পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া

Nuzmus Sadat Sompod এর ছবি

শীতকাল শেষ হয়ে যাচ্ছে। হাতটা ভীষণ অসুবিধা শুরু করে দিয়েছে। এতদিন হাত রাখতাম হয় প্যান্টের পকেটে, না হয় জ্যাকেটের পকেটে। হাতটা বয়ে বেড়ানোই এখন অসুবিধা হয়ে  দাঁড়িয়েছে।
হাটার সময় হাত একটু নড়াচড়া করবেই কিংবা পেছনে এক হাতের সাথে আর এক হাত ধরা থাকবে। কোন অসুবিধাই নেই। কিন্তু অসুবিধা অন্য জায়গাই। আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। সেটা হল আশে পাশের মানুষজনকে নিরীক্ষণ করা। তাই তটস্থ হয়ে থাকি সবসময় যে, অন্য লোকজনও হয়তো আমার আচরণ লক্ষ্য করছে।
এখন অবশ্য আমাকে লক্ষ্য করার মত কেউ নেই। আমি হাঁটছি এমন পথে, যেখানে সাত-আট মিনিট পরে-পরেও মনুষ্য দর্শন পাওয়া যায় না। তবুও কেন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে আপাতত হাতটা খুলে রাখতে পারলে ভাল হত।
আজকে ভোরের ট্রেনেই এখানে এসেছি। এখানে বলতে আমার ফুপুর শ্বশুর বাড়ী। শ্বশুর বাড়ী বলছি, এই কারণে যে, আমার ফুপুরা এখানে থাকেন না। আমি এখানে এসেছি আধ্যাত্বের খোঁজে।
গল্প উপন্যাসে আধ্যাত্মিকতার বিষয়গুলো পড়তে-পড়তে আধ্যাত্মিকতার উপর লোভ ধরে গেছে। এখানে অবশ্য কোন আধ্যাত্মিক পুরুষ নেই, আছে এক নারী। অতি বয়স্কা মহিলা।
এখানে-ওখানে অনেক পীরের মাজার অবশ্য আছে। কিন্তু সেগুলো যে স্পষ্ট বুজরুকি ছাড়া কিছুই নয়, তা জানতে আর কারও বাকি নেই। এখানের ব্যাপারটা আমার জানার কোন কারণ ছিল না।
 পরের মাসে আমার মামার বিয়ে। আমার মা একটু বেশিই খুঁতখুঁতে। মামার বিয়ের পাত্রী নিয়ে ভীষণ সন্দিহান। যাকে পাচ্ছে তাকে ধরেই বলছে যে মেয়েটাকে চেনে নাকি? কেমন? ইত্যাদি...।
একদিন ফুপু আমাদের বাড়ীতে এসেছেন। অনুমেয় ভাবেই মা এই ব্যাপারে ফুপুকে জিজ্ঞাস করলেন। ফুপু বলল,- আরে ভাবি আপনি এই ব্যাপার নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে একজন মহিলা আছে। তাকে শুধু নাম আর কোথায় থাকে, বয়স কত বলে দিলেই, মেয়ে সম্পর্কে সব বলে দেয়।
তারপর থেকে মার টেনশনের সাময়িক সমাপ্তি ঘটেছে। তবে ঝামেলাই পড়েছি আমি। সামনে পরীক্ষা তার মাঝেই সময় করে ফুপুদের বাড়ী যেতে হবে।
সেই সূত্র ধরে আমি এখন এই রাস্তা ধরে হাঁটছি। গ্রাম বরাবরই সুন্দর। না কথাটা পুরোপুরি ঠিক হলনা, সবুজ বরাবরই সুন্দর। তাই রাস্তা দিয়ে হাটতে খুব ভাল লাগছে। অনেকটা পথ হেটে এসেছি। আমার যেখানে পাঁচ-মিনিটের পথও হেটে চলাচল করিনা সেখানে দুই কিলো পথ অনেক। সত্যিই খুব ভাল লাগছে। দেহটাকেই কেমন যেন হালকা হালকা লাগছে আর বুকের মাঝে এক উষ্ণ ভাব।
আমি যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তার একপাশে একটা বিশাল বিল রয়েছে এবং অন্য পাশে দিগন্ত-জোড়া ফসলের মাঠ। বিলটা সত্যিই বিশাল। এই বিল নিয়েও কিছু উপকথা আছে। এই বিলের মাঝখানে নাকি মাঝরাতে আগুন জ্বলে। তাই অন্ধকার রাতে কেও বিলে মাছ ধরতে সাহস করে না। এই বিষয়টাও একবার দেখতে হয়। নিঃসন্দেহে এটা একটা ব্যতিক্রম বিষয়। এ দুনিয়ায় ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য খুব কম হয়।
আমি এখন সেই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা-ওয়ালা মহিলার ঘরের সামনে দাড়িয়ে আছি। এখনও বিশ্বাস করতে পারছিনা যে এই মহিলা আধ্যাত্মিক কিছু বলবেন। কিন্তু কি আর করা শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘’there is many things in heaven and earth’’ এর উপর বিশ্বাস রেখে মহিলার জন্য অপেক্ষা করছি।
আমি এপর্যন্ত কোন পীর-ফকিরকে প্রথাগত ধর্মীয় কার্য পালন করতে দেখিনি। কিন্তু এ মহিলা আসরের নামাজ পড়ছেন। তারপরে দর্শনার্থীদের দেখা দেবেন। আমি ছাড়া আরও দুইজন এসেছে। তারা আরও আগে থেকে অপেক্ষা করছে।
আমি আমার ফুপার এক ভাতিজার সাথে এখানে এসেছি। ছেলেটা বুদ্ধিমান কিন্তু মহিলার এই আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় তার একটু কমই বিশ্বাস। তবে বিলের মাঝে যে রাতে রাতে আগুন জ্বলে সে ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই।
আধ্যাত্মিক মহিলার চেহারার মোটামুটি আধ্যাত্মিক ভাব আছে। বয়স কম করে হলেও ষাট হবে। তার পড়নে রয়েছে একটি সবুজ থান। না তার পোশাকের কারণেই শুধু আধ্যাত্মিক ভাব আসেনি। সবচেয়ে বেশী যেটা চোখে পড়ে তা হল, তার তীক্ষ্ণ চোখ। সচার-আচার বৃদ্ধ মানুষের এরকম হয় না। তাছাড়া তার গায়ের রঙ কালো, কিন্তু ময়লা-ময়লা না। কেমন যেন ওজ্জল্য আছে। বয়সের কারণে মলিন হয়ে যায়নি।
মহিলা কানে কম শোনে, তাই তাকে যা বলা দরকার তা মোটামুটি চিৎকার করে বলতে হয়। নাম বলে বৃদ্ধাঙ্গুলিটা একটা ফুলের ওপর ধরতে হয়। তাতেই মহিলা গড়গড় করে সেই লোক সম্পর্কে সব বলে দেয়। এগুলোর জন্য তাকে মাত্র দশ টাকা করে দিতে হয়। আমার আগে যে দুই জন লোক এসেছে, তারা মনে হয় বন্ধু লোক। একজন এসেছে নিজের বোন সম্পর্কে জানতে, অন্যজন তার হবু-প্রেমিকা সম্পর্কে জানতে। হবু-প্রেমিকা বলছি এই কারণে যে ছেলেটা মেয়েটাকে পছন্দ করে। তবে তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। এসব তাদের কথাবার্তা থেকেই বুঝতে পারলাম।
মহিলা আসতেই একজন বলল, নে তোর বোনের কথা জিজ্ঞেস কর।
-না,না, আগে তোর ইয়ের কথা জিজ্ঞেস কর।
-না,তুই আগে জিজ্ঞেস কর।
তাদের কথোপকথন আমরা শুনতে পেলাম ঠিকই। কিন্তু মহিলা শুনতে পেলনা, যেহেতু সে কানে কম শোনে।
এবার দ্বিতীয়জন তার বোনের নাম বলে ফুলে হাত রাখল। মহিলা বলা শুরু করল, নিজের বোনের সম্পর্কে কেউ অন্য কারও কাছে জানতে আসে। খুব ভাল মেয়ে। একটু জেদি আর ত্যাড়া। কিন্তু তুই যা সন্দেহ করেছিস তা ঠিক না।
এবার প্রথমজন নাম বলে ফুলে হাত রাখল। এবার মহিলা বলল, এই মেয়ে তো খুব চালু। এর পাল্লায় পড়লে পুলিশ মুইতা ফালাইব। জঙ্গলের ভিতর দিয়া চলাচল করে। তোর সাথে একটু ফাল পারে। ঠিক বলি নাই।
দুজন দর্শনার্থীর চোখ ছানাবড়া। একেবারে সব মিলে গেছে। তাদের বিস্ময় কাটতেই চাচ্ছে না। স্বাভাবিক কৌতূহলের সুরে তারা বলল এইটা আপনি কীভাবে বলেন?
-জ্বীনের সাহায্যে। এক জ্বীনের-পালের বাদশাহরে গোলাম বানাইছি। ঐ পালের সব  জীন আমার গোলাম। আমার সাথের সুমন প্রায় বিড়বিড় করে বলল, কতগুলো  জীন।
-সাড়ে সাত হাজার।
লোক দুজন অতি বিস্মিত হয়ে ফিরে গেলেও। আমার বুঝতে অসুবিধা হল না যে এটা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছুই না। তবে মহিলার বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হবে। অত্যন্ত বুদ্ধিমান মহিলা।
আমার মতে পীর –ফকিরদেরও বুদ্ধিজীবী সমাজে স্থান দেওয়া উচিৎ। এই জন্যে না যে শুধু বুদ্ধির ব্যাপারেই তাদের সাথে মিল আছে। তাছাড়া অন্য দুই একটা বিষয়েও তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।
কিছু না জিজ্ঞেস করে চলে আসাতে সুমন একটু অবাক হল। সুমন জিজ্ঞেস করল, চলে আসলেন কেন?
-বুঝতে পারলাম যে এটা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছুই না। তাকে প্রশ্ন করে কী লাভ। শুধু শুধু ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে।
-ভণ্ডামির কি দেখলেন? লোকগুলো সম্পর্কে তো মনে হয় ঠিক কথাই বলেছে। লোকগুলোর চেহারা কেমন হা হয়ে গিয়েছিল, দেখলেন না।
-হুম দেখলাম।
-তারপরেও কেন এরকম কথা বলছেন?
-তোমার কি মনে হয় মহিলা সত্যিই কানে শোনেন না।
-অবশ্যই, না হলে তাকে সবকিছু চিৎকার করে বলতে হয় কেন?
-তাহলে তুমি যখন বিড়বিড় করে জীনের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে, তখন বুঝল কি ভাবে।
-হ্যাঁ, এটা তো খেয়াল করিনি।
-তেমনি ঐ লোকগুলো নিজেদের মাঝে যে  কথাবার্তা বলেছে তা তুমি-আমি যেমন শুনেছি। তেমনি উনিও শুনেছে। তাই প্রথমে যখন লোকটা তার বোনের কথা জানতে চাইল। তখন মহিলা এরকম কথা বললেন। যে কোন ভাইকে তার বোন সম্পর্কে এরকম কথা বললেই বিশ্বাস করবে।
-কিন্তু তার বোন যে সেরকম কিছু করছেনা এটা বলল কীভাবে?
-দেখ, ঐ লোকটা তার বোন কিছু করছে কিনা সেই ব্যাপারে সন্দিহান বলেই এখানে এসেছে। এখন একজন ভাইকে বোন সম্পর্কে কী বলল বিশ্বাস করবে তা তুমিও জান।
-এখন বুঝতে পারছি।
-দ্বিতীয়জনের ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি যখন কাউকে পছন্দ করবে। তখন তার সবকিছুই তোমার কাছে বেশি বেশি মনে হবে। সবসময় মনে হবে যে তার আচরণ তোমার অনুকূলে হচ্ছে। আর গ্রামের মেয়েরা সাধারণত বেশি বাইরে আসেনা। তাই আশেপাশের জংলা যায়গায় বেশি থাকে। আসলে মহিলাটা অস্বাভাবিক বুদ্ধিমতী। তাছাড়া তার তেমন কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নাই।
আমি আবার সেই রাস্তা ধরে হাঁটছি। এখন রাত। ভাল জ্যোৎস্না হয়েছে। খোলা মাঠের মধ্যে নির্জন রাস্তায় জ্যোৎস্না রাত সত্যিই উপভোগ্য।
আমি অবশ্য জ্যোৎস্না করতে আসিনি। এসেছি বিলের মধ্যে ভুতের আগুন জ্বলা দেখতে। এমনিতেই বিকেলে আধ্যাত্মিকতার নামে মহিলার ভণ্ডামি দেখেছি। এখন যদি এটাও না দেখা হয়, তাহলে এখানে আসাটাই মাটি। যদিও ফুপুর ভাষ্যমতে জ্যোৎস্না রাতে ভুতের আগুন দেখা যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এখানে ফুপু বলছি আমার ফুপুর জা কে। সুমন আমার সাথে আসত। কিন্তু সে মাছের আড়তে গেছে। আড়তে নাকি আজ খুব চাপ পড়েছে।
রাস্তা দিয়ে হাটতে খুব ভাল লাগছে। শীত শেষ হয়ে গেছে।  তারপরেও অল্প বাতাসের কারণে শীত শীত লাগছে। শীত শীত লাগার এই অনুভূতিটা ভাল লাগছে। কিন্তু তাই বলেতো আর সারারাত হাটা যায়না। আমি তাই ঠিক করেছি। যে পর্যন্ত ভুতের আগুন দেখা না হবে সে পর্যন্ত বাড়ীতে ফিরব না।  সামনে অবশ্য একটা পুল আছে। ইচ্ছা করলে সেখানে বসা যায়। পুলটা এখন আর বেশী দূরে না। কিন্তু দূর থেকে পুলের উপর স্পষ্ট, একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। পুলের উপর মানুষ থাকতেই পারে এটা কোন সমস্যা না। কিন্তু সমস্যা হল অবয়বটা নারী অবয়ব। তাহলে মনে হয় পুলের ওপর আর বসা হল না। কিন্তু এত রাতে পুলের উপর একটা মেয়ে বসে আছে, এটা ঠিক স্বাভাবিকতার সাথে যায়না।
মেয়েটাকে দেখে আমি এমনিতেই কনফিউজড। তারপর মেয়েটা একটা সাদা জামা পড়ে আছে। সাদা জামার সাথে কালো চুল, সবমিলিয়ে অশরীরী একটা দৃশ্য। এখন বুঝতে পারছি গল্পে- উপন্যাসে কেন অশরীরী আত্মার উল্ল্যেখে সাদা শাড়ী ব্যাবহার করে। তবে তেমন ভয় পাচ্ছিনা। ভয় পেলে হয়ত সোজা বাড়ীর দিকে দৌড়াতাম। আবার হয়ত ভয় পাচ্ছি। এর আগে কখনও ভুত দেখিনি বলেই হয়তো ভুত দেখলে কী করতে হয় সেটা বুঝতে পারছি না।
পুলের কাছে এসে ভয় পুরোপুরি কেটে গেল। ভুত হয়তো কখন দেখিনি, কিন্তু মানুষ অনেক দেখিছি। তাই মানুষ চিনতে ভুল হলনা। তবে ভুত না হলেও মহিলা মানুষ, তাই আমার ব্রিজের উপর বসা হল না। ব্রিজ পাশ কাটিয়ে যখন চলে যাচ্ছি তখন মেয়েটা বলল, আপনিতো এখানে বসতে চেয়েছিলেন। চলে যাচ্ছেন কেন, বসুন।
আমি মোটামুটি অবাক হলাম। আমি এখানে বসতে চেয়েছিলাম  সেটা এই মেয়ে জানল কীভাবে। আবার ভয় করতে শুরু করল। এত রাতে পুলের উপর মেয়ে মানুষ ভয় পেতে পেতে আসার কারণে নিজে নিজেই সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। তাই অন্য কিছু চিন্তা না করেই বসে পড়লাম। অন্য কোন স্বাভাবিক সময় হলে হয়তো বসতাম না।
আপনি এত রাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন কেন? ভুতের আগুন দেখবেন বলে।
-এই প্রশ্ন তো আমার করার কথা, আপনি মেয়ে মানুষ হয়ে এত রাতে এখানে কী করছেন।
-আমার একটা খারাপ অসুখ আছে। তাই রাতে-বিরাতে পুলের ওপর বসে থাকি।
-কী অসুখ? এখন হয়ত বলবেন আপনাকে জীনে ধরেছে। এসব বলবেন না, আজগুবি কাহিনী শুনতে ইচ্ছা করছে না।
-আমি কখন বললাম আমাকে জীনে ধরেছে। আপনিতো দারুণ বোকা, নিজেই বলছেন জীনে বিশ্বাস করেন না, আবার ভুতের আগুন দেখার জন্য এখানে এসেছেন।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে সত্যিই কুণ্ঠিত হলাম কিন্তু অবাক লাগল একটা বিষয় দেখে যে, মেয়েটার কথাবার্তার পেছনে ভাল লজিক কাজ করছে।
-আমার এমন এক অসুখ হয়েছে যে অসুখ শুধু রোগীই ভোগে না, আশে-পাশের যারা আছে তারাও ভোগে।
-তো মানলাম আপনার খুব জটিল অসুখ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে রাতের বেলা পুলের ওপর বসে থাকতে হবে।
-আমি তো রোজ আসি না। ঠিক যেদিন আমি বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাই সেদিন আসি। এলাকার লোকজন অবশ্য বলে যে কারও সাথে পালিয়ে গেছি।
-তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে আপনি এমনিতেই পালিয়ে যান। কারও সাথে না।
-না, যেদিন খুব জ্যোৎস্না হয়। চারিদিক দিনের আলোর মত খা খা করে সেদিন আমার কেমন যেন হয়।
-শুনেছি গৃহত্যাগী জ্যোৎস্না উঠলে ভবঘুরেদের এরকম হয়। ভবঘুরের স্ত্রী-লিঙ্গ কী হতে পারে। আজকে তাহলে উধাও হচ্ছেন।
-হ্যাঁ থাকেন। আমি এখন যাই। আবার বাড়িতে টের পেলে আটকে রাখবে।
মেয়েটার কথাবার্তায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, মেয়েটা পাগল। যারা বদ্ধ পাগল তাদের সব কিছু থাকে এলোমেলো কিন্তু তাদের মাথাটা পরিষ্কার থাকে। তাদের বুদ্ধি হয় অতি তীক্ষ্ণ। এই মেয়েটার ব্যাপারেও ব্যতিক্রম নয়। মেয়েটাকি সত্যিই আজ কোথাও চলে যাবে। নাকি অদ্ভুত খেয়ালের বসে এটা বলে গেল।
মেয়েটা দেখি আবার ফিরে আসছে। তাহলে মনে হয় এতক্ষণ এমনি  বলছিল এগুলো। ফিরে এসে বলল, আজকে আমি একেবারে উধাও হওয়ার জন্য বেড়িয়েছি। কিন্তু আপনি যদি বলেন তাহলে বাড়িতে ফিরে যাব।
মেয়েটা পাগল ঠিক আছে কিন্তু সাহসী পাগল না এটা বুঝতে পারলাম। তাই বললাম, আপনি হারিয়ে গেলেও আমার কিছু যায় আসে না, আবার না গেলেও কিছু যায় আসে না। আপনার যা ইচ্ছা করেন।
মেয়েটা যে পথে ফিরে এসেছিল আবার সে পথেই চলে গেল। আমার কেন যেন মনে হল, এ মেয়ে আর কখনও ফিরবে না। মেয়েটা একটা বাঁকের আড়াল হতেই বিলের দিক থেকে শোরগোলের আওয়াজ এল। বিলে জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ ধরছিল। তাদেরই আওয়াজ। বিলের দিকে তাকিয়ে সত্যিই আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এওকি সম্ভব বিলের মাঝখানে অথৈ পানির ওপর আগুন জ্বলছে। আমি সত্যিই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। জেলেরা সব পাড়ের দিকে চলে যাচ্ছে। তাদের আজকে মাছ ধরা ভণ্ডুল হয়ে গেল।
রাতে এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করলাম। কিন্তু কিছুই মেলাতে পারছিলাম না, এটা কিভাবে সম্ভব। এটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে অনেক রাত হল, মেয়েটার কথাও প্রায় ভুলে গেলাম।
কেবল ঘুম থাকে উঠেছি। রাত জাগার ফলে, অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। দোতালা বাড়ীর টিনের ছাদের ফুটা দিয়ে ঘরের ভিতর সূর্যালোক ঢুকছে।  সূর্যের আলোয় রাতের অন্ধকার কেটে যাওয়ার সাথে সাথে কাল রাতের ব্যাপারটাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। রাতের বেলা অবশ্য কোন সমাধান না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার অবচেতন মন এটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। তাই সকালে ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথেই হঠাৎ করে সমাধানটা পেয়ে গেলাম।
রাতে বিলে মাঝখানে আগুন জ্বলার বিষয়টা মোটামুটি এরকম। বিলে প্রচুর কচুরি-পানা রয়েছে। দিন দিন শুধু এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। কিন্তু বিলটাতো আর বড় হচ্ছে না। তাই কচুরিপানা গাদাগাদি হয়ে অনেকগুলো নিচে চলে যাচ্ছে। নিচে সেটা পচে অ্যালকেন জাতীয় জ্বালানীতে পরিণত হয়ে বের হয়ে আসার সময় অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে দহন বিক্রিয়া করছে।  ফলে আগুন জ্বলে উঠছে।  দিনের বেলাতেও আগুন জ্বলে কিন্তু অতি সামান্য হওয়ায় তা চোখে পড়ে না। রাতের অন্ধকারে অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে।
সকালের নাস্তার সময় একটা কথা শুনলাম। ফুপু বলছে, রশিদ মাস্টারের পাগলি মেয়েটার নাকি আবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ফুপুদের বাড়ীতে কাজ করে ঐ মহিলাটা বলল, হ আম্মা ঠিকই হুনছেন। পাগলনী আবার নাই হইয়্যা গেছে।
ফুপু আফসোসের কণ্ঠে বলল, এত সুন্দর একটা মেয়ে।
আমি বললাম, ঘনঘন হারিয়ে যায় নাকি।
-যায়, কিন্তু আবার ফিরে আসে। শেষটা মনে হয় নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই বলল।
আমার কেন যেন মনে হল, মেয়েটা আর ফিরবেনা। মেয়েটা হয়ত কাল রাতে সত্যি কথাই বলেছিল। আমি বারণ করলে কী সত্যিই সে ফিরে যেতো...............????

ভোট: 
Average: 10 (2 votes)