, জেদ, হিংসা, ঈর্ষা এসব করে যাদেরকে দূরে সরিয়ে রেখেছি এবার ক্ষমা চেয়ে নেব সবার কাছে । মোড়ের মাথার পাগলটাকে বিস্কুট কিনে দেব । যে ছেলেটাকে শাসন করতে করতে ভালবাসতে ভুলে গেছি তাকে একটা ছবি আঁকার ভাল ক্যানভাস কিনে দেব । রিকশাওয়ালাটার সাথে খ্যাঁটখ্যাঁট না করে, তুই-তোকারি না করে একটু না হয় ভাল ব্যাবহার করব । রাস্তায় আর সিগারেটের খাপ ফেলব না । অন্যায় দেখে আমিও প্রতিবাদ করব । ক্যাণ্টিনের ছেলেটাকে সই করতে শিখিয়ে দেব । বাসে বয়স্কদের জায়গা ছেড়ে দেব । অযথা নেড়ি কুকুরটাকে পাথর ছুঁড়ে মারব না । আর আমার সেই আবেগমাখানো পুরোন খাতাটা খুলে আবার একবার কবিতা লিখতে বসব । বাজারের সেই লোকটা ঠিকই বলেছিল । মাংস তবু পঞ্চাশ টাকায় পাওয়া যাবে না । কিন্তু লটারি কাটার টাকাটা জমিয়ে অথবা ছদিন নিরামিষ খেয়েও রোববার আমি মাংস কিনেই ফিরব । আমার কবিতা, আমার খাওয়া-দাওয়া, আমার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে চায়ের আড্ডা এসব নিয়েই আমার বাঙালী জীবন আমি দারূণভাবে বাঁচব । আর যদি সত্যিই পৃথিবী বেঁচে থাকে ২১ তারিখের পরেও তবে গোপনে হেসে বলব, “ধন্যবাদ হুজুগ, তুমি আমায় নতুন করে বাঁচতে শেখালে ।”


ভোট: 
Average: 10 (1 vote)

মন্তব্যসমূহ

Oniket Rahi এর ছবি

প্রেমিকা ল্যাং মেরেছে ? ট্যাক্স দিতে গিয়ে বেতন শেষ ? ছেলের কলেজে ভর্তির ডোনেশন দিতে গিয়ে ব্যাংক ব্যালেন্স খালি ? মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না ? বস্‌ গালি দিয়েছে ? সহকর্মী টিটকিরি দিয়েছে ? ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে ? পশ্চিমবঙ্গে শিল্প হচ্ছে না ? সচিনের সেঞ্চুরি হচ্ছে না ? চিন্তার কী আছে ! পৃথিবীই ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ।

চরম বলেছেন ভাই।। Laughing
আসলেই তো পৃথিবীই ত ধ্বংসই হচ্ছে । LaughingLaughingTongue OutTongue OutTongue Out

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ অনিকেত ভাই ।
ভাল থাকবেন । Smile 

আকঞ্জী এর ছবি

আমার কবিতা, আমার খাওয়া-দাওয়া, আমার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে চায়ের আড্ডা এসব নিয়েই আমার বাঙালী জীবন আমি দারূণভাবে বাঁচব । আর যদি সত্যিই পৃথিবী বেঁচে থাকে ২১ তারিখের পরেও তবে গোপনে হেসে বলব, “ধন্যবাদ হুজুগ, তুমি আমায় নতুন করে বাঁচতে শেখালে ।”

খুব ভালো লাগলো। Smile


প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

অনেক ধন্যবাদ দাদা ।
খুব ভাল থাকবেন ।
 

তাপস শর্মা এর ছবি

ভালো লিখেছ।

 

তবে আরেকটু বড় করতে পারতে। খুব তাড়াতাড়ি শেষ করে দিলে।

প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

ঠিকই বলেছ তাপসদা ।
আসলে আমি ব্যাপারটাকে 'কম্প্যাক্ট' রাখতে গিয়ে একটু ছোট করে ফেলেছি । Tongue Out

অনেক ধন্যবাদ পড়ার ও মন্তব্য করার জন্যে । 

Sayak Chakraborty (সায়ক) এর ছবি
বাহ,বাস্তব যখন আমাদের আঁতলামোর আঁতুড়ঘরে বসে পায়ের উপর পা তুলে বিড়ি টানছিল তখন আপনি সেটাকে মাটিতে শুধু না,একদম চোখের সামনে নামিয়ে এনেছেন। কিছু কিছু প্রসঙ্গ আমাদের আটপৌরে বাঙ্গালী জাতির মধ্যে এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। ভালো লেগেছে তবে কোথাও যেন একটা চাহিদা না মেটার অভাব বোধ করলাম। হয়ত সেটা কলেবরের জন্য। যাই হোক ভালো হয়েছে। 
প্রদীপ্তময় সাহা এর ছবি

ধন্যবাদ আপনাকে ।
দেখা যাক ভবিষ্যতে বড় কলেবরে কিছু লিখতে পারি কিনা ।