পাক-দালাল

কালবেলা এর ছবি

পাক-দালাল

আবদুর রউফ চৌধুরী

পাকিস্তানিপন্থী বাঙালি নেতারা ও প্রচারমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে কোনোমতেই মেনে নিতে পারে না। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা বাঙালির হাতে ক্ষমতা না দিয়ে ২৫শে মার্চ থেকে নির্বিচারে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ করে পূর্ব-বাংলাকে দখলে রাখতে চায়। দল হিসেবে শুধু জামায়াতে ইসলামিই মুক্তিযোদ্ধের বিরোধিতা করে না, বরং রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গড়ে তুলে। ওরা পাকিস্তানি সৈন্যদের পথঘাট চিনিয়ে দেয় এবং মুক্তিবাহিনী বা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ও বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে। বাঙালি রমণী পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে সরবরাহ করার দায়িত্বও অকৃত্রিম আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে। তারা ও তাদের সংবাদ-মাধ্যম বাঙালির জাতীয় জীবনে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে। তারা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিপক্ষশক্তি হিসেবে কঠিন সংগ্রামের আহবান জানায়। পাক-দালাল ও তাদের সংবাদ-মাধ্যমের কর্মকা-ের (এপ্রিল-আগস্ট ১৯৭১) একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে দেওয়া হল।

এপ্রিল
১১ই এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানের ঐক্য ও ইসলামিক আদর্শ বজায় রাখার জন্য ‘পাক-ভারত সম্পর্ক’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশের জন্য একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য এবং ইসলামি আদর্শ ও রাষ্ট্রীয় ঐক্য সম্বলিত শাসনতন্ত্র দেওয়ার জন্য সর্বদা সচেষ্ট আছেন। তিনি তার পাঁচ-দফা আইন কাঠামো আদেশে পাকিস্তানের ঐক্য ও ইসলামি আদর্শ পুরোপুরিভাবে বজায় রাখার নিশ্চয়তা ঘোষণা করেছিলেন। গত নির্বাচনের পরের কাহিনী বড়ই নাজুক। কিছু সংখ্যক ব্যক্তি দেশের ঐক্য বজায় রাখায় তাদের নির্বাচনী ওয়াদা খেলাপ করে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের স্থলে পূর্ব-পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে তথাকথিত ‘বাংলাদেশ’ গঠনে অপপ্রয়াস পেয়েছিল। এই সুযোগে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত অন্যায়ভাবে পূর্ব-পাকিস্তান দখল করে নেওয়ার জন্য আমাদের মধ্যে ত্রাস ও বিশৃঙ্খলা ঘটানোর অপপ্রয়াসে মেতেছে।
১১ই এপ্রিল ১৯৭১। ‘পূর্ব-পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগ’-এর সভাপতি খাজা খয়েরুদ্দিনকে আহ্বায়ক করে এবং এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম, মৌলানা ফরিদ আহমেদ, অধ্যাপক গোলাম আযম, পীর মহসেন উদ্দীন, মাহমুদ আলী, এ.এস.এম. সোলায়মান, আবুল কাসেম, আতাউল হক খান প্রমুখ সহ ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তিকমিটি গঠন করা হয়। এই সংবাদ ‘ঢাকায় শান্তিকমিটি গঠন’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ প্রকাশ করে বলে, ‘[...] গতকাল কমিটির এক বৈঠকে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ এবং পূর্ব-পাকিস্তানে সশস্ত্র অনুপ্রবেশের তীব্র নিন্দা করা হয়।’  আর এই সভায় হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রকাশ করে প্রস্তাব গ্রহণের কথা প্রকাশ করে ‘দৈনিক পাকিস্তান’, বলে, ‘এই সভা মনে করে যে, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে হিন্দুস্থস্থান বস্তুতপক্ষে পূর্ব-পাকিস্তানিদের দেশপ্রেমকে চ্যালেঞ্জ করছে।/ এই সভা আমাদের প্রিয় দেশের সংহতি ও মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে, এই চ্যালেঞ্জ সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলার জন্যে, দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আকুল আহ্বান জানাচ্ছে।’ 
১২ই এপ্রিল ১৯৭১। পূর্ব-বাংলার অন্যান্য শহরে কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির পথ অনুসরণ করার জন্য ‘একটি শুভ পদক্ষেপ’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
অন্যান্য শহরেও কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির পথ অনুসৃত হবে এবং গোটা দেশে পূর্ণ স্বাভাবিকতা ও দেশ রক্ষাবোধ দেখা দেবে। [...] এর ফলে ভারতীয় অনুপ্রেবশকারী ও পঞ্চমবাহিনীর সব চক্রান্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য। 
১২ই এপ্রিল ১৯৭১। শান্তি ও শৃঙ্খলার দিকে পূর্ব-বাংলার উত্তরণ ঘটেছে এমন কথা প্রকাশের জন্য ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
গতমাসে রাজনৈতিক আন্দোলন হিংসাত্মক পথে মোড় নেওয়ার পর যারা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তারাও ফিরে আসছেন, এমনকি যারা প্রদেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন, তারাও ফিরে আসছেন। মোট কথা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আবার শুরু হয়েছে। [...] অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার এক পর্যায় থেকে শান্তি ও শৃঙ্খলার দিকে দেশের উত্তরণ ঘটেছে।
১৩ই এপ্রিল ১৯৭১। এই দিন, ১২ই এপ্রিলের গোলাম আযমের মোনাজাত প্রসঙ্গে খবর প্রকাশ করে ‘দৈনিক সংগ্রাম’। পত্রিকাটি বলে যে, গোলাম আযম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে মুসলমান সৈনিক হিসেবে পাকিস্তান রক্ষার যোগ্যতা অর্জনের, সত্যিকারের মুসলমান ও পাকিস্তানি হিসেবে বেঁচে থাকার ও পাকিস্তানকে ইসলামের আবাসভূমি হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে মোনাজাত করে।
১৪ই এপ্রিল ১৯৭১। জাতিসংঘের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রকাশ করে ‘চীনের সমর্থন’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ভারতের জঘন্য আচরণের বিরুদ্ধে প্রথম চীন নয় বরং জাতিসংঘকেই প্রতিবাদ মুখর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় একটি জাতিসংঘ বহির্ভূত দেশ যে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিতে পেরেছে, জাতিসংঘ তা পারেনি। [...] প্রকৃতপক্ষে জাতিসংঘের এ ধরনের দায়িত্বহীনতা ও নিষ্পৃহ মনোভাবের ফলেই ভারতের মতো পররাজ্য লোলুপ রাষ্ট্রসমূহ পৃথিবীতে অশান্তি ও যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

১৫ই এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর জয়গান গেয়ে ‘ঢাকা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত সমগ্র এলাকা দুষ্কৃতিকারীমুক্ত’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
এমনকি পাকিস্তানের বিমানগুলো এর আগে যেসব অভিযান চালিয়েছিল তাতে তারা খুবই সতর্কতার সঙ্গে কেবলমাত্র দুষ্কৃতিকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের ঘাঁটির বিরুদ্ধে অভিযানরত স্থলবাহিনীকে সাহায্য করেছে।
১৫ই এপ্রিল ১৯৭১। শান্তিকমিটির উদ্যোগে আরও একটি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এ সম্বন্ধে ‘জনতা পাকিস্তান চায়’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানের সংহতি ও অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ভারতীয় চক্রান্তের প্রতিবাদে পরিচালিত মঙ্গলবারের লক্ষ লক্ষ জনতার অভূতপূর্ব বর্ষাভেদী মিছিলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করছে, পূর্ব-পাকিস্তানের জনতা তথাকথিত বাংলাদেশ চায় না, চায় পাকিস্তান। [...] নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্রের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ সেদিনের আগরতলা ষড়যন্ত্রকে বাস্তব সত্য বলে ধারণা জন্মাচ্ছে। [...] শেখ মুজিবের রেফারেন্ডাম ছিল স্বায়ত্তশাসনের―স্বাধীনতার নয়। সরল জনতা কি করে বুঝবে যে, পাকিস্তান ও কোরআন-সুন্নাহ ভেকধারীরা ভোট নিয়ে ভারতের তাবেদার স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চালাবে? [...] যে-মাত্রায় পাকিস্তান দিবসে [২৩শে মার্চ ১৯৭১] ‘জয়বাংলা’ পতাকা উত্তোলিত হল আর পুড়ানো হল পাকিস্তানি পতাকা ও পদদলিত করা হল পাকিস্তানের জনক কায়েদে আজমের ছবি, অমনি তাদের সঙ্গতি ফিরে এল। [...] ফলে দেশের সেনাবাহিনী সহজেই গোটা প্রদেশ আয়ত্বে এনে ভারতীয় চর ও অনুপ্রবেশকারীদের বন্দি, ধ্বংস ও বিতাড়িত করতে সমর্থ হল। [...] বলা বাহুল্য জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম লীগ প্রাক-নির্বাচন কাল থেকেই জনগণকে এ ভারতীয় ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সতর্ক করে আসছিল। কিন্তু সরল জনতা দু’শত বছরের শিক্ষার পরও মুসলমানদের ভেতর এরূপ কোনো মীরজাফর জন্মাতে পারে বলে ভাবতে পারেনি। [...] আজ জনগণের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে ভারতবন্ধু মীরজাফরদের আর ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের সমূলে উৎখাত করার জন্য দেশরক্ষাবাহিনীর সঙ্গে সক্রিয় সহযোগিতা করা। [...] আমরা গত ১লা মার্চ থেকে তাদের তথাকথিত ‘জয়বাংলা’র স্বেচ্ছাচার দেখেছি, তাদের লুঠতরাজ ও হত্যা অপহরণ আমাদের অনেকেই স্বচক্ষে দেখেছি। দেখেছি তাদের অমুসলিমের সহযোগিতার পাইকারী হারে মুসলমানের গলাকাটার লীলা।
১৬ই এপ্রিল ১৯৭১। শুক্রবার। সন্ধ্যা। নূরুল আমিনের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির কার্যনির্বাহক কমিটির একটি প্রতিনিধিদল লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে। এই দলের মধ্যে ছিল খাজা খয়েরুদ্দিন, এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম, গোলাম আজম, মাহমুদ আলী, আবদুল জব্বার খন্দর, মোহন মিয়া, মওলানা মোহাম্মদ মাসুম, আবদুল মতিন, গোলাম সারওয়ার, এ.এস.এম সোলায়মান, এ.কে. রফিকুল হোসেন, নূরুজ্জামান, আতাউল হক খান, তোয়াহা বিন হাবিব, মেজর আফসারুদ্দিন, হাকিম ইরতিজায়ুর রহমান খান আখুনজাদা। তারা নাগরিকদের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ও আস্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেসব অগ্রগতি হচ্ছে সে-সম্বন্ধে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে অবহিত করে। তারা জনসাধারণ যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধা ভোগ করছে এর প্রতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের দৃষ্টি আকর্ষণও করে। তারা আরও জানায় যে, জনসাধারণ ভারতের কুমতলব পুরোপুরিভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। পাকিস্তানের সংহতি ও অখ-তা রক্ষার জন্য তারা সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের সশস্ত্রবাহিনীকে সাহায্য করছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান শান্তিকমিটির সদস্যদের আশ্বাস দিয়ে বলে যে, জনগণের প্রকৃত সমস্যার উপর লক্ষ্য রাখা হবে এবং অনতিবিলম্বে প্রতিবিধানমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
১৬ই এপ্রিল ১৯৭১। মওলবী ফরিদ আহমদ ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার মাধ্যমে এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলে, ‘ভারত যে পাকিস্তানকে ধ্বংস করে মুসলমানদেরকে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিস্টদের গোলাপ বানাতে চাচ্ছে, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন বিশ্বজনমতের কাছে তা এখন স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে। [...] হিন্দু-ভারত পাকিস্তানকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের পবিত্র মাটিতে যেসব বিশ্বাসঘাতক ও ঘরের শত্রুদের নিয়োগ করেছিল তার গোমর যাতে ফাঁস হয়ে না যায় সেজন্য তারা পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনী নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে নানাবিধ মিথ্যা প্রচারণার সিরিজ ছড়াতে শুরু করেছে। হিন্দু-ভারতের এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে বিশ্বের সা¤্রাজ্যবাদীদের যে শত এজেন্ট যোগ দিয়েছে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব মিথ্যা গুজব প্রচার করছে। এবং এই সকল প্রচারবিদ মিথ্যা খবর তৈরির ব্যাপারে সক্রিয় সাহায্য করে যাচ্ছে। ঢাকা নগরীর ধ্বংস, ট্যাঙ্কযুদ্ধ, ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও, জেনারেল টিক্কা খানের হত্যা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, চট্টগ্রাম পোর্টের পূর্ণ ধ্বংস, শেখ মুজিব ও তার অনুগামীগণ কর্তৃক স্বাধীন সরকার গঠন এবং তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের আজগুবি খবর প্রচার এখন পুরোপুরি ধরা পড়েছে। [...] সমগ্র শহরটি [চট্টগ্রাম] বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত হিন্দু যুবকদের সাহায্যপুষ্ট বেআইনি ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও গণবাহিনীর লোকেরা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে লোকদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। একসময় তারা চট্টগ্রাম শহরকে দখল করতে চেয়েছিল। [...] দৃষ্কৃতিকারীরা ২৬শে মার্চ রাতে পাথরঘাটায় হত্যাকা- চালায়। এরপর কালুরঘাটে ব্রিজের কাছে কর্ণফুলী কাগজের কলের তিন-ট্রাক বোঝাই শ্রমিককে ও শেরশাহ কলোনির লোকদেরকে হত্যা করে। এছাড়া সমগ্র ওয়ারলেস কলোনিটি পুড়িয়ে দেয়। [...] দুগ্ধপোষ্য শিশু এবং নারীদেরকেও দুষ্কৃতিকারীরা রেহাই দেয়নি। শুধুমাত্র মুসলমান হওয়া এবং হিন্দু ও তাদের এজেন্টদের সঙ্গে কোনো সংশ্রব না থাকার অপরাধেই এভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। [...] এই দেশে ভারতীয় এজেন্টদের জঘন্য কার্যকলাপ হিটলারের বর্বরতার চেয়েও নিষ্ঠুর।
২২শে এপ্রিল ১৯৭১। ‘সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা সব চাইতে আপত্তিকর’ উল্লেখ করে ‘জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] বিশেষ করে সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা সব চাইতে আপত্তিকর। সংবাদপত্রের মালিকদের মনে ঘূর্ণঅক্ষরেও এটা জাগ্রত হয়েছে বলে মনে হয়নি যে, তারা যে-আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান অর্জিত হওয়ায় এখানে সংবাদপত্রের ব্যবসা করে দু’পয়সার অধিকারী হয়েছে সে আদর্শের জন্য তাদের পত্রিকায় দু-একটি কলাম থাকা একান্ত জরুরি ছিল। [...] তা না করে বরং জাতীয় আদর্শবাদীদেরকে সকল সময় কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করেছেন। 
২৩শে এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানকে দ্বিখ-িত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার কাজে লিপ্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতি কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সংবাদ প্রকাশ করে ‘দৈনিক পাকিস্তান’ লিখে―
কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি সকল দেশপ্রেমিক পাকিস্তানির প্রতি রাষ্ট্র-বিরোধী লোকদের হিংসাত্মক এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপ প্রতিরোধের এবং উদ্যম ও উৎসাহের সঙ্গে সর্বরকমভাবে সশস্ত্রবাহিনীকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছে। [...] কমিটির আহ্বায়ক এস.কে. খয়ের উদ্দিন প্রচারিত প্রেস রিলিজে বলেন, ‘রাষ্ট্র-বিরোধী ব্যক্তিরা সারা প্রদেশে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হওয়ায় এখন পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করছে, শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের হয়রান করছে এবং যোগাযোগ ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ [...] রাষ্ট্র-বিরোধী ব্যক্তি ও দুষ্কৃতিকারীদের নির্মূল করার অভিযানে সশস্ত্রবাহিনীকে সাহায্য করে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য শান্তিকমিটি দেশপ্রেমিক জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কমিটি বলেছে, ‘দেশের মানুষের সেনাবাহিনীকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
২৩শে এপ্রিল ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করার জন্য আহ্বান জানিয়ে ‘গুজব বন্ধ হোক’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানস্থ ভারতীয় চররাও এখন পর্যন্ত নিরলসভাবে গুজব ছড়িয়ে চলেছে। গুজবের পরিণতি এদেশের মানুষকেই শেষ-পর্যন্ত ভোগ করতে হবে এবং হচ্ছে। [...] আমরা মনে করি শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন সংস্থা এবং কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি ও তার শাখা সংস্থাগুলো গুজব রটনার বিরুদ্ধে বিরাট ভূমিকা পালন করবে। [...] যাবতীয় অশান্তি সৃষ্টিকারী দৃষ্কৃতিকারীদেরকে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের সহায়তায় খুঁজে বের করার জন্য প্রতিটি বাড়িতে ও তাতে অবস্থানকারীদের বিস্তারিত পরিচয় জানার ব্যবস্থা অবলম্বিত হলেও কল্যাণকর ফল পাওয়া যাবে বলে আমরা মনে করি।
২৫শে এপ্রিল ১৯৭১। কোলকাতাস্থ পাকিস্তানি হাই-কমিশন অফিস বাঙালির দ্বারা ব্যবহার করায় ‘ভারতের দ্বি-মুখী নীতির জের’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে না এমন কিছু লোক এবং দুষ্কৃতিকারীরা কোলকাতাস্থ পাকিস্তানি হাই-কমিশন অফিস যথেচ্ছা ব্যবহার করছিল। ভারত সরকারের উচিত ছিল এসব অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ও দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে হাই-কমিশনের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু ভারত সরকার এ ন্যায় নীতি বোধের পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। 
২৫শে এপ্রিল ১৯৭১। পূর্ব-বাংলায় ইসলামিক শিক্ষানীতি চালু করার আহ্বান জানিয়ে ‘জাতীয় আদর্শভিত্তি শিক্ষা’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
আজাদীর অবাহিত পর থেকে দেশে ইসলামি শিক্ষানীতি চালু থাকলে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদর্শবান শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা অবলম্বিত হলেও আমাদের সমাজ কিছুতেই বর্তমান অবস্থার সম্মুখীন হত না। 
২৯শে এপ্রিল ১৯৭১। ‘ভারতীয় প্রচারণার নূতন মোড়’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
আব্রাহ্মণ্য চক্রান্তের হোতাদের জেনে রাখা উচিত ছিল যে, পূর্ব-পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ নির্বাচনে বেআইনী ঘোষিত দলটির [আওয়ামী লীগ] প্রতি সরল বিশ্বাসে যে আশায় সমর্থন দিয়েছিল, তারা জনগণকে সে আশার প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষা না করায় জনগণের কাছে আর এখন তাদের কোনো স্থান নেই। কেননা তারা হিন্দুস্থানী জগৎ, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভদের চক্রান্তে মীরজাফরের ভূমিকায় অবতীর্ণ পাক বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে হিন্দুদের গোলামে পরিণত করতে চেয়েছিল। 
৩০শে এপ্রিল ১৯৭১। রবীন্দ্রনাথকে ও জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’-কে কটাক্ষ করে ‘নৈরাজ্যের অবসান’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
মাত্র এক মাসের ভিতর আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাক-সেনারা পূর্ব-পাকিস্তানের গোটা ভূখ- নাপাক হিন্দুস্থানী অনুপ্রবেশকারী ও অনুচরদের হাত থেকে মুক্ত করে এ এলাকার জনতাকে দুঃসহ এক অরাজকতার রাজ্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। না বললেও চলে, এ এক বৎসর দু’মাস সময়ব্যাপী এদেশে গণতন্ত্রের নামে বনতন্ত্র চলছিল, নির্বাচনের নামে প্রহসন ঘটেছিল, রাজ্য চালানোর নামে নৈরাজ্য চলেছিল, স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচার চলেছিল, নকশালীদের অনকশালী হত্যা চলল ও বাঙালিদের অবাঙালি হত্যার তা-বলীলা চলতে লাগল। [...] যারা পূর্ব-পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ করেছিল, জিন্নাহ হলকে ‘সূর্যসেন’ করেছিল, রবীন্দ্রনাথকে জাতীয় কবি করেছিল আর সেই ঠাকুরেরই ‘ও আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত করেছিল তারা পাকিস্তানি হওয়ার যোগ্যতা সর্বতোভাবে হারিয়েছে বলে কোনো পাকিস্তানিই আজ তাদের সমর্থন যোগাবে না।

মে
১লা মে ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ ও ‘সমাজ-বিরোধী’ বলে আখ্যায়িত করে ‘দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
কিন্তু সে রাজনীতি মূলত: তখনই ফ্যাসিবাদিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা এমনকি শেষ-পর্যন্ত গণ-আকাক্সক্ষার পরিপন্থী বিচ্ছিন্নতা পর্যন্ত, মূলত এ কারণেই গিয়ে পৌঁছুতে পেরেছিল যে, তাতে সমাজ-বিরোধী দুষ্কৃতিকারীরাও বিপুল অর্থপুষ্ট হয়ে ঢুকে পড়েছিল। [...] কাজেই দেশে শান্তি, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার জন্য যেমন প্রথমত দুষ্কৃতির মূল উৎস ও কার্যকারণের উৎখাত হওয়া আবশ্যক, তেমনি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সহনশীল রাজনৈতিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যও দুষ্কৃতিকারীদের নির্মূল করা একান্ত প্রয়োজন।
২রা মে ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বাংলাবাহিনীর লোক’ ও ‘বেআইনী ঘোষিত একটি রাজনৈতিক দলের [আওয়ামী লীগের] সদস্য’ বলে উল্লেখ করে ‘হিন্দুস্থানী সৈন্যের বর্বরতা’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] যে অঞ্চলেই ভারতীয় সৈন্যরা অনুপ্রবেশ করেছে, সেখানকার জনগণ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আমাদের পাক-সেনাবাহিনীর আগমনের অপক্ষো করছে। পাকবাহিনীর আগমনে শান্তি ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। [...] ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী সৈন্যরা যেখানেই প্রবেশ করেছে এবং জনগণের ওপর যথেচ্ছাচার চালিয়েছে সেখানেই তাদের সঙ্গে একদল দেশীয় দুষ্কৃতিকারী ছিল বলে জানা গেছে। এসব স্থানীয় দুষ্কৃতিকারী যে হিন্দুস্থান রেডিও ঘোষিত ‘বাংলাবাহিনীর লোক’ এবং এরা যে বেআইনী ঘোষিত একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিল সে সম্পর্কে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই। [...] একশ্রেণীর মানুষ এদেশের কোটি কোটি মুসলমানের ভাগ্যকে ওপারের হিন্দুদের যথেচ্ছাচারের শিকারে পরিণত করতে চেয়েছিল। এধরনের মানসিকতা না থাকলে তারা কিছুতেই হিন্দুস্থানী সৈন্যদের ডেকে এনে এদেশের নিরীহ ও নিরস্ত্র মুসলিম জনসাধারণের ওপর জঘন্য ও পাশবিক অত্যাচার চালাতে পারত না, দেশের অর্থসম্পদ লুট করে হিন্দুস্থানী সৈন্যদের সহযোগিতা করত না এবং নিজেদের দেশের ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা প্রভৃতি গরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করতে হিন্দুস্থানী সৈন্যদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত না। 
৩রা মার্চ ১৯৭১। রইসী বেগম (ফজলুল হকের কন্যা) ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর মাধ্যমে এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলে, ‘[...] শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুচররা চিরদিনের তরে মঞ্চ থেকে অপসারিত হয়েছে। শয়তানী শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার শক্তি যেন আমাদের অজেয় সশস্ত্রবাহিনীকে আল্লাহ দান করেন।’ 
৪ঠা মে ১৯৭১। ‘দুষ্কৃতিকারীদের ধরিয়ে দিন’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বলে, ‘এ সমাজ বিরোধীদের দমনে সরকারকে সাহায্য করা একদিকে নিজেকে সাহায্য করা ও অপরদিকে নিজের ঈমানী দায়িত্ব পালন করার শামিল।’ 
৬ই মে ১৯৭১। ভারত তার দেশের তালাবদ্ধ কারখানার শ্রমিক ও বেকার নাগরীকদের একত্র করে তাদের শরণার্থী বলে প্রচার করছে বলে ভারতকে অভিযুক্ত করে ‘শরণার্থী বাহানা’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
হিন্দুস্থান এখন নিজ দেশের তালাবদ্ধ মিল-কারখানার বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও বেকার নাগরীকদের একত্র করে তাদের শরণার্থী বলে প্রচার করছে এবং বিশ্ববাসীর দরবারে মানবতার দোহাই দিয়ে তাদের নামে সাহায্য হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে। দুনিয়ার সামনে ইতিমধ্যে যেমনিভাবে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, আসলে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী ছিল হিন্দুস্থানী অনুপ্রবেশকারী ও তাদেরই নিয়োজিত চর তদ্রুপ হিন্দুস্থানের বহু প্রচারিত শরণার্থীদের স্বরূপও তাদের কাছে ধরা পড়তে বাধ্য। 
৬ই মে ১৯৭১। স্বাধীনতার সংগ্রামকে হিন্দু ভারতের কল্যাণ ও সমস্ত মুসলিম বিশ্বের অকল্যাণ বলে উল্লেখ করে ‘তিক্ত হলেও সত্য’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
শুনেছি ভূতের পা পেছনে থাকে। আমাদের ‘বাংলাদেশ’-ওয়ালারা ভূত কিনা জানি না। তবে তাদের গতি যে কোন দিকে এ ব্যাপারে আজ আর কেউ দ্বিমত পোষণ করছে না। যে পাকিস্তান তাদের হিন্দু জমিদার ও মহাজনের নিপীড়ন ও নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি দিয়েছে। [...] যে পাকিস্তান তাদের জান-মালের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে, সে পাকিস্তান তাদের ক্ষতিটা করল কি? [...] সন্দেহ নেই এই ‘বাংলাদেশ’-ওয়ালাদের তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রাম হিন্দু ভারতেরই কল্যাণে এসেছে। গোটা মুসলিম দুনিয়ার কেবল অকল্যাণই বাড়িয়েছে। বিজাতীয় দালালী নিয়ে স্বজাতির এরূপ নির্লজ্জ সর্বনাশ সাধনের নজীর বিংশ শতকে তো দূরের কথা, দুনিয়ার ইতিহাসেও নগণ্য। তাই দুনিয়ার সেরা মুসলিম রাষ্ট্রের ধ্বংসকারী ‘বাংলাদেশ’-ওয়ালারা জাতির ইতিহাসে ‘মীরজাফর’ পরিভাষারই নতুন সংস্করণ হয়ে দেখা দেবে। 
৮ই মে ১৯৭১। এদিন থেকে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ সম্পাদকীয় প্রকাশের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। ২৫শে মার্চের কালো রাতের নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করে ‘পাকিস্তানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন’-নামক একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ‘বাংলাদেশ সরকার’-এর অস্তিত্ব অস্বীকার করে, ২৬শে মার্চকে ‘পাকিস্তানিদের জন্য মুক্তি দিবস’ আখ্যা করে এবং শেখ মুজিবকে বাংলাদেশের জাতির পিতা বলে স্বীকার করে ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা’-শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে, ‘অবৈধ আওয়ামী প্রধান শেখ মুজিবর রহমান গত ২৬শে মার্চে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এঁটে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। সামরিক সরকার তা জানতে পেরেই ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে আকষ্মিক হামলা চালিয়ে তার সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেন এবং পাকিস্তানকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। [...] মুজিবরের এই পরিকল্পনার পেছনে ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র থেকেই [...] জাতির পিতা কায়েদে আজমের নাম নিশানা মুছে নতুন জাতির নতুন জনক বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠার অভিযান চলেছিল। পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের বদলে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত চালু করা হয়েছিল। অবশেষে ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে শুধু মুখের ঘোষণাটি বাকি রাখা হয়েছিল ২৫শে মার্চের জন্য। [...] এরূপ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রশ্নাতীত সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব সশস্ত্র-বাহিনীর উপরই ন্যস্ত। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুচরেরা চিরদিনের তরে মঞ্চ থেকে অপসারিত হয়েছে। শয়তানী শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার শক্তি যেন আমাদের অজেয় সশস্ত্র বাহিনীকে আল্লাহ দান করেছেন। [...] আমাদের বীর হামলা যেরূপ অলৌকিভাবে প্রতিহত ও বিধ্বস্ত করল তাতে সত্যিই আমরা গর্ববোধ করছি। 
৯ই মে ১৯৭১। শান্তিকমিটির আমন্ত্রণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জওয়ানরা মুন্সীগঞ্জের সদর-শহরে উপনীত হয়। এ-সম্বন্ধে ‘পূর্বদেশ’ লিখে―
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জওয়ানরা মুন্সীগঞ্জ শহরে উপনীত হলে মুন্সীগঞ্জ মহকুমার জনসাধারণ ও সরকারি কর্মচারীরা তাদের আন্তরিক অব্যর্থনা জানান।
মেজর জাবেদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদল মুন্সীগঞ্জে উপনীত হলে সেখানকার বিভিন্ন শ্রেণীর লোক এই সেনাদলকে বিপুল অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। এর আগে জনসাধারণ সকল দালানকোঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাজারসমূহে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন।
পাকিস্তানি সেনাদল শহরে উপনীত হলে সেখানে এক আনন্দমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর সেনাবাহিনীর অফিসাররা জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য এবং মুন্সীগঞ্জ শহরের শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান জনাব আবদুল হাকিম বিক্রমপুরীসহ স্থানীয় সরকারি কর্মচারী ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে জনাব বিক্রমপুরী সামরিক অফিসারদের মুন্সীগঞ্জ মহকুমার জনসাধারণের আন্তরিক ও পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জনাব বিক্রমপুরী আরও বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জ, লৌহজঙ্গ, টঙ্গিবাড়ি, গজারিয়া, শ্রীনগর এবং সিরাজদি খান নিয়ে গঠিত এই মহকুমার জনসাধারণ সবসময়ই আইনানুগ, শান্তিপ্রিয় এবং দেশপ্রেমিক।’
সকল দোকাপাট, সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো তাদের স্বাভাবিক কর্ম-তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। কোনো ব্যক্তিই ভয় ও আতঙ্কে শহর ছেড়ে যায়নি।
সামরিক অফিসাররা বাজার পরিদর্শন করেন এবং দেখতে পান যে, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যাদির মূল্যও স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রয়েছে। পণ্যদ্রব্যের সরবরাহও সন্তোষজনক রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ কৃষকরা আউস ফসল কাটছেন। কৃষকরা আবার অন্যান্য ধরনের ধানও রোপন করছেন।
সেনাবাহিনীর দলটি মুন্সীগঞ্জের আভ্যন্তরে টঙ্গিবাড়ি, সিরাজদি খান, রামপাল (ঐতিহাসিক স্থান) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ সফর করেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, সেনাবাহিনী পদ্মা-নদী দিয়ে মাওয়া, ভাগ্যকুল এবং কুমারভোগ অতিক্রম করার কালে লৌহজঙ্গে জনসাধারণ তাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান।
ইতিমধ্যে মুন্সীগঞ্জ মহকুমার ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য এবং শান্তিপূর্ণ জনসাধারণ তাদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তিকমিটির সভা অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকতে দেখা গিয়েছে। তারা ভারতীয় দালালদের হাত থেকে তাদের নিজেদের ভূমি রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।
এদিকে শান্তিকমিটির নেতা জনাব আবদুল হাকিম বিক্রমপুরী ইতিমধ্যেই ৬৮টি ইউনিয়ন কাউন্সিলের নেতৃস্থানীয় জনসাধারণকে, সেনাবাহিনীর দল তাদের স্থানে উপনীত হলে, সেনাবাহিনীকে তাদের সহযোগিতা দানের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রত্যেকটি এলাকার জনসাধারণই স্থানীয় জনসাধারণের প্রতি সেনাদলের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছেন। জনসাধারণ ও সেনাদল সন্তুষ্টির সঙ্গে তাদের মতবিনিময় করেন।
১২ই মে ১৯৭১। বাঙালি-সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী বলে আখ্যা ও শহীদ মিনারকে কটাক্ষ করে ‘সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের ইতি হোক’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
হিন্দুস্থানী-সংস্কৃতি মুসলমান-সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে পূর্ব-বাংলার সংস্কৃতির ক্ষেত্রের প্রচ- ক্ষতি সাধন করেছে। যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় শ্লোগানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বাক্য দুটো বাদ পড়ে এগুলোর স্থান দখল করে নিয়েছিল ‘জয়বাংলা’। মুসলমানী ভাবধারা পুষ্ট জাতীয় সঙ্গীতের স্থান দখল করেছিল মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু কবির রচিত গান। [...] শহীদ দিবসের ভাষা-আন্দোলনে আত্মত্যাগী মুসলমান ছাত্রদের জন্যে দোয়া কালাম পড়ে মাগফেরাত কামনার পরিবর্তে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনার্থে হিন্দুয়ানী কায়দা, নগ্ন পদে চলা, প্রভাত ফেরী, শহীদ মিনারের পাদদেশে আল্পনা আঁকা ও চ-ীদেবীর মূর্তি স্থাপন ও যুবক-যুবতীদের মিলে নাচ-গান করা মূলত ঐ সকল পত্র-পত্রিকা, বই-পুস্তক ও সাংস্কৃতিক মাধ্যগুলোর বদৌলতেই এখানে সম্ভব হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে জাতীয় চরিত্র বিনষ্টের চেষ্টাও অনেক করা হয়েছে। 
১৩ই মে ১৯৭১। স্বাধীন বাংলাদেশকে অস্বীকার করে ‘জয়বাংলা ধর্মমত’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] এ নতুন জাতির নাম হল ‘জয়বাংলা’ জাত। তাদের কলেমা ও সালাম-কালাম হল ‘জয়বাংলা’। তাদের দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। তাদের ধর্মের নাম বাঙালি ধর্ম। এ ধর্মের প্রবর্তকের নাম দিয়েছে তারা বঙ্গবন্ধু।
১৩ই মে ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের দমনের পন্থা বাতিয়ে দিতে ‘হিন্দুস্থানী বেতারের আরেক উষ্কানী’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] কর্তৃপক্ষ সমীপে আমাদের অনুরোধ হচ্ছে, তারা যত তাড়াতাড়ি এসব দুষ্কৃতিকারী দমনকল্পে থানা এবং ইউনিয়ন ভিত্তিক প্রশাসন-যন্ত্রকে পুনর্বহাল ও সক্রিয় করে তুলতে সচেষ্ট হবেন ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল। [...] বিভিন্ন জায়গায় যেসব শান্তিকমিটি গঠিত হয়েছে/হচ্ছে কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সেগুলোও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 
১৭ই মে ১৯৭১। মিরপুর, লালবাগ ও চকবাজারে কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির কয়েকটি ঘরোয়া সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ওমরাও খান, খাজা খয়ের উদ্দিন, আবুল কাসেম, মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আফসার উদ্দিন, দেওয়ান আলী প্রমুখ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিল। মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ওমরাও খান বলে, ‘দেশ এক সঙ্কটজনক সময়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান রক্ষার জন্য সশস্ত্র-বাহিনী ঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। [...] সশস্ত্রবাহিনীর কার্যাবলী আল্লাহর অবদান। [...] বর্ষা বা অন্য যে-কোনো ঋতুই হোক না কেন পাকিস্তানের শত্রুদের সমানভাবেই সায়েস্তা করা হবে।’  পাকিস্তানের শত্রুদের ধরিয়ে দেওয়া ও সামরিকবাহিনীকে সাহায্য দানের জন্য সে পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী জনগণের প্রতি আবেদন জানায়। সে সামরিকভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ রাখার জন্যও আহ্বান জানায়। সে বলে, ‘পাকিস্তানের শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানে রাজনীতি বিলাস। পাকিস্তানে এখন কেবল মাত্র দুটো দলের অস্তিত্ব রয়েছে। এর একটি হচ্ছে পাকিস্তান পার্টি ও অপরটি হচ্ছে পাকিস্তান দুশমন পার্টি। পাকিস্তান দুশমন পার্টিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। [...] পাকিস্তান টিকে থাকলে রাজনীতি করার জন্য আপনারা যথেষ্ট সময় পাবেন। [...] ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের ধরিয়ে না দিলে বা তাদের নিশ্চিহ্ন করার ব্যাপারে সাহায্য না করলে শান্তিতে বসবাস করা যাবে না।’ 
১৭ই মে ১৯৭১। ৫৫-জন বিশিষ্ট রাজাকাররা একটি বিবৃতি প্রকাশ করে ‘ভারতের দুরভিসন্ধিমূলত প্রচারণার নিন্দা’-শীর্ষক শিরোনামে। বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করে তারা হচ্ছে―ড. সাজ্জাদ হোসেন, প্রিন্সিপ্যাল ইব্রিহিম খাঁ, ড. মীর ফখরুজ্জামান, ড. কাজী দীন মোহামবমদ, নূরুম মোমেন, জুলফিকার আলী, আশকার ইবনে শাইখ, মোহর আলী, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, মিসেস আর্জুমান্দ বানু, মিসেস ফেরদৌসী রহমান, সাইয়েদ মর্তুজা আলী, কবি ফররুখ আহমেদ, বদরুদ্দিন, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আকবর উদ্দিন, প্রিন্সিপ্যাল আ.ক.ম. আদমুদ্দিন প্রমুখ রাজাকাররা।
১৮ই মে ১৯৭১। মওলানা আশরাফ আলী (পূর্ব-পাকিস্তান জামায়াতে-উলেমায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সাধারণ সম্পাদক) ইসলামিল আদর্শ ও মুসলিম জাতীয়বাদের ভিত্তিতে পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। সে বলে, ‘আজ আমাদের উচিত সময়ের ডাকে সারা দিয়ে, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে, সাচ্চা মুসলমান হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা আবশ্যক। পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের নগ্ন হস্তক্ষেপ ও ভারত-কর্তৃক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার পুনরায় একথাই প্রমাণ করে যে, ভারত পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে কখনও রাজি নয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভারত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অখ-তা বিনষ্ট করার চেষ্টা করে আসছে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে সা¤্রাজ্যবাদী ভারত এখন পাকিস্তানকে নস্যাৎ করার জন্য এক দুরভিসন্ধিমূলক কৌশল অবলম্বন করছে। কিন্তু ভারতের একথা জেনে রাখা উচিত যে, পাকিস্তান আল্লাহর এক ‘মহান অবদান’ এবং আমাদের দুশমনরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করার যত ফন্দিই করে না কেন, আমরা তাদের সকল ষড়যন্ত্র যে-কোনো মূল্যে নস্যাৎ করে দিব। আমাদের জনসাধারণ হিন্দুস্থানের আসল স্বরূপ ধরে ফেলেছে। তারা এখন ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে, আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্যই ভারত আমাদের পথঘাট, সেতু ও সরকারি সম্পত্তির অশেষ ক্ষতিসাধন করছে।’ 

১৯শে মে ১৯৭১। ‘ইসলাম ও পাকিস্তান’ শব্দ দুটোর প্রতি শ্রদ্ধা জাগাতে ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের দমনের পর’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] একে একে দুটো যুগ ধরে পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানরা ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের যে অনৈসলামিক অনাচার ও অধিকার দেখে আসছে তাতে তারা এখন ‘ইসলাম ও পাকিস্তান’ শব্দ দুটোর প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে বসেছে। 
২১শে মে ১৯৭১। চট্টগ্রাম। লালদীঘি। নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মওলানা সিদ্দিক আহমদ, শান্তিকমিটির সদস্যদের প্রতি, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলে, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী ও সমাজদ্রোহীদের কার্যকলাপ প্রতিহত করার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করা শুধুমাত্র শান্তিকমিটির নয়, বরং প্রত্যেক পাকিস্তানি নাগরিকের কর্তব্য। [...] যখন ভারতের মুসলমানরা অমানুষিক আচরণ ভোগ করছেন তখন অতি সম্প্রতি আমাদের একশ্রেণীর লোক হিন্দুদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।’  চট্টগ্রাম শান্তিকমিটির উদ্যোগে আহূত এই সভার সভাপতির ভাষণে মাহমুদুন্নবী চৌধুরী পাকিস্তানের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে ভারত ও পাকিস্তানের হিন্দুদের দ্বারা সংঘটিত একের-পর-এক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলে, ‘পাকিস্তানের দুশমনদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রত্যেক দেশপ্রেমিক নাগরিকের কর্তব্য। সেকোনো ব্যক্তি যে-কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে অবিলম্বে সে শান্তিকমিটির সাহায্য গ্রহণ করবে। যে-স্থানে শান্তিকমিটি গঠিত হয়নি, সেখানে গঠনের পরামর্শ দিচ্ছি।’  হালি-শহর হাউজিং এ্যাস্টেট ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট গোলাম জিলানি বলে, ‘উন্নয়নের হৃত সুযোগ-সুবিধা দ্রুত পরিপূরণের জন্য অতীতের চাইতে পূর্ণ শান্তি ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা আজ সর্বাধিক প্রয়োজন। [...] মোহাজেরেরা পাকিস্তানের জন্য রক্ত দান করেছে। এসময়ে পাকিস্তানের হেফাজত করার জন্য পুনরায় তাদের রক্তদান করা উচিত এবং ভবিষ্যতে যে-কোনো সময়ে পাকিস্তানের সংহতির জন্য প্রয়োজনে তারা রক্তদান করবে।’  কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির সদস্য এডভোকেট আবু সালেক বলে, ‘ভারত পূর্ব-বাংলার জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে দিচ্ছে; কিন্তু পশ্চিম-বাংলার বাঙালির ক্ষেত্রে এই বাস্তব সত্যটা ভুলে গিয়েছে। পাকিস্তানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু ভারতে বাংলা ভাষার প্রতি কোনো রূপ সম্মান নেই।’  এছাড়াও এই সভায় বক্তৃতা রাখে মওলানা নূর মোহাম্মদ খান কাদরী, মওলানা আবদুল মোনায়েম, এ.এফ.এম. হাসান, কামালুদ্দিন, মওলানা শামসুদ্দিন, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ রাজাকাররা।
২৩শে মে ১৯৭১। করাচি। জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল চৌধুরী রহমতে এলাহি নতুন আদমশুমারির ভিত্তিতে দেশে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে, এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলে, ‘স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় আমাদের ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে। [...] পূর্ব-বাংলায় অর্থনৈতিক জীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। [...] মিল-কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। [...] এখন রাষ্ট্র-ক্ষমতা হস্তান্তর করা ঠিক হবে না।’  সে মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করে পূর্ব-বাংলার সঙ্কট-সমস্যা সমাধান করে পাকিস্তানকে বাঁচানোর জন্য সশস্ত্রবাহিনীর প্রশংসা করে। সশস্ত্রবাহিনীকে সাহাস্য করার জন্য পাকিস্তানিদের ধন্যবাদ জানায়। সে ভারতকে পাকিস্তান-বিরোধী ষড়যন্ত্র করার জন্য অভিযুক্ত করে মন্তব্য করে, ‘সমগ্র পূর্ব-বাংলা সশস্ত্রবাহিনী নিয়ন্ত্রণে আছে।’ 
২৩শে মে ১৯৭১। ইয়াহিয়া খানের ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালির উপর আক্রমণকে প্রশংসা করে ‘ওরে আয় ফিরে আয়’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ভারত ও তার চরদের প্ররোচনা ও প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে যেসব আইনানুগ নাগরিক সীমান্তের পরপারে গিয়ে অশেষ কষ্ট ভোগছেন প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান তাদের স্বদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এ আহ্বান সময়োপযোগী হয়েছে। এ আহ্বান আমাদের বিভ্রান্ত ও বিপথগামী ভাই-বোনদের প্রাণে আশার সঞ্চার করবে। একতরফা ও একটানা প্ররোচনা ও প্রচারণায় স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে তারা যে অমানুষিক দুর্ভোগের শিকার হয়েছিলেন আশা করি এবার তার অবসান ঘটবে। [...] সবকিছুই ভুল নেতৃত্বের কুফল। ভ্রান্ত নেতৃত্বের যে বিপুল খেসারত এ অঞ্চলবাসীকে দিতে হল, তার ক্ষতিপূরণ কতদিনে সম্ভব তা কে বলতে পারে, তথাপি আমাদের শেষরক্ষা খোদা যে করলেন, সেজন্য আমরা খোদার কাছে কৃতজ্ঞ। এ ব্যাপারে আমাদের সেনাবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও ত্যাগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাদের সময়োচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া কিছুতেই আমরা ব্রাহ্মণ্য-সা¤্রাজ্যবাদের খপ্পর থেকে মুক্তি পেতাম না। [...] ক্ষমতার লালসা মানুষকে দেশবিক্রেতাও করতে পারে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে আওয়ামী নেতৃত্বই পয়লা কলঙ্কজনক নজীর কায়েম করল। বলা বাহুল্য, শেষ-পর্যন্ত আমাদের সেনাবাহিনী ও জনতার সচেতন পদক্ষেপ যদিও দেশ ও দেশের জনতাকে ভারতীয় ধ্বংসম্পৃহার হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তথাপি আওয়ামী ভ্রান্ত নেতা ও ফ্যাসিবাদী কর্মীদের একতরফা প্ররোচনা, প্রচারণা ও জবরদস্তির শিকার হয়ে কিছু লোক ভারতে চলে গেছে।
২৪শে মে ১৯৭১। ‘পূর্ণ নিরাপত্তাবোধের পূর্বশর্ত’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
যে শান্তিকমিটি গঠনের সুযোগ তিনি [ইয়াহিয়া] দিয়েছেন তা থেকেও নাগরিকদের ভেতরে নিরাপত্তাবোধ গাঢ় হয়েছে। প্রদেশের সর্বত্র দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসছে। দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা প্রায় উধাও হয়ে পরপারে চলে গেছে।
২৫শে মে ১৯৭১। ২১-নং সামরিক অধ্যাদেশ জারি করায় মিউনিসিপ্যাল কমিটি বাতিল হয়ে যায়, তাই জনপ্রতিনিধির জায়গায় ক্ষমতায় বসে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের মনোনীত দালালরা।
২৫শে মে ১৯৭১। ভৈরব। আবদুল মান্নানকে সভাপতি করে ২৭-সদস্যবিশিষ্ট শান্তিকমিটি গঠন করা হয়। একই দিন জামায়াতে-ওলামায়ে ইসলামের পীর মোহসেন উদ্দীন বলে, ‘যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গেছে তারা ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী।’
২৫শে মে ১৯৭১। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রসংশা করে ‘আত্মসমপণের আহ্বান’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
কেননা তাদের জানা উচিত যে পাক-সেনাবাহিনী যেখানে হিন্দুস্থানী সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী ও তাদের দোসরদের সুসংগঠিত শক্তিতে তচনচ করে দিতে পেরেছেন, সেক্ষেত্রে এদেশে গেরিলাগিরির নামে বর্তমানের দুষ্কৃতি দমনও তাদের পক্ষে অতি সহজ ব্যাপার।
হিন্দুস্থানী প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে এখনও যারা দুশ্চিন্তায় লিপ্ত কিংবা অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তায় নাশকতামূলক কাজের দ্বারা নাগরিক জীবনের শান্তি বিঘিœত করতে প্রয়াসী তাদের অতিসত্বর উল্লেখিত আহ্বানে সাড়া দেওয়া উচিত, এতেই তাদের নিজের, পরিবারবর্গের ও সামাজের কল্যাণ নিহিত। 
২৫শে মে ১৯৭১। আওয়ামী লীগকে দোষারূপ করে ‘আহ্বান’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পূর্ব-পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষের কল্যাণ সাধন, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দোহাই দিয়ে দুষ্কৃতিকারীরা যা করছে তা কোনোক্রমেই জনগণের মঙ্গলের সহায়ক ছিল না। স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনের অর্থ দেশকে বিচ্ছেন্ন বা খ--বিখ- করা নয় আর দাবী আদায়ের অর্থও দেশে অরাজকতায় সা¤্রাজ্য বিস্তার করা নয়। [...] নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের এমনি ধরনের কার্যকলাপ শুধুমাত্র দেশ, দেশবাসী ও পূর্ব-পাকিস্তানের সরল প্রাণ মানুষের জন্য দুঃখ ডেকে আনেনি, পক্ষান্তরে এই চক্রান্ত মুসলিম বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। পূর্ব-পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ঘৃণ্য পরিকল্পনা নিয়ে দুষ্কৃতিকারীরা প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে অশুভ তৎপরতায় মেতে উঠে। [...] যে দেশটি গোড়া থেকেই পাকিস্তানকে বরদাশত করতে পারে না, সে দেশের শাসকরা নানা ছল ছুঁতোয় পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিলোপ করতে চায়, সেই মুসলমান বিদ্বেষী দেশের সঙ্গে আঁতাত করার পিছনে আওয়ামী লীগের কি উদ্দেশ্য ছিল তা কি পাকিস্তানের অধিবাসীদের জানতে বাকী আছে? চক্রান্তের পরিণতি চিরদিন যা হয়ে থাকে আওয়ামী লীগের ভাগ্যেও তাই ঘটেছে। 
২৭শে মে ১৯৭১। মুসলিম জাতীয়তাবোধ ও সাংষ্কৃতিক চেতনা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে’ ‘কবি নজরুল ইসলাম’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
তাঁর ব্যবহৃত মুসলমানী শব্দে বাংলা ভাষা যে বৈপ্লবিক রূপ লাভ করে, পরবর্তী পর্যায়ে মুসলিম বাংলা-সাহিত্য সে পথ ধরেই অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু আজাদী হাসিলের পর থেকে কয়েক বছর আমাদের সাহিত্য ও সংবাদপত্রে সে রীতি অনুসৃত হয়ে আসতে থাকলেও প্রতিবেশী ব্রাহ্মণ্য সাংস্কৃতি ষড়যন্ত্রের চক্রান্ত সক্রীয় হয়ে ওঠায় বর্তমানে আমাদের সংবাদপত্র ও সাহিত্যে নজরুল রীতি যেন বাদ পড়ে যাচ্ছে। অনেক মুসলিম লেখক পর্যন্ত লক্ষ্যে অলক্ষে উক্ত ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে আজকাল একদিকে নিজেদের সুবিধামফিক নজরুলকে ব্যবহার করলেও শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর নীতির অনুসরণ করতে যেন তারা পেঁয়াজের গন্ধ পান। এটা মুসলিম জাতীয়তাবোধ ও সাংষ্কৃতিক চেতনা সৃষ্টিতে নজরুল আদর্শের বিরোধীতার নামান্তর ছাড়া কিছু নয়।

২৭শে মে ১৯৭১। পাকিস্তানের সঙ্কটময় অবস্থা ও অর্থনৈতিক দুর্গতির জন্য আওয়ামী লীগকে দোষারূপ করে ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] আওয়ামী লীগের যেসব সদস্য মূলত বিচ্ছিন্নতা চাননি, অথচ দলের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও ছিল না, এরূপ পাকিস্তানবাদী সদস্যদের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি হবে না [...]। তাদের স্বতন্ত্র অথবা কোনো বৈধ দলের সদস্য হিসেবে বহাল রেখে বর্তমান গোলযোগপূর্ণ অবস্থা ও অর্থনৈতিক দুর্গতির কারণে উপনির্বাচন সম্ভব নয় বলে অবশিষ্ট আসনগুলোর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা দরকার। [...] আওয়ামী লীগের অভিযুক্ত সদস্যদের প্রকাশ্য ট্রাইবুন্যালে বিচার হওয়া প্রয়োজন। তাহলে দেশ ও বিদেশের সবাই তাদের সরকারি চক্রান্ত সম্পর্কে পূর্ব ওয়াকেফহাল থাকতে পারবে। ফলে সব ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান ঘটবে। [...] বিশেষত, এ অঞ্চলে যে ব্যাপক অসন্তোষ ও উচ্ছৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে ও ভারত প্রেরিত অস্ত্রে এমনকি জেল-ভাঙা দুষ্কৃতিকারীরাও যেভাবে সুসজ্জিত রয়েছে তাতে কোনো বেসামরিক সরকার এই দুর্দিনের মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারবে বলে আমরা মনে করি না। তাই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার শর্তটির প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরাও মনে করি।
২৮শে মে ১৯৭১। পাকিস্তান ও পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী ও নির্ভরযোগ্য রাজাকারদের সমন্বয়ে একটি বেসামরিক পোশাকধারী বাহিনী গঠনের আহ্বান জানিয়ে ‘বিভিন্ন স্থানে হত্যাকা-’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
এসব হত্যাকা-ে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের সকলেই পাকিস্তানবাদী ও জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী বলে জানা যায়। শান্তিকমিটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিও নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বলে প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যাঁরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন তাঁদের গোপন পত্র মারফত দুষ্কৃতিকারী হুমকি দিয়ে চলেছে।
আমাদের সেনাবাহিনী দুষ্কৃতিকারী দমন অভিযান অব্যাহত রেখেছেন সন্দেহ নেই এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁরা যেভাবে দেশকে হিন্দুস্থানী অনুপ্রবেশকারী ও দুষ্কৃতিকারীদের সুসংগঠিত হামলা থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছেন তেমনিভাবে এসব হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের সত্ত্বরই নির্মূল করতে সক্ষম হবেন।
দেশের আভ্যন্তরে অবস্থানকারী এসব দুষ্কৃতিকারী দমনের ব্যাপারে আমরা ইতিপূর্বেও সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় একাধিক নিবন্ধে বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস পাকিস্তান ও জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী নির্ভরযোগ্য লোকদের সমন্বয়ে একটি বেসামরিক পোশাকধারী বাহিনী গঠন করে তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে অতি তাড়াতাড়ি এসব দুষ্কৃতিকারীকে নির্মূল করা সহজ হবে। 
৩০শে মে ১৯৭১। মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও ভ্রাম্যমান ‘স্বাধীন বাংলা বেতার’ সম্বন্ধে ‘হিন্দুস্থানের অমার্জনীয় ভূমিকা’-শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
শুধু তাই নয়, এজন্যে তারা সীমান্তের ওপারে বহু সংখ্যক যুবককে দুষ্কৃতির ট্রেনিংও দিচ্ছে বলে তাদের স্বীকারোক্তি থেকেই জানা যায়। রাষ্ট্রদ্রোহী এ দুষ্কৃতিকারীদেরকে তারা একটি ভ্রাম্যমান রেডিও স্টেশনও দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকাশ্যে ট্রাকের উপর স্থাপিত উক্ত রেডিও স্টেশনটি নাকি খবর প্রচারকালে পাক-সীমান্তের কাছাকাছি স্থানে স্থানান্তরিত করা হয় এবং পাক-বাহিনীর আগমন মাত্র তা হিন্দুস্থানের আভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। 

৩০শে মে ১৯৭১। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে সাত সদস্য কমিটি’-শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পূর্ব-পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-পদ্ধতি পুনর্গঠনের জন্য প্রাদেশিক গভর্নর সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছেন। নি¤œলিখিত ব্যক্তিবর্গ কমিটির অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, ড. হাসান জামান (ডিরেক্টর জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো ও সদস্য সেক্রেটারি), ড. মোহর আলী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য), জনাব এ.এফ.এম. আবদুর রহমান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য), ড. আবদুল বারী (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য), ড. সাইফুদ্দিন জোয়ারদার (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য) ও ড. মকবুল হোসেন (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সদস্য)।

জুন
১লা জুন ১৯৭১। বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে ‘বুদ্ধি-ব্যবসায়ী’ বলে উল্লেখ করে ‘স্বরূপ কালসাপ’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সংবাদ বিচিত্রায়, সীমান্তের ওপারে পালিয়ে যাওয়া জনৈক শ্মশ্রুম-িত পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী অর্থাৎ বুদ্ধি-ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছিল। তিনি এককালে এখানকার বাংলা একাডেমীর প্রধান ছিলেন। যিনি পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা-বিভাগে চাকুরি নেন। আকাশবাণী প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস ও এর পটভূমিকে যেভাবে বিকৃত করে তুলে ধরেছেন তা বিস্ময়কর। বিস্ময়কর এজন্য যে এ-জাতীয় ব্যক্তিরাই আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে সওয়ার ছিলেন। [...] মুনিবদের খুশি করার জন্য এও বলেছেন যে, আমাদের যুব-সমাজ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞান করে না। তাদেরকে এ-দুই সম্প্রদায়ের পূর্বেকার সম্পর্কের কথা বোঝাতে চাইলেও তারা বুঝে না। তারা বলে হিন্দু ও মুসলমানের আবার কীসের বিরোধ? বলা বাহুল্য এহেন বুদ্ধি-ব্যবসায়ীর সংশ্রব থেকে এরকম দৃষ্টিভঙ্গির যুবক সৃষ্টি না হয়ে উপায় নেই, ভদ্রলোককে একথা কে জানাবে? 
২রা জুন ১৯৭১। ‘ভারতের শরণার্থী ব্যবসায়ে সঙ্কট’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সীমান্তের ওপারে চলে যাওয়া পাকিস্তানি নাগরিকদের পূর্ব-পাকিস্তানে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু ভারত সরকার আন্তর্জাতিক যে সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছে তা বন্ধ হয়ে যাবে দেখেই শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিতে গড়িমসি করছে। ভারতের শরণার্থী ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য ধুয়া তুলছে যে, শরণার্থীদের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার অনুকুল পরিবেশ নেই। 
৩রা জুন ১৯৭১। ‘হিন্দুস্থানে পলাতকদের গ্রেফতার’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ভারত এ নীতি নিয়েছে যে, হিন্দু হলে শরণার্থী এবং মুসলমান হলে অনুপ্রবেশকারী। খাবার ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও হিন্দু মুসলমানের বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো শিবিরে মুসলমান যুবকদের আলাদা করে গুলি করে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটেছে।
৬ই জুন ১৯৭১। ‘পাকিস্তানের আইন শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রিলিফ পুনর্বাসন প্রচেষ্টায় সেনাবাহিনী’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
২৬শে মার্চ মধ্যরাতের ঠিক পূর্ব-মুহূর্তে সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। বিদ্রোহীরা শহরের উল্লেখযোগ্য সকল রাস্তায় বড় বড় গাছের শাখা, পুরনো গাড়ী, রোড রোলার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে। এমনকি সেনাবাহিনীর চলাফেরা রোধ করার জন্য ইট দিয়ে দেওয়ালও গেঁথে তোলা হয়। এমনকি সেনাবাহিনী চরমপন্থীদের ঘাঁটি বলে পরিচিত নির্দিষ্ট ও বিশেষ বিশেষ জায়গা, বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্রের গুদাম, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর দিকে অগ্রসর হন। চরমপন্থী ছাত্রদের সদর দফতর জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে সেনাবাহিনী মর্টার ও মেশিনগানের গুলির সম্মুখীন হন। ইপিআর হেডকোয়ার্টার ও কয়েকটি পুলিশ স্টেশনে তীব্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়, কিন্তু দ্রুত কর্মতৎপরতা দিনের সূর্যোদয়ের আগেই দুষ্কৃতিকারীদের সকল ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং পরদিন সকালেই ঢাকা শহর শান্ত আকার ধারণ করে।
৬ই জুন ১৯৭১। মওদুদী বলে, ‘পাকিস্তানে মুসলমানরা কখনই পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়নি। বিচ্ছিন্নতাবাদের চক্রান্ত জোরদার করার জন্যে তারা শেখ মুজিবকে ভোট দেয়নি। বিশেষ একশ্রেণীর চরমপন্থীই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্যে দায়ী। মূলত তারা হিন্দু অধ্যাপকের কাছে স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা পেয়েছে। ইসলামি শিক্ষায় এরা শিক্ষিত নয়। সমাজের এই বিশেষ শ্রেণীটি হিন্দু লেখকদের লেখা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। [...] হিন্দুরা ইহুদির সমতুল্য, ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষী।’  মওদুদী হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কারণ ব্যাখ্যা করে বলে, ‘আইয়ুব শাসন শেষ হওয়ার পর নয়াযুগ শুরু হলে বামপন্থীদের পাকিস্তান খ-বিখ- করার চক্রান্ত গোপন থাকে না। তারা আঞ্চলিক ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি এবং উস্কানি দিয়ে দেশকে বর্তমানে দুটো অংশে পরিণত করে। শেখ মুজিবের দল গু-ামি ও মারামারি করে নির্বাচনে জয়ী হয়। নির্বাচনের পর শেখ মুজিব ‘ছয়দফা’র পক্ষে জোর প্রচার চালাতে থাকে। ‘ছয়দফা’ হচ্ছে দেশকে বিভক্ত করার দফা। শেখ মুজিবের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে সরকারি কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে তাদের দলে ভিড়ে, জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে ফেলে এবং জাতীয় সঙ্গীতের বদলে হিন্দু কবি রবীন্দ্রনাথের কবিতা জাতীয় সঙ্গীতরূপে গীত হতে থাকে। পাকিস্তানের নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ। এরূপ পরিস্থিতিতে সামরিকবাহিনীর হস্তক্ষেপই ছিল যৌক্তিক।’
৬ই জুন ১৯৭১। কুমিল্লা। পিডিপি আঞ্চলিক শাখার সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির সদস্য এডভোকেট জলিল বলে, ‘এ-অঞ্চলে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও দুষ্কৃতিকারীদের অত্যাচারে জনগণের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তবে সেনাবাহিনীর আগমনে তা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।’ 
৭ই জুন ১৯৭১। ‘পলাতক অপরাধী প্রসঙ্গে’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
২৫শে মার্চের পূর্বে স্বার্থবাদী মহল প্রদেশের বিভিন্ন জেল থেকে আট হাজার অপরাধীকে মুক্ত করে দিয়েছেন। [...] জাতির জন্য এটাকে দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। তারা সমাজ-বিরোধী চোর-ডাকাতদের হাত থেকে নিজেদের জানমাল রক্ষার জন্য যাদেরকে জেলে আবদ্ধ করেছিল, সেই চোর-ডাকাতদেরই জাতির মুক্তির নামে স্বার্থবাদী মহল জেল থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। যেদিন জনৈক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রায় লক্ষাধিক লোকের এক সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি গোলযোগ সৃষ্টি ও হত্যাকা-ে জড়িত অপরাধীদের রাজবন্দি বলে তাদের মুক্তির দাবী জানিয়ে বলেছিলেন যে, এসব বন্দিকে ছেড়ে না দেওয়া হলে তারা ৭ই ডিসেম্বর ফুলের মালা গলায় দিয়ে বের হয়ে আসবে, তখনই আমরা এ উস্কানিমূলক উক্তির আসল লক্ষ্য উপলব্ধি করে এর কঠোর নিন্দা করেছিলাম এবং ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সকলকে হুঁশিয়ার থাকতে বলেছিলাম।
৮ই জুন ১৯৭১। জুনের প্রথম সপ্তাহের পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া খানের বেতার-ভাষণে স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহকারী বাঙালি সৈন্য ও পুলিশদের আত্মসমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেন। এই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সম্প্রতি গোলাযোগের সময় চরমপন্থী এবং অনুগত নেতাদের প্ররোচণায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলস এবং পুলিশের যেসব কর্মচারী নিজ নিজ ইউনিট ফাঁড়ি এবং থানা থেকে পালিয়ে রাষ্ট্র-বিরোধী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করেছিল সরকার সেসব দলত্যাগী সেনাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। [...] সেক্ষেত্রে এধরনের আহ্বান পাকিস্তান সরকারের পরম উদারতা ও সহানুভূতি সম্পন্ন মনোভাবেরই পরিচয় বহন করে। যে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এসব কর্মচারী ভুল পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল, সে অবস্থার কথা বিবেচনা করেই এ আহ্বান জানিয়েছেন। ঐ অবস্থাটি উপলব্ধির জন্য সত্যই সরকার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। [...] সুতরাং আমরা মনে করি, নিজের ব্যক্তি জীবন ও পরিবার পরিজনকে দুঃখ, কষ্ট ও মানসিক অশান্তির হাত থেকে রক্ষাকল্পে প্রত্যেক দলত্যাগী পুলিশ কর্মচারীর উচিত সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রদত্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। 
৯ই জুন ১৯৭১। ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর কথা, ‘ইদানীং কলকাতা ও আগরতলা বেতার থেকে অহরহ পূর্ব-বাংলার জনতাকে মীরজাফর হত্যার আবেদন জানানো হচ্ছে। আমাদের স্বভাবতই প্রশ্ন জাগছে এই মীর জাফররা কারা? সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের তথাকথিত বাঙালি প্রেমিকদের ক্রিয়াকল্পে পূর্ব-বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা হাড়ে হাড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অথচ এই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাই এ-অঞ্চলের বাসিন্দা। যারা ‘আল্লাহু আকবর’ ছেড়ে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি তোলে, সালাম-কালাম ভুলে ‘জয়বাংলা’ জিগির চালায়, শহীদ মিনারে চ-ীদেবী পূজা করে, বর্ষবরণে যুবক-যুবতীরা মিলে সূর্যদেব ও প্রকৃতি দেবীর অর্চনার নামে কেলী চালায়, হিন্দুর প্রেমে যারা বাঙালি মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, ভারতের প্রেমে পাকিস্তানের বুকে ছুরি হানে, তারা মীর জাফর হল না, মীর জাফর হল ইসলাম ও পাকিস্তানের পতাকাবাহীরা?’
৯ই জুন ১৯৭১। ‘ভারতের উদ্বাস্তু ধুয়ার অন্তরালে’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
তথাকথিত পাকিস্তানি উদ্বাস্তুদের নাম করে ভারত ইতোমধ্যে ১২ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্র লাভ করেছে এবং আরও ২০ কোটি টাকা লাভের আশা করছে। মানবিক সাহায্যের অজুহাতে প্রকৃতপক্ষে ভারতের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণ করা।
৯ই জুন ১৯৭১। ‘পুনর্বাসন কাজে সেনাবাহিনীর আত্মনিয়োগ’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সেনাবাহিনী পুনর্গঠন এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত এক ব্যাপক পরিকল্পনায় নিয়োজিত হয়েছে। 
১০ই জুন ১৯৭১। সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের নিকট হাজির হতে ব্যর্থ হওয়ায়, ৪০-নং সামরিক আইনের বিধির অধীনে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়। তারা হচ্ছেন―(১) তাজউদ্দীন আহমেদ (সাত মসজিদ রোড, ঢাকা), (২) তোফায়েল আহমেদ (কোরালিয়া, বাকেরগঞ্জ), (৩) এ.এম. নজরুল ইসলাম (লাঙ্গল শিমুল, ময়মনসিংহ), (৪) আবদুল মান্নান (সিদ্বেশ্বরী, ঢাকা), এবং (৫) ‘দি পিপলস’র মালিক আবদুর রহমান (সিদ্বেশ্বরী, ঢাকা)। তাদের প্রত্যেকের সম্পত্তির শতকরা ৫০-ভাগ বাজেয়াপ্ত করা হয়।
১২ই জুন ১৯৭১। ফিরোজপুরের শান্তিকমিটির প্রেসিডেন্ট খানবাহাদুর সৈয়দ মোহাম্মদ আফজাল বানারিপাড়ায় অনুষ্ঠিত এক সভায় ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে যে, ছাত্রদের দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ এবং তাদের নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের, বিশেষ করে ঈমান, ঐক্য ও শৃঙ্খলা―কায়েদে আজমের এই তিন বাণীর প্রতি গর্ব করা উচিত। ভারত ও আওয়ামী লীগের শঠতাপূর্ণ প্রোপাগান্ডা সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য সে হুঁশিয়ার করে দেয়। এছাড়া আবদুস সাত্তার, আবদুল মান্নান, সৈয়দ আবদুল বারি ও মোহাম্মদ আবদুল গণি মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মকা-ের নিন্দা করে বক্তৃতা দেয়।
১৩ই জুন ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্যে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
একটা জাতির জন্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ যত না মারাত্মক তার চাইতে আভ্যন্তরীণ শত্রুর শত্রুতা জাতির জন্য অধিক ভয়াবহ সঙ্কট ডেকে আনে। আমাদের বর্তমানে জাতীয় সঙ্কটও ইতিহাসের সেই অমোঘ বিধানেরই সঙ্কট। এদিক থেকে এবার জাতীয় সঙ্কট মুহূর্তে দেশপ্রেমিক পাকিস্তানিরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার যে-দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যই প্রশংসনীয়। [...] গেরিলাগিরির নামে যেসব দুষ্কৃতিকারীরা দেশের শান্তি ব্যাহত করতে প্রয়াসী, সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার নিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতেই দুষ্কৃতিকারীদের নির্মূল করার জন্যে শান্তিকমিটির অধীনে গ্রাম-প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করতে হবে। 
১৪ই জুন ১৯৭১। ভারত থেকে ফিরে আসা হিন্দু বাঙালি সম্বন্ধে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, হিন্দু ভারত থেকে যারা ফিরে এসেছে তারা নিদারুণ মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এসে চরম হিন্দুস্থান-বিরোধী ও পাকিস্তান ভক্ত হয়ে পড়েছে। [...] শরণার্থী মুসলমানদের বিবিধ পন্থায় শেষ করার জন্য তারা যে বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে তার খপ্পর থেকে যারা পালিয়ে আসতে পেরেছে তারা স্বভাবতই আমাদের চেয়ে কড়া পাকিস্তানি ও হিন্দুস্থানী বিদ্বেষী হয়েছে। [...] এজন্যই মনে হয় ভারতের পাকিস্তান ধ্বংসের চক্রান্ত মূলত আমাদের জন্যে শাপে বর হল। 
১৪ই জুন ১৯৭১। কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির উদ্যোগে সিলেটে এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল হাফিজের (এডভোকেট) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তৃতা দেয়―আজমল আলী (কেন্দ্রীয় মন্ত্রী), শামসুল হক (জামায়াতে ইসলামির আমির), জালাল উদ্দিন (এডভোকেট), গোলাম জিলানি (এডভোকেট) প্রমূখ। আবদুল হাফিজ তার ভাষণে বলে, ‘ভারত যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে ভারতের মাটিতেই সেই যুদ্ধ হবে। সিলেটের সকল মুসলমান মোজাহিদ হয়ে লড়াই করবে। ভারত পাকিস্তানের জাত শত্রু। পাকিস্তানের সবকিছু ধ্বংস করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।’  আর হিন্দুদের পাকিস্তানের জাতশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বলে, ‘মুসলমানদের জাতশত্রু ইহুদিরা আরব মুসলমানদের যেভাবে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে তেমনি ইহুদিদের পরম বন্ধু হিন্দুরাও একই যোগসাজসে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলুপ্তের কাজ করে যাচ্ছে।’ 
১৫ই জুন ১৯৭১। বাংলাদেশের ওপর সাংস্কৃতিক দখলকে চূড়ান্ত করার জন্যে পাকিস্তানি প্রশাসনিক পর্যায়ে ইসলামি নীতির ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি প্রেসনোটে ঢাকা শহরের ২৪০টি পথ-ঘাটের নাম ‘ইসলামিকরণ’ করা হয়, যেমন―‘লালমোহন পোদ্দার লেন’-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘আবদুল করিম গজনভী স্ট্রিট, ‘শাঁখারী নগর লেন’-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘গুলবদন স্ট্রিট’, ‘নবীন চাঁদ গোস্বামী রোড‘-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘বখতিয়ার খিলজি রোড’, ‘কালীচরণ সাহা রোড’-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘গাজী সালাউদ্দিন রোড’, ‘এস.কে. দাস রোড’-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘সিরাজউদ্দীন রোড’, ’রায়ের বাজার’-এর পরিবর্তিত নাম হবে ‘সুলতানগঞ্জ’ ইত্যাদি।
১৬ই জুন ১৯৭১। বরিশালের ওয়াজিরপুরে থানা ‘শান্তিকমিটি’র উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ-সভায় ভারতের কার্যকলাপের ও আওয়ামী লীগের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে ইসলাম ও পাকিস্তানের আদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষা-ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। এ-সভার সভাপতিত্ব করে আবুল হোসেন। এছাড়াও বক্তৃতা দেয় মতিউর রহমান তালুকদার।
১৬ই জুন ১৯৭১। ভারতকে পাকিস্তান ভাঙার জন্য দায়ী করে ‘বৈদেশিক সাহায্য এবং আমরা’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুস্থান আমাদের দেশ পাকিস্তানকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে তার অনুচরদের সহযোগিতায় পাকিস্তান ধ্বংসের চক্রান্তের ফাঁদ পেতেছিল। এখন হিন্দুস্থান এবং কর্মফলে সৃষ্ট ‘শরণার্থীদের’ সমস্যাকে সম্বল করে গোটা পৃথিবীব্যাপী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বেড়াচ্ছে। আমরা যেসব দেশ থেকে প্রচুর আর্থিক সহযোগিতা লাভ করে থাকি এখন সেসব দেশ তাদের দেওয়া আর্থিক সহযোগিতাকে পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। 
১৭ই জুন ১৯৭১। সরকার ৬৯টি বই বাজেয়াপ্ত করে, যেমন―‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ (লেখক: খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস), ‘শব্দবোধ অভিধান’ (লেখক: আশুতোষ দেব), ‘আলমগীর’ (লেখক: বিনয়কৃষ্ণ মুখার্জী), ‘বাস্তুভিটা’ (লেখক: দিগিচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) ইত্যাদি।
১৭ই জুন ১৯৭১। ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এখনও আসেনি’-শীর্ষক ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর প্রতিবেদনে গোলাম আযম বলে, ‘ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রথমত, জাতীয় পরিষদের অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন। কিন্তু পরিষদ কোথায়? দ্বিতীয়ত, যাদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা ছিল তাদের সে সংগঠন বেআইনী ঘোষিত হয়েছে । [...] দুষ্কৃতিকারীরা এখনও তাদের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত রয়েছে। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো এবং বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করা। পূর্ব-পাকিস্তানের এমন কতিপয় নিভৃত অঞ্চল রয়েছে সেখানে দুষ্কৃতিকারীরা জনগণকে পাকিস্তান রেডিও শুনতে দেয় না। প্রকৃত অপরাধীদের যদি পাকড়াও করা হয়, তবেই পরিস্থিতি দমন করা যেতে পারে।’ 
১৯শে জুন ১৯৭১। পি-ি। হাসমত আলী ইসলামিয়া কলেজের জনসভায় গোলাম আযম বলে, ‘পাকিস্তানের সংহতি ও আঞ্চলিক অখ-তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে দেশের পূর্বাংশে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেখানে যেসব বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিসমূহ কাজ করছে তারা কতিপয় সীমান্ত এলাকা ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের হাতে তুলে দেয়। সেনাবাহিনী দেশের পূর্বাংশে প্রায় সকল দুষ্কৃতিকারীদের উৎখাত করেছে এবং বর্তমানে এমন কোনো শক্তি নেই যে, যা সেনাবাহিনীর প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। [...] বিরোধী ব্যক্তিরা এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে বরং তারা রাতের অন্ধকারে ধ্বংসাত্মক কাজে নিজেদের লিপ্ত রেখেছে। আমার দল দেশের পূর্বাংশে দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা দমন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে এবং এ-কারণেই দুষ্কৃতিকারীদের হাতে বহু জামায়াতের কর্মী শহীদ হয়েছেন। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমার দল দেশের অখ-তা বজায় রাখার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। [...] পাকিস্তান ও ইসলাম এ দুটো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং কেবলমাত্র ইসলামি আদর্শই পাকিস্তানের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারে। পাকিস্তানে ইসলামি জীবন ব্যবস্থার যে এক নব অধ্যায় সূচিত হবে সেদিন আর বেশি দূরে নয়।’ 
২০শে জুন ১৯৭১। লাহোর। সাংবাদিক সম্মেলন। বক্ততা গোলাম আযম। সে বলে, ‘এই উপমহাদেশের মুসলমানরা কোনো চাপের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় তাদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি লাভে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের নেতারা সেই আদর্শের প্রতি বিশ্বাস-ঘাতকতা করেন। যার দরুন সমাজতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের দশ বছরের একনায়কত্ব শাসন দেশের জনগণকে পাকিস্তানের মূল আদর্শ থেকে বিপথে পরিচালিত করে। [...] গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্য দেশের পূর্বাঞ্চল পাকিস্তান থেকে দূরে সরে গেছে, এবং রাজনীতির দিক থেকে তারা মনে করে যে, দেশের প্রশাসনে সম-অংশের সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। যারা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী নয় তারা এই অভিযোগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। [...] যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন রাজনৈতিক দলসমূহকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। [...] পূর্ব-পাকিস্তানের অধিক সংখ্যক অমুসলমানের সহায়তায় শেখ মুজিবুর রহমানের হয়তো বিচ্ছিন্নতার ইচ্ছে থাকতে পারে। তবে শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ্যে কখনও স্বাধীনতার জন্য চিৎকার করেননি। অবশ্য যদিও তার ‘ছয়দফা’ স্বাধীনতাকে সম্ভবপর করে তুলতে পারত। মওলানা ভাসানীই প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতার দাবী তুলেন এবং তার এই ধারণা জনপ্রিয় করে তোলার জন্য গোটা পূর্ব-পাকিস্তান সফর করে বেড়ান। অনুরূপভাবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং আতাউর রহমান খানের দল এই উদ্দেশ্যে সারা পূর্ব-পাকিস্তান সফর করেন। এসব ব্যক্তিই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যার দরুন শেখ মুজিবুর রহমানই উক্ত পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হন। [...] বিচ্ছিন্নতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের তো গ্রেফতার করা হয়নি। তাছাড়া বর্তমানে এসব নেতাই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন পরিচালনা করছেন, বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতারা নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের গণভোট ছিল সর্বাধিক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর। তিনি বিচ্ছিন্নতার জন্য গণভোট চাননি। সুতরাং যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন তাদেরকে পাকিস্তান-বিরোধী বলে চিহ্নিত করা উচিত হবে না। [...] শক্তি নয় বরং গণতন্ত্রই দেশের দুই অংশের ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধন আরও জোরদার করবে। তাছাড়া কর্তৃপক্ষের পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের হৃদয় জয় করা উচিত।’ 
২১শে জুন ১৯৭১। ‘গোলাম আযমের সাংবাদিক সম্মেলন’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকা বলে যে, গোলাম আযম পাকিস্তান সরকারের প্রতি আবেদন জানায় মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী মানুষের অধীনে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য। গোলাম আযম আরও বলে, ‘বিরোধী ব্যক্তিরা এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে বরং তারা রাতের অন্ধকারে ধ্বংসাত্মক কাজে নিজেদের লিপ্ত রেখেছে। [...] আমার দল পাকিস্তানের তৎপরতা দমনের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে এবং এ-কারণেই দুষ্কৃতিকারীদের হাতে বহু জামায়াতের কর্মী শহীদ হয়েছে।’ 
২২শে জুন ১৯৭১। গোলাম আযম এক সাক্ষাৎকারে বলে, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানরা ইসলামকে কখনও পরিত্যাগ করতে পারবে না। এ-কারণে তারা পাকিস্তানকেও ত্যাগ করতে পারবে না। পূর্ব-পাকিস্তান ইসলাম ও পাকিস্তানের জন্য অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করেছে। আরও কোরবানী দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত আছে। [...] একটি স্বার্থান্বেষী মহল এদেশে সবসময়ই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে। বিগত নির্বাচনে জাতি অনেক কিছু আশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে যারা জয়লাভ করেছিল তারা নিজেদের গণতন্ত্র-প্রিয় বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল ফ্যাসিস্ট। [...] প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দেশের নিরাপত্তা ও ইসলামি আদর্শ রক্ষার্থে একটি আইনগত কাঠামো দান করেন। কিন্তু নির্বাচনে যেসব দল জয়লাভ করল তাদের আদর্শ কর্মসূচি শ্লোগান সবই আইনগত কাঠামোর পরিপন্থী ছিল, নির্বাচিত ব্যক্তিরা জাতিকে তাই দিয়েছিল যা তাদের কাছে আশা করা গিয়েছিল।’
২২শে জুন ১৯৭১। করাচির এক সাংবাদ সম্মেলনে গোলাম আযম বলে যে, পূর্ব-বাংলার জনগণ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময়ই তাদের পাকিস্তানি ভাইদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করবে। ভারত কোনো মতেই পাকিস্তানিদের বন্ধু হতে পারে না। ‘পাকিস্তানের আদর্শ গোটা জাতির জন্য পথ-নির্দেশক এবং একমাত্র ইসলামই দেশের দুই অংশকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে পারে।’ এছাড়াও সে বলে যে, আওয়ামী লীগের ‘ছয়দফা’ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পক্ষে সে মন্তব্য করে। এমনকি সে জনগণের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যকরীভাবে প্রতিহত করার জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আবেদন জানায়। আর পাকিস্তানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সশস্ত্রবাহিনীর প্রশংসা করে। ‘এখন সকল ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা পূনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে কার্যকরী সহযোগিতার সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও সহযোগিতা করতে হবে। [...] পূর্ব-বাংলার জনগণ কখনও বিচ্ছিন্নতার জন্য ভোট দেয়নি। তাদের অভাব-অভিযোগ পুরণের জন্য ভোট দিয়েছিল। কায়েদে আজম পাকিস্তানের মহান নেতা ছিলেন এবং দেশের উভয় অংশের লোক ঐক্যবদ্ধভাবে এই বৃহত্তম ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তান কায়েম করেছিল। যে নীতি দেশের উভয় অংশকে এখনও পরস্পর ঐক্যবদ্ধ রাখতে সক্ষম সে সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া ও কাজ করার জন্য আমি পাকিস্তানির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলতে চাই―পূর্ব-বাংলায় পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না এবং নতুন করে নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হতে পারে না।’
২৪শে জুন ১৯৭১। ‘যুক্ত নির্বাচনের অপর নাম/ জয় বাংলা, জয় হিন্দ’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] যুক্ত নির্বাচন [ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮] ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ খতম করে ‘জয় বাংলা’ আন্দোলনের জন্ম দিল। আর একটি মাত্র বছরেই ‘জয় বাংলা’কে ‘জয় হিন্দ’ করে নিল। তাই নিঃসন্দেহে বলা চলে, যুক্ত নির্বাচনের অপর নাম ‘জয় বাংলা, জয় হিন্দ’। যুক্ত নির্বাচনের এ অসাধারণ কেরামতি বিস্ময়কর নয় কি? যুক্ত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দলকে কোণঠাসা করে। পূর্ব-পাকিস্তানের ন্যাপ ও আওয়ামী লীগ রিজার্ভ ভোট হাসিলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কত বেশি হিন্দু ও হিন্দুস্থানী ঘেঁষা হতে পারে তার প্রতিযোগিতা শুরু করে। ফলে মুসলমানের শহীদ মিনারে পুজা চলল, চ-ীর আসন বসল। আলপনা আঁকা হল শহীদের মাজারে। স্বীকৃত হল বর্ষবরণ।
২৫শে জুন ১৯৭১। ‘বিগত নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
আওয়ামী সদস্যদের ভেতরে যথার্থ পাকিস্তানি রয়েছেন। যারা অগত্যা পাকিস্তানি নন, প্রেসিডেন্ট যদি তাদের সুরাহা করতে চান তাহলে তার নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই তা করতে হবে। এ সদস্যদের অবশ্যই কোনো একটি বৈধ দলের অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, স্বতন্ত্র হলে চলবে না। আমাদের বিশ্বাস এ-পথেই অবৈধ আওয়ামী লীগের পাকিস্তানবাদীদের বাছাই হতে পারে এবং তাদের আসনের বৈধ ঘোষণা করা যেতে পারে।
২৮শে জুন ১৯৭১। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের পদ বাতিলের ঘোষণা দেন। এই সম্পর্কে মাওলানা মওদুদী বলে, ‘প্রেসিডেন্টের শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা খুবই যথোপযুক্ত এবং জামায়াত একে অভিনন্দন জানিয়েছে।’  আর গোলাম আযম বলে, ‘শাসনতন্ত্র প্রণয়ন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতির সামনে তাই হচ্ছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।’  আর ‘প্রেসিডেন্ট এ-প্রদেশের জনগণকে বুঝতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বলে, ‘সন্দেহ নেই প্রেসিডেন্ট এ-প্রদেশের জনগণকে বুঝতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিল না করে যেসব বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ সদস্য জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে রাষ্ট্র-বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিলেন তাদেরই অযোগ্য ঘোষণা করেছেন।’

জুলাই
২রা জুলাই ১৯৭১। ব্রাহ্মণবাড়িয়া। স্থানী শান্তিকমিটির উদ্যোগে আখাউড়ায় এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায়, জামায়াতে ইসলামির সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক পাকিস্তানিপন্থী জনসাধারণের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে পাকিস্তান-বিরোধী কর্মকা-কে নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্যে আহ্বান জানায়। সে গ্রামে গ্রামে ‘রাজাকার বাহিনী’ গঠনের এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর উপর নজর রাখারও নির্দেশ দেয়। ‘সা¤্রাজ্যবাদী ভারত পাকিস্তানের অস্তিত্বকে কখনও মেনে নিতে পারেনি এবং তাই যেভাবেই হোক পাকিস্তানের বিনাশ সাধনই তার লক্ষ্য। [...] ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধে পরাজয়ের পর ভারত এখন পাকিস্তানকে দুর্বল করার এবং তার এজেন্টদের দিয়ে দেশের এক অংশ থেকে অন্য অংশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার পরোক্ষ পদ্ধতি অবলম্বন করছে। ভিত্তিহীন প্রচারণা চালিয়ে মুসলমানদের ঐক্যে ভাঙন ধরানোর জন্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। [...] পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানরা জাতির পিতা কায়েদে আজমের পতাকা-তলে সংঘবদ্ধ হয় এবং তাদের আদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপনের জন্যে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। [...] পূর্ব-পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনসাধারণ তাদের অভাব-অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে এবং স্বায়ত্তশাসন লাভের আশায় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। তারা কখনই বিচ্ছিন্নতার জন্যে ভোট দেয়নি।’  এই সভায় আরও বক্তৃতা করে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান (সভার সভাপতি), এ.আর. মোল্লা, পীয়ারা মিয়া, মুজিবুর রহমান, আবদুল্লাহ ভূইয়া প্রমূখ। 
৩রা জুলাই ১৯৭১। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে দোষারূপ করে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
১৮ই জানুয়ারি (১৯৭১) পল্টন ময়দানে আহুত জামায়াতে ইসলামির সভায় আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রদল ছাত্রলীগ কাপুরুষের মতো আক্রমণ চালিয়ে হতাহত করেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এই সব ধর্ম-নিরপেক্ষদের ধর্ম-বিরোধী অত্যাচার দেশবাসীকে সজাগ করে দিয়েছিল। ক্ষমতায় গেলে (আল্লাহ না করুন) এরা ইসলামি জনতার উপর কি জুলুম চালাত তা আল্লাহই জানেন। ‘আল্লাহ হাফেজ’ বলে পাক-বাংলার মুসলিম এদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
৪ঠা জুলাই ১৯৭১। পাকিস্তানে কিছু সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে, মার্কিন সংবাদপত্র ও কংগ্রেসে প্রতিবাদ সৃষ্টি হয়। এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা হিলালী মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কাছে প্রতিবাদ জানায়। এ সম্বন্ধে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সন্দেহ নেই, উল্লেখিত ব্রিটিশ-মার্কিন পত্র-পত্রিকা ও ব্যক্তিবর্গ হিন্দুস্থানের এ-ধরনের মুসলিম বিদ্বেষী মহলের প্রচারণা দ্বারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন! [...] বস্তুত ইহুদি হিন্দু আঁতাত ও মুসলিম বিদ্বেষী স্বার্থান্ধমহল পাকিস্তান সম্পর্কে অপপ্রচার চালিয়ে সবদিক থেকে পাকিস্তানকে ঘায়েল করে ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় ওঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু মিথ্যা ফানুস প্রথম দিকে কিছু চমক সৃষ্টি করতে পারলেও চূড়ান্ত বিজয় যেমন তার হয় না তেমনি পাকিস্তান বিরোধী চক্রান্তও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
৪ঠা জুলাই ১৯৭১। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ময়দানে, যেসব রাজাকার ট্রেনিং প্রাপ্ত তাদেরকে ক্ষুদ্র অস্ত্রের সাহায্যে গুলি চালানোর শিক্ষা দেওয়া হয়। 
৫ই জুলাই ১৯৭১। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সঙ্গে হিন্দুস্থানের সম্পর্ক সম্বন্ধে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তান বিরোধী ও প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকা যে কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করে তা রাষ্ট্রদ্রোহী শেখ মুজিব এবং পাকিস্তানে রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতার পৃষ্ঠপোষক হিন্দুস্থানের ব্যবহৃত ভাষারই অনুরূপ।
৮ই জুলাই ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধা দ্বারা পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার অভিযানকে ‘সমাজ বিরুধী তৎপরতা’ আখ্যায় দিয়ে ‘দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
এদেশের কোনো কোনো স্থান হতে দুষ্কৃতিকারীদের সমাজ বিরোধী তৎপরতার খবর আসছে। এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষরাই এদের তৎপরতার প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে। প্রদেশের আরেক ধরনের সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতি সাধনের জন্য পুল কালভার্ট নষ্ট করা ও রাস্তা কেটে ফেলা। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ও পানির মতো অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর সরবরাহ বিনষ্ট করার অপচেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণকেই দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। 
৮ই জুলাই ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী, দুষ্কৃতিকারী ও হিন্দুস্থানী অনুপ্রবেশকারী’ উল্লেখ করে ‘হিন্দুস্থানের যোগসাজস’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না, মিথ্যার শত আবরণ দিয়ে তাকে ঢেকে রাখার যত প্রয়াসই চলুক না কেন। গত ২৫শে মার্চের পূর্ব থেকেই হিন্দুস্থানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের যোগসাজস ছিল। [...] ২৫শে মার্চ রাষ্ট্রদ্রোহী, দুষ্কৃতিকারী ও হিন্দুস্থানী অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত পাক সেনাবাহিনীর অভিযানের পরপরই যেখানে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার কথা সেক্ষেত্রে তা কেন বিলম্বিত হল? এমনকি পলাতক রাষ্ট্রদ্রোহীদেরকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবিরত ব্যবহার করে যাওয়া এবং বর্তমানে বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব ছাড়া পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক সমাধান না মানার অনধিকার চর্চার ঔদ্ধত্য দেখানো―এসব প্রত্যেকটি হিন্দুস্থানী কার্যকলাপের মধ্য-দিয়ে দিবালোকের ন্যায় এ সত্যটিই প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তানের বর্তমান সঙ্কট ও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে হিন্দুস্থান যে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এটা মুজিব-হিন্দুস্থান ষড়যন্ত্র ও যোগসাজসেরই অবশ্যম্ভ¢াবী পরিণতি। [...] বর্তমানে পাকিস্তানের তের কোটি মানুষ এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে। হিন্দুস্থানের চক্রান্ত আজ সকলের কাছে সুস্পষ্ট। একজন পাকিস্তানি জীবিত থাকতে এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়ে যাবে এবং ব্রিটেন হোক কি অ্যামেরিকা বা জাতিসংঘ এ ব্যাপারে পৃথিবীর কোনো শক্তির চাপের সামনেই তারা মাথা নত করতে প্রস্তুত নয়। তাই মরহুম কায়েদে আজমের ভাষায় পাকিস্তান টিকে থাকার জন্যেই এসেছে এবং ইনশাল্লাহ টিকে থাকবেও। 

৯ই জুলাই ১৯৭১। মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য রাজাকার যে ট্রেনিং নিচ্ছে একথা স্বীকার করে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাতদের নির্মূল করার জন্য জনগণ এখন স্বেচ্ছায় রাজাকার ট্রেনিং নিচ্ছেন। এসব দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাত সম্পূর্ণরূপে হতাশ হয়ে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের জিনিশপত্র লুটপাট ও ডাকাতি করে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা আরও বৃদ্ধি করছে।
১০ই জুলাই ১৯৭১। কুষ্টিয়ায় ‘রাজাকার বাহিনী’র প্রথম ব্যাঞ্চের ট্রেনিং সমাপ্ত হয়। প্রথম দিকে এই প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল ১৫ দিনের। পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক অধিনায়ক জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজী সাভারে ‘রাজাকার বাহিনী’র কোম্পানি কামান্ডারদের প্রথম ব্যাঞ্চের ট্রেনিং শেষে বিদায়ী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করে।
১২ই জুলাই ১৯৭১। ভারতকে পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্তে জড়িত বলে উল্লেখ করে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ভাবতে অবাক লাগে যে-ভারত পয়ষট্টি সন ও সত্তরের নির্বাচন থেকে প্রত্যক্ষভাবে আমাদের ঘর ভাঙার নির্লজ্জ চক্রান্ত চালাল, যে-ভারত সাইক্লোন ও হ্যাইজ্যাকিং নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিচ্ছেদ সৃষ্টির জন্য চরম বেহায়াপনার পরিচয় দিল, যে-ভারত নির্বাচনে তার দালালদের আন্তর্জাতিক শালীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কর্মী পাঠিয়ে প্রচার চালিয়ে দু’হাতে অর্থ ঢেলে আর হিন্দুদের দিয়ে একচেটিয়া ভোট প্রদান করিয়ে জয়ী করে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তায় তাদের দিয়ে বিদ্রোহ করাল; অন্তত তিন লাখ পাকিস্তানি জনতাকে হত্যা করিয়ে পূর্ব-পাকিস্তান গ্রাস করতে উদ্যত হল এবং তাতে ব্যর্থ হয়ে প্রায় পাঁচশত কোটি টাকার সম্পদ অপহরণ করে নিজ দালালদের নিয়ে নিরাপদে পালাল, সে-ভারত আজ সাধুসজ্জন সেজে শরণার্থীর মহান সেবক হল আর আমরা হলাম গণতন্ত্র হত্যাকারী। নশীবের ফের আর কাকে বলে? [...] যারা পূর্ব পাকিস্তানি মানুষের সর্বনাশকারী দালাল নেতাদের গালভরা বুলিতে বিভ্রান্ত হয়েই ‘বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখে, হিন্দুস্থানের মাটিতে বসে যেসব তথাকথিত নেতা ‘বাংলাদেশ’ আন্দোলন করছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে যে অবিভক্ত ভারতে তাদের অস্তিত্বই থাকত না, একথা বোঝার জ্ঞানটুকুও তাদের থাকা উচিত। 
১৬ই জুলাই ১৯৭১। পাকিস্তানকে কমনওয়েলথে না-থাকার পরামর্শ দিয়ে ‘পাকিস্তান কমনওয়েলথ ত্যাগের কথা চিন্তা করছে’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
দেশে এই ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে যে, কমনওয়েলথের সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য ব্রিটেন পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার সম্পর্কে যে মনোভাব গ্রহণ করেছে তাতে কমনওয়েলথের সঙ্গে আর সম্পর্ক বজায় রাখা সুবিধাজনক হবে কিনা তা পাকিস্তানকে গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। 
১৬ই জুলাই ১৯৭১। শহীদ মিনারের প্রতি অসম্মান দেখিয়ে ‘ইতিহাস কথা বলে’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদের খুশি করার জন্য যে শহীদ মিনার তৈরি করলেন তাকে পুজোম-প বলা যেতে পারে কিন্তু মিনার কিছুতেই না। যা হোক সেনাবাহিনী এই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহীদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন জেনে দেশবাসী খুশি হয়েছে।

১৬ই জুলাই ১৯৭১। মতিয়া চৌধুরী, সূর্য সেন ও মণি সিংহকে পাকিস্তানের ‘প্রধান দুশমন’ বলে উল্লেখ করে ‘ইতিহাস কথা বলে’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
এ সমস্ত বাংলা দরদী দলে আরও ছিল বাপ খেদানো ‘অগ্নি কন্যা’ [মতিয়া চৌধুরী], সূর্য [সূর্য সেন] সন্তানেরা যারা পাকিস্তানের প্রধান দুশমন এবং ১৪ই আগস্ট ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের জন্মলগ্নে বিদ্রোহী কুখ্যাত মণি সিংহের মুক্তিকে দেশের জনগণের মুক্তি বলে মনে করে। আজ এই কুচক্রীদের দ্বারাই ভারতের মাটিতে বসে কাল্পনিক ‘স্বাধীন বাংলা সরকার’ স্বাধীন বাংলা রেডিওর নামে চিৎকার চলছে। তাদের কল্পনায় ‘মুজিবনগর’-এর কোনো মাটির ঠিকানা নেই, আছে হাওয়াই ঠিকানা। সুতরাং ভারতের এই দালালদের পাকিস্তানবাসীরা কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। 
১৬ই জুলাই ১৯৭১। লাহোরের এক সাংবাদিক সম্মেলনে কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট বলে, ‘জাতি আজ তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের সবচেয়ে ‘মারাত্মাক সঙ্কটের’ মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সঙ্কট নিরসন ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যাগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধান প্রধান নেতাদের নিয়ে একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান হচ্ছে এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি কাজ। এই জাতীয় সম্মেলনে অবশ্যই পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধনের ফর্মুলা উদ্ভব করতে হবে। [...] পূর্ব-পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নিজের ভুলের জন্য তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে এবং এই পরিস্থিতিতে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের প্রশ্নটি নূতন করে বিবেচনা করা উচিত। সম্মেলনে যোগদানকারীরা ইচ্ছে করলে এ-বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। [...] পূর্ব-পাকিস্তানে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে। তবে সেখানকার সমস্যাগুলোর ব্যাপারে প্রজ্ঞা, বিবেচনা ও সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। ভারতীয় এজেন্টদের উৎখাতের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে শুভেচ্ছা ও আস্থা তৈরির কাজ করে যাওয়া উচিত। [...] পূর্ব-পাকিস্তানে শতকরা ৯৬-জন লোক পাকিস্তানের জন্য ভোট দিয়েছিল। কিন্তু গত ২৩ বছর ধরে তরুণদের অপরিপক্ক মনে যে কারণেই হোক বঞ্চনার ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে এবং এই বঞ্চনা ও অবহেলা মোকাবেলার জন্য সংগ্রামের মাত্রা তাদের জানা ছিল না। পূর্ব-পাকিস্তানে সত্যিকারের পাকিস্তানির অভাব নেই। [...] ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত বাংলাদেশ বেতার থেকে দিন-রাত আমার ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতাদের মৃত্যুদ-ের কথা তারস্বরে ঘোষণা করা হচ্ছে। [...] পাকিস্তানের জন্যে সংগ্রাম করে যাব। কারণ, যদি পাকিস্তানই না থাকে, তাহলে অধিকারের জন্যে সংগ্রামের অবকাশ কোথায়।’ 
১৭ই জুলাই ১৯৭১। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার জন্যে আওয়ামী লীগকে দায়ী করে ‘ইতিহাস কথা বলে’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের চরমপন্থী নেতারা যদি জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও আন্দোলন শুরু না করত, তবে আবার দ্বিতীয়বার সামরিক শাসনের প্রয়োজন হত না। দেশে এমন চরম বিশৃঙ্খলা শুরু হল যে, শেষপর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সামরিক শাসন প্রবর্তন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান তুলে আবার হিন্দু বাংলায় পূর্ণ-সমর্থন আদায় করে সমস্ত হিন্দু ভোট পাওয়ার ব্যবস্থা করে নিল। এরা বুঝে বা না-বুঝে আবার মীর জাফর, আবদুর রসুল, গাফফার খান ও শেখ আবদুল্লাহর মতো ভুল করে বসল। এরা হিন্দুর চক্রান্ত না বুঝে প্রচার করতে লাগল যে, বাংলাদেশ বাঙালির। এই সরাসরি বিশ্বাস-ঘাতকতা ও বেঈমানীর কারণে লাভ হবে বাঙালি হিন্দুর আর সর্বনাশ হবে বাঙালি মুসলমানের তথা গোটা পাকিস্তানের। [...] নির্বচনের পূর্বে ১২ই নভেম্বরের সর্বনাশা ঝড়ের সুযোগে মওলানা ভাসানী সরাসরি বিচ্ছিন্নতার দাবী তুলেন। কেন যে সে আওয়াজ বন্ধ করা হল না তা অনেকের বুঝের বাইরে। সেই ভুলের জন্য আজ পূর্ব-পাকিস্তান মুক্তিবাহিনীর নামে একদল দেশদ্রোহী ও ভারতের দালাল কর্তৃক স্বাধীনতা হরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। [...] আজকাল ভারতের হাওয়াই বাণী যেভাবে বাংলাদেশের জন্য চিৎকার শুরু করেছে তাতে মুসলমানের বোঝা উচিত যে, এ বাংলাদেশ তারা চায় বাঙালি হিন্দুদের জন্য বাঙালি মুসলমানদের জন্য তারা বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলই নির্দিষ্ট রেখেছে। যারা আজ ভারতে খিচুড়ি-বার্লি খেয়ে পাকিস্তান ধ্বংসের স্বপ্ন দেখছে তারা যেন লক্ষ্য করে দেখে যে, ভারতের সেনাবাহিনীতে কয়জন বাঙালি সেনা রয়েছে। পাক সেনাবাহিনীতে বাঙালি সেনা বেড়ে যাওয়ায় তাদের গাত্রদাহ হচ্ছিল এখন এদেরকে দেশদ্রোহী করে তবে ছেড়েছে। এখনও সময় আছে―পাকিস্তানের মুসলমান দালালদেরকেও সমূলে ধ্বংস করে পূন্য ভূমি পাকিস্তান মুনাফেকদের থেকে পাক করার, ইনশাল্লাহ। ইনশাল্লাহা আলা কুলে সাইনন।
১৮ই জুলাই ১৯৭১। ‘কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি’র কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন আহমদ বরিশাল জেলা ‘শান্তিকমিটি’র সভায় বলে, ‘বর্তমান মুহূর্তে বিদেশী সা¤্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে দলীয় মত পার্থক্য ভুলে গিয়ে একতাবদ্ধ হতে হবে। [...] পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির বিরুদ্ধে ভারত যে চক্রান্ত ও প্রচারণা চালাচ্ছে, সাহস ও আস্থার সঙ্গে তার মোকাবেলা করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। পূর্ব-পাকিস্তানে অশুভ কার্যকলাপে লিপ্ত দুষ্কৃতিকারী এবং বিদেশী চরদের উৎখাত করার জন্যও আহ্বান জানাচ্ছি।’
১৯ই জুলাই ১৯৭১। পূর্ব-বাংলার জনগণের চরম দুর্দশার যে চিত্র বিবিসি’তে দেখানো হয়, এর সমালোচনা করে ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি’-শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ব্রিটিশ টেলিভিশন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের তথাকথিত মর্মস্পর্শী অবস্থা সম্পর্কে ভুয়া ছবি প্রদর্শন করছে। ব্রিটিশ টেলিভিশনে যে সব ছবি দেখানো হচ্ছে সেগুলো সাম্প্রতিককালের নয় বরং সেগুলো ঘূর্ণিঝড়ের সময়কার ছবি। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বোঝাতে চাচ্ছেন সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণের পর পূর্ব-পাকিস্তানে এই চরম বীভৎস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সন্দেহ নেই ব্রিটিশ প্রচার-মাধ্যমের এ ষড়যন্ত্র হিন্দুস্থান থেকেই প্রেরণা পেয়েছে।
২২শে জুলাই ১৯৭১। একদিকে, ১৫৭, ১৫৮ ও ১৫৯ নং সামরিক আদেশ জারি করা হলে সামরিক আইন আরও বেশি নিপীড়নমূলক হয় এবং রাজাকারদের অত্যাচার বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আজমল আলী চৌধুরী বলে, ‘শুধু সেনাবাহিনী নয়, দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে আমরা যে-কোনো চ্যালেঞ্জ প্রতিহত করতে প্রস্তুত।’  এছাড়াও নোয়াখালির কালিতারা বাজারে জেলা শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সায়েদুল হকের সভাপতিত্বে এক সভায় মাসউদ মোক্তার, আতাউর রহমান চৌধুরী, ডা. আবদুল জলিল প্রমুখরা মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়।
২৩শে জুলাই ১৯৭১। লাহোরের বিমান বন্দরে মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ (জামায়াতে ইসলামির অস্থায়ী আমির) বলে, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট যে ফর্মুলা পেশ করেছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের এটাই হচ্ছে একমাত্র সম্ভাব্য পন্থা। প্রেসিডেন্টর বিগত বেতার ভাষণে উল্লিখিত চার মাস সময়ের মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। কারণ, এই সময়ে নগণ্য সংখ্যক ভোটার ভোটদান করতে আসতে পারেন। [...] পূর্ব-পাকিস্তানে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা একান্ত দরকার।’  মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, ‘শেখ মুজিবর রহমানের বিচার শুরু করা প্রয়োজন।’ 
২৬শে জুলাই ১৯৭১। ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর পরিবেশিত খবরে বলা হয় যে, নেজামে ইসলাম পার্টির পার্লামেন্টারি বোর্ডের সম্পাদক সৈয়দ মনজুরুল আহসান ও যুগ্ন-সম্পাদক মওলানা আবদুল মতিন এক যুক্ত বিবৃতিতে ‘আলেম সম্প্রদায়’কে সশস্ত্র-বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা প্রদান এবং জনগণের কাছে দেশের ‘মৌলিক আদর্শ’ ব্যাখ্যা করার জন্যে আহ্বান জানায়। পূর্ব-বাংলার পাকিস্তানিপন্থী আলেম ও মসজিদের ইমামদের পাকিস্তানের আদর্শ জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করার বিষয়টি তাদের কর্মসূচির অন্তর্গত করার জন্য অনুরোধ করে। তারা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপকে অভিনন্দ জানায় এবং ‘রাষ্ট্র-বিরোধী’ ব্যক্তিদের নির্মুল করার ব্যাপারে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে। এমনকি ‘রাজাকারদের দায়িত্ববোধ’-এরও প্রসংশা করে। এই যুক্ত বিবৃতিতে তারা বলে, ‘শুধুমাত্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই আমাদের সমস্যা সমাধান হবে না। এই মুহূর্তে সর্বাধিক প্রয়োজন হচ্ছে জাতীয় পুনর্গঠনমূলক কাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিতকরণের জন্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের পূর্ণভাবে সহযোগিতা করা।’
২৬ই জুলাই ১৯৭১। ‘রাজাকার’দের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে ‘মাইন বিস্ফোরণে হতাহত’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজাকার-বাহিনী গঠিত হয়ে তারা দুষ্কৃতিকারীদের দমনে প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। যেসব স্থানে রাজাকার-বাহিনী গঠিত হয়নি, সেসব স্থানেও শীঘ্রই গঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে যে দু-একটি নাশকতামূলক কাজের খবর পাওয়া যায় সম্ভবত ঐ সব অঞ্চলে স্থানীয় লোকদের সমন্বয়ে শান্তিকমিটি ও রাজাকার-বাহিনী গঠিত না হওয়ায় কিংবা তাদের তেমন তৎপরতা না থাকার কারণেই এমনটি হওয়া সম্ভব হচ্ছে।
দুষ্কৃতিদের দমনে যাতে আদৌ সেনাবাহিনী ব্যবহারের প্রয়োজন না হয় সে লক্ষ্য নিয়েই জনগণ ও অন্যান্য সংস্থাকে পারস্পারিক সহযোগিতা সহকারে কাজ করে যেতে হবে।
২৮শে জুলাই ১৯৭১। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেতার ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক ৮৮-জন নির্বাচিত সদস্যের পদ বহাল রেখে বাকিদের পদ বাতিলের ঘোষণা দেন।
৩০শে জুলাই ১৯৭১। পাকিস্তান সরকার বলে যে, সশস্ত্র রাজাকারের সংখ্যা ২২-হাজার এবং দ্রুত সশস্ত্র রাজাকারের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৩৫ হাজারে উন্নতি করা হবে। জুলাইতে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত যথাক্রমে ৭৯-জন ও ১৯৪-জন আওয়ামী লীগ সদস্যদের নাম অন্যায়ভাবে পাকিস্তান বাতিল করে গণধিকৃত দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। ফলে জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য সাম্প্র্রদায়িক দলগুলোর কর্মীদের সমবায়ে গঠিত ‘রাজাকার বাহিনী’ সন্ত্রাস ও নিপীড়নের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। ‘রাজাকার বাহিনী’র দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধির পেছনে জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলগুলোর ‘আদর্শগত উদ্দীপনা’ ছাড়াও, নিয়মিত ভাতা, রেশন, স্থানীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সর্বোপরি হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের সদস্যদের ঘর-বাড়ি ও বিষয়-সম্পত্তি অবাধে লুটপাট ও ভোগদখল করার সুযোগই হচ্ছে যোগদানকারীদের জন্যে বিশেষ আকর্ষণ। ‘রাজাকার বাহিনী’ সংখ্যাধিক্য, অস্ত্রশস্ত্রের সুবিধা ও দ্রুত চলাচল ক্ষমতা থাকার কারণে এদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সীমিত অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী মুক্তিযোদ্ধারা বেশ বেকায়দায় পড়ে। ‘শান্তিকমিটি’র গোপ্তচর ও ‘রাজাকার’দের দৌরাত্ম্য এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্বিচার আক্রমণের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের চমকপ্রদ তৎপরতা জুলাই মাসের মধ্যেই হ্রাস পেতে শুরু করে।
৩০শে জুলাই ১৯৭১। টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার করা হবে। যেহেতু তিনি একজন পাকিস্তানের নাগরিক সেজন্য পাকিস্তানের আইন অনুসারে তার বিচার করা হবে। [...] বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা তার নির্বাচনী ওয়াদা থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছেন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবকিছু উস্কিয়ে দিয়েছেন।’

আগস্ট
১লা আগস্ট ১৯৭১। ‘অপারেশন চার্সলাইট’-এর পক্ষে তোপধ্বনি তোলার জন্যে ‘ন্যায়সঙ্গত ভূমিকার প্রশংসা’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ বিচ্ছিন্নতা কখনও চায়নি। আর যারা চেয়েছিল তারা আজ জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য নয়। কারণ এবারের নির্বাচন হয়েছিল পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের দাবীর ভিত্তিতে, বিচ্ছিন্নতার দাবীতে নয়। সুতরাং নির্বাচনের পর যারা ভুল পালটিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিচ্ছিন্নতার আওয়াজ তুলেছিল তারা নিঃসন্দেহে জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিল। সুতরাং এ বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রের অক্টোপাস থেকে জনগণকে মুক্ত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা [অপারেশন চার্সলাইট] গ্রহণ একেবারে অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
২রা আগস্ট ১৯৭১। ‘১৪ই আগস্ট সাড়ম্বরে আজাদী দিবস উদযাপিত হবে’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
এ দিনকে ইতিমধ্যেই সমগ্র দেশে সাধারণ ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। রাওয়ালপি-িতে ৩১-বার তোপধ্বনি ও প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা, লাহোর, করাচি, পেশোয়ার ও কোয়েটায় ২১-বার তোপধ্বনির মাধ্যমে এ দিবসের উদ্বোধন করা হবে। প্রধান প্রধান সরকারি ও বেসরকারি ভবনসমূহে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হবে। 

২রা আগস্ট ১৯৭১। জাতিসংঘের সমালোচনা করে ‘হিন্দুস্থান চাচ্ছে কি’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
কোনো দেশ বা কোনো আঁতাতের ষড়যন্ত্র যাই হোক জাতিসংঘ তার দায়িত্ব সম্পর্কে অচেতন থাকতে পারে না, এ আশাই আমরা করেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ সনদ বিরোধী স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে হিন্দুস্থানকে বিরত রাখার জন্য জাতিসংঘ কোনো ব্যবস্থাই অবলম্বন করতে আসেনি।
৩রা আগস্ট ১৯৭১। মতিউর রহমান নিজামী বলে, ‘মূলত আমাদের সেনাবাহিনীতে তিন ধরনের জেহাদী প্রেরণায় উজ্জীবিত মোজাহেদ বীর জওয়ানরা থাকার দরুনই বেঈমান দুশমনরা আমাদের চাইতে সামরিক শক্তিতে পাঁচগুণ বেশি শক্তি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও পাক-সেনাবাহিনীর সঙ্গে চরম ভাবে পরাজয় বরণ করে। [...] আমাদেরকে একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, এই পাক-সেনাবাহিনীই গত ২৪-বছর ধরে আমাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন ছাড়াও জাতীয় প্রতিটি দুর্যোগে আমাদের সাহায্য করে আসছে। গত বছর উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত হতাহত মানুষ বিশেষ করে পচা লাশ দাফন থেকে নিয়ে সকল প্রকার সাহায্যের মধ্য দিয়ে যে মানবিক সেবার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা থেকেই এদেশের মানুষের প্রতি অফুরন্ত দরদেরই পরিচয় পাওয়া যায়। সুতরাং তাদেরকে আমাদের ভাই বলাই যথাযথ। সেনাবাহিনী ও সাধারণ নাগরিক একাত্ম হয়েই আজ এদেশবাসী শত্রুর মোকাবেলা করবে।’
৩রা আগস্ট ১৯৭১। চট্টগ্রাম। বকেল। চট্টগ্রাম শহর ইসলামি ছাত্রসংঘের উদ্যোগে স্থানীয় মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে আয়োজিত এক ছাত্র-সুধী সমাবেশে মতিউর রহমান নিজামী (পাকিস্তান ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি) দলীয় ও ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার উর্ধ্বে থেকে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহিত রক্ষার কাজে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানায়। সে আরও বলে, ‘এখন ব্যক্তিগত মর্যাদা বা দলীয় স্বার্থের প্রশ্ন নয়, এখন প্রশ্ন পাকিস্তান টিকে থাকার। পাকিস্তান টিকে থাকলেই কেবলমাত্র এখানকার মুসলমানরা টিকে থাকতে পারে।’  ‘পাকিস্তানের বর্তমান জাতীয় সঙ্কট এবং নাগরিকদের দায়িত্ব’-শীর্ষক বিষয়ে আলোচনাকালে ছাত্রনেতা নিজামী বলে, ‘১লা মার্চ থেকে দুষ্কৃৃতিকারী ও ভারতীয় অনুচররা যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তাতে কোনো মানুষই আশা করতে পারেনি যে, পাকিস্তান ও পাকিস্তানের মুসলমানরা স্বাধীন-সত্তা নিয়ে টিকে থাকবে। দুষ্কৃতিকারীরা দেশের বুকে যে রক্তের প্রবাহ বইয়েছে তার নজির দুনিয়ার ইতিহাসে নেই।’  নিজামী দুঃখ প্রকাশ করে বলে, ‘পাকিস্তানি ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক নেতা ও দলসমূহের অনৈক্যের কারণেই আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল এবং দেশে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। [...] দেশপ্রেমিক জনগণ যদি ১লা মার্চ থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুষ্কৃৃতিকারীদের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসত তাহলে দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত না। [...] আল্লাহ তাঁর প্রিয়ভূমি পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য ঈমানদার মুসলমানদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা যখন রাজনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা রাজনৈতিক পন্থায় করতে ব্যর্থ হল, তখন আল্লাহ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তার প্রিয়ভূমির হেফাজত করেছেন।’  ছাত্রনেতা নিজামী পাক-সেনাবাহিনীর সাফল্যের প্রশংসা করে এবং ভবিষ্যতের সকল আভ্যন্তরীণ ও বিদেশী হামলার মোকাবেলা করার জন্য তাদের সাহস ও ত্যাগের জন্য আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে। পূর্ব-বাংলার সঙ্কটের কথা বলতে গিয়ে নিজামী বলে, ‘অনেকেই এর জন্যে দেশের ছাত্র সমাজকে দায়ী করেন। [...] ছাত্রদের কিছু অংশ এর জন্যে দায়ী হলেও সমগ্র ছাত্রসমাজ এর জন্যে দায়ী নয়। বরং বিগত ২৩ বছরে যারা ছাত্রসমাজকে পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস, পাকিস্তান পূর্ব-ভারতের মুসলমানদের দুর্বস্থার ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত রেখেছে তারাই এর জন্যে দায়ী। বিগত আমলে ছাত্রদেরকে একদিকে ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান দেওয়া হয়নি, অন্যদিকে শাসকদের দ্বারা গৃহীত বিভিন্ন কর্মপন্থার ফলে ছাত্রদের মনে ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। [...] পাকিস্তান অর্জনের পর বহুদিন আমরা আমাদের পরিচয় ভুলে ছিলাম। কিন্তু ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত যখন আমাদের ভূখ-ে আক্রমণ চালায় তখন আমরা আত্মসচেতনার পরিচয় দিলাম, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতে-না-হতেই আবার আমরা ভ্রান্তিতে নিমর্জ্জিত হলাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে আবার আমাদের ওপর গজব আসল। এবার আমরা আবার আত্মসচেতন হলাম। যদি এই আত্মসচেতনতার পর আবার আমরা ভুল করি তাহলে হয়তো আল্লাহ আমাদেরকে আর সুযোগ নাও দিতে পারেন।’  নিজামী অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পাকিস্তানের যুবকদের জাতীয় আদর্শের আলোকে গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। পরিশেষে বলে, ‘পাকিস্তান আল্লাহর ঘর। আল্লাহ একে বারবার রক্ষা করেছেন, ভবিষ্যতেও রক্ষা করবেন। দুনিয়ার কোনো শক্তি পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না।’  সভার বক্তৃতাকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি আবু নাছের পূর্ব-ভারতে মুসলমানদের ওপর হিন্দুদের অত্যাচারের এক বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরে বলে, ‘সেই হিন্দুদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ২০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পাকিস্তান অর্জন করেছি, সেই হিন্দুদের সঙ্গে আমরা কোনো দিন এক হতে পারি না।’  ভারতের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সে আহ্বান জানায়। সভাপতির ভাষণে শহর শাখার সভাপতি মীর কাসেম আলী বলে, ‘পাকিস্তান আবার পূনর্জন্ম লাভ করেছে। পাকিস্তানের বুকে ইসলামি সমাজ-ব্যবস্থার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।’  সে গ্রামগঞ্জে প্রতিটি এলাকা থেকে শত্রুর শেষ চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। সভায় পূর্ব-বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ভারতের হামলার নিন্দা এবং ব্রিটেন ও বিবিসির প্রচারের প্রতিবাদে ব্রিটেনের পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়।
৪ঠা আগস্ট ১৯৭১। ‘রাজাকার বাহিনী’র প্রথম দলের ট্রেনিংয়ের সমাপ্তি উপলক্ষে স্থানী জিন্নাহ ইনস্টিটিউট হলে একটি সমাপনী উৎসবের আয়োজন করা হয়।
৭ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ৭৯-জন জাতীয় পরিষদ সদস্যের পদ শূন্য ঘোষণা করে। আর আর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে দোষারূপ করে ‘শ্বেতপত্রের আলোকে’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
মার্চের ১লা তারিখের পর থেকে আওয়ামী লীগ সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রকাশ্য কার্যক্রম শুরু করে। মার্চের ১লা তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতার আলোচনা চালিয়েছিল তা ছিল নিছক লোক দেখানো। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অগ্রহণযোগ্য অবাস্তব দাবী তুলে একদিকে আলোচনার প্রহসন চালিয়েছে, অপরদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিয়েছে। শ্বেতপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় ২৫ তারিখের মধ্যরাত্রিতে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিদ্রোহের সময় নির্ধারিত ছিল, কিন্তু খোদার অশেষ মেহেরবাণী, শাসনতান্ত্রিক ছদ্মবেশ নিয়ে দেশকে বিচ্ছিন্ন করার আওয়ামী লীগ প্রচেষ্টা যেভাবে ব্যর্থ হয় ঠিক সেভাবেই তার সশস্ত্র বিদ্রোহ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। সেনাবাহিনী যথাসময়ে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেয়। 
৭ই আগস্ট ১৯৭১। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে বিদ্রƒপ করে ‘আমাদের শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] শেখ মুজিব ও তার সমার্থক ছাত্রদল ক্ষমতা হস্তান্তর করার পরিবেশ সৃষ্টির পরিবর্তে নির্বাচনের চরম হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পথে অগ্রসর হতে থাকে। রেসকোর্সে তার তথাকথিত নীতি নির্ধারণী ভাষণে দেশবাসীকে চরম অরাজকতা সৃষ্টির দিকে আহ্বান করেন। তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি করা ও লাঠি-সোটা নিয়ে তৈরি থাকার আহ্বান জানিয়ে হিংসাত্মক পরিবেশ সৃষ্টি করেন। [...] অপরপক্ষে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে সিদ্ধহস্ত তার প্রবীণ গুরু জনাব ভাসানী সাহেব স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পক্ষে আন্দোলন শুরু করেন। তার এককালীন নেতা মশিউর রহমানও প্রদেশ সফর করে তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেন। [...] অপরপক্ষে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে মুজাহিদদের উপর বর্বর অমানসিক হামলা শুরু হয়। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার নরনারীকে অমানসিকভাবে হত্যা করা হয়, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ২৫শে মার্চের মধ্যরাত্রিতে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিদ্রোহের সমস্ত পরিকল্পনা যখন সম্পূর্ণ হওয়ার পথে এমন এক সঙ্কট মুহূর্তে আল্লাহর অফুরন্ত রহমতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। 
৮ই আগস্ট ১৯৭১। ‘রাজাকার বাহিনী’র প্রথম দলটি শপথ গ্রহণ করে।
১০ই আগস্ট ১৯৭১। ‘আগামীকাল শেখ মুজিবের বিচার শুরু’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং অন্যান্য অপরাধের দায়ে একটি বিশেষ সামরিক আদালতে বেআইনী ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার হবে। প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১০ই আগস্ট, বুধবার, এই বিচার শুরু হবে এবং এই বিচার গোপনে অনুষ্ঠিত হবে। এর কার্যবিবরণী গোপন রাখা হবে। আরও বলা হয়, তিনি তার ইচ্ছামত একজন কৌশলী নিয়োগ করতে পারবেন, তবে এই কৌশলীকে পাকিস্তানের নাগরিক হতে হবে। 
১২ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ডা. মোত্তালিব মালিককে গভর্নর নিযুক্ত করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠনের প্রহসন সম্পন্ন করে। এই মন্ত্রিসভা মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামিসহ পাকিস্তানের পক্ষের সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামির আব্বাস আলী খান ও এ.কে.এম. ইউসূফ এই মন্ত্রিসভার সদস্য। ‘ডা. মালেক গভর্নর নিযুক্ত’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ ঘটা করে মন্ত্রিসভা গঠনের সংবাদটি পরিবেশন করে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। টিক্কা খান একজন ঘাতকের নাম। নিষ্ঠুরতার দিক থেকে তাকে কেবল চেঙ্গিস খান, হালাকু খান ও হিটলারের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। হিং¯্রতার কারণে উপাধি পায় ‘বেলুচিস্তানের কসাই’। কারণ সে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে বেলুচিস্তানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বালুচ জনপদ। মদ ও মাগীতেও তার প্রচ- আসক্তি। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা মার্চ পূর্ব-বাংলার গভর্নর ও প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে ঢাকায় এসে হাজির হয়। টিক্কা খানের আগমনে শিহরিত হয় বাঙালি জাতি। এই হিং¯্র দানবকে শপথবাক্য পাঠ করাতে অস্বীকার করেন প্রধান বিচারপতি। বাঙালি জাতিকে শায়েস্তা করতে প্রচ- উন্মত্ততা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে টিক্কা খান ও তার বাহিনী। শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে হত্যাতা-ব চালায় এই নর-ঘতক। টিক্কা খান বাঙালি নিধনযজ্ঞে যে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয়, এর কারণে বিশ্ববাসী ধিক্কার না জানিয়ে পারে না, অথচ এই নর-পশুর স্ততি গাইতে ধর্মের ভেকধারী ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর বিবেক কখনও দংশিত হয়নি। বিশ্ব জনমতের চাপে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তাকে বাংলাদেশ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হয়। এ সম্বন্ধে ‘বিদায়ী গভর্নর’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানের ইতিহাসের এক চরম সঙ্কট সন্ধিক্ষণে তিনি [টিক্কা খান] যে বীরত্ব, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন, এ-দেশের ইতিহাসে তার এসব কীর্তি যেমন চিরদিন অম্লান ও অক্ষয় হয়ে থাকবে, তেমনি এ দেশবাসী তার কাছে থাকবে কৃতজ্ঞ।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান তড়িৎ ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে আজ হয়তো যেখানে সরকার আওয়ামী বর্বরতার শিকারে পরিণত এক লক্ষ মুসলিম হত্যার শ্বেতপত্র বের করেছেন, সেখানে এ সংখ্যা কোটির কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছালেও বিস্ময়ের কিছু নেই।
তিনি জাতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন ও জাতীয় আদর্শ মাফিক পাঠ্য পুস্তক সংস্কারের সরকারি সিদ্ধান্তকে দ্রুত বাস্তবায়নের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
মোট কথা একদিকে জাতীয় দেহের দুষ্টমোচন অপরদিকে তাকে ব্যধিমুক্ত অবস্থায় সুস্থ সবল ও দীর্ঘজীবী করে গড়ে তোলার যেসব কার্যক্রম অবলম্বন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল, তার প্রত্যেকটি ব্যাপারেই তিনি এই অল্প সময়ের মধ্যেও যথার্থ সচেতনতার পরিচয় দিয়ে গেছেন। এ-প্রদেশে তার কয়েক মাসের কার্যধারা থেকে এটাই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, তিনি কথা কম ও কাজ বেশি করার পক্ষপাতী এবং আত্মপ্রচারের বিরোধী।
মোদ্দা কথা, জনাব টিক্কা খান দেশ সেবার অপর কোনো আহ্বানে সাড়া দিতে চলে গেলেও তাকে এ-প্রদেশের জনগণ কোনোদিনই ভুলতে পারবে না এবং তার প্রতি তারা সকল সময়ই কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাশীল থাকবে।
আর ‘নতুন গভর্নর’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার দোসর ডা. মালেকের প্রশান্তি কামনা করে লিখে―
ডা. মালেক পাকিস্তানের জনসাধারণ বিশেষ করে পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। আজাদী আন্দোলনে মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী, শ্রমিক আন্দোলনে অন্যতম পথিকৃৎ এবং [পাকিস্তানের] স্বাধীনতা উত্তরকালে বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ জাতীয় কর্তব্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। গভর্নর হিসেবে তার নিযুক্তিকে তাই সকলেই অভিনন্দিত করবে। [...] জাতীয় জীবনের এক যুগসন্ধিক্ষণে আমরা জনাব মালেককে গভর্নর হিসেবে পেলাম। তার নিযুক্তি হিন্দুস্থান ও তার অনুচরদের জঘন্য ষড়যন্ত্রের শিকার এ-দেশের মুসলমানদের জন্য সর্বদিক থেকে কল্যাণকর হয়ে উঠুক এবং জাতীয় জীবনের বর্তমান সঙ্কট উত্তরণে তিনি সহায়ক হোক এই আমাদের আন্তরিক কামনা।
১২ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানের সপক্ষ ব্যক্তি মওলানা মাদানীর হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে গোলাম আযম বলে, ‘ইসলাম, পাকিস্তান ও মুসলমানদের দুশমন তথাকথিত ‘বাংলাদেশ’ আন্দোলনের সমর্থকরা আর যাই হোক দেশের ভালো ভালো সৎ লোক, ঈমানদার লোক, পাকিস্তানের প্রতি অনুগত ও আস্থাভাজন লোকদের বহুসংখ্যককে ইতিমধ্যে শহীদ করেই ছাড়েনি তারা মওলানা মাদানী সাহেবের মতো একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেম, বুজর্গপীর এবং মোখলেছ পাকিস্তানিকেও শহীদ করতে সাহসী হয়েছে যার সমগ্র জীবন ইসলাম ও পাকিস্তানের জন্য ওয়াকফ। তার শাহাদাতে গোটা পাকিস্তানের মুসলিম মানস চরমভাবে বিক্ষুব্ধ। তথাকথিত ‘বাংলাদেশ’ আন্দোলনের সমর্থকদের উচিত তাদের ঈমানকে দূরস্ত করা। মওলানা মাদানীর এ শাহাদাতের সত্যিকার মর্যাদা তখনই সম্ভব যখন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিটি মুসলমান নিজ নিজ এলাকার দুষ্কৃতিকারীদের তন্ন তন্ন করে তালাশ করে তাদের থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য রাতদিন চেষ্টা করবে। পাকিস্তান ও ইসলামকে দুশমনদের হাত থেকে রক্ষার জন্য জেহাদের আন্তরিক প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। মওলানা মাদানীর এ শাহাদাত পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানদের বুকে ঈমানের আগুন প্রজ্জ্বলিত করবে এ আমার পূর্ণ বিশ্বাস।’ 
১২ই আগস্ট ১৯৭১। ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুসের যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসলামি আন্দোলনের দু-একজন নেতাকে হত্যা করে পাকিস্তানে ইসলামি জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যাবে না এবং দুষ্কৃতিকারীদেরকে এর পরিণাম ফল ভোগ করতেই হবে।’
১৩ই আগস্ট ১৯৭১। আবুল আলা মওদুদী বলে, ‘[...] যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অঘোষিত যুদ্ধের প্রাক্কালে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার নয়া চুক্তি কেবল মাত্র জ্বলন্ত আগুনে ইন্ধন যোগানোরই কাজ করবে এবং এর ফলে এ সংঘর্ষে বৃহৎ শক্তিসমূহ জড়িয়ে পড়তে পারে। [...] সোভিয়েত যেহেতু পক্ষাবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুতরাং পাকিস্তানকেও একথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে যে, সে রাশিয়ার বন্ধুত্বের প্রতি আর আস্থা স্থাপন করতে পারে না এবং ভারতের প্রতি সোভিয়েত সমর্থন সত্ত্বেও পাকিস্তান ভারতীয় হামলার মোকাবেলা করবে এবং নিজের আঞ্চলিক অখ-তা ও সংহতি রক্ষার ব্যবস্থা করবে।’
১৪ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানের আজাদী দিবস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইসলামি ছাত্রসংঘের ছাত্র সমাবেশ। ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী বলে, ‘পাকিস্তান কোনো ভূখ-ের নাম নয়, একটি আদর্শের নাম। ইসলামি আদর্শের প্রেরণাই পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে এবং এই আদর্শই পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। [...] ইসলাম-প্রিয় ছাত্রসমাজ বেঁচে থাকলে পাকিস্তানের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। [...] শুধু রাশিয়াই নয় সারা দুনিয়ার ইসলাম-বিরোধী শক্তিগুলো ভারতের পেছনে দাঁড়ালেও ভারত পাকিস্তানের এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে পারবে না। [...] রাজনৈতিক শর্তসাপেক্ষে আমরা কোনো দেশের সাহায্য গ্রহণ করতে রাজি নই। ইসলামি অর্থনীতি প্রবর্তন হলে আমাদের বিদেশী সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। মুসলমান ভিক্ষা নেয় না, ভিক্ষা দেয়।’  আর পূর্ব-পাকিস্তান ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলে, ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত পূর্ব-পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য সকল প্রকার পন্থাই অবলম্বন করেছে। পূর্ব-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি পঙ্গু করা এবং অর্থনৈতিক ও শিক্ষার মেরুদ- ভেঙে দেওয়ার জন্য ভারত তার চরদের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু দেশপ্রিয় নাগরিক ও পূর্ব-পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ তাদের বল ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্রকেই ব্যর্থ করে দিয়েছে ও দিচ্ছে। [...] দেশপ্রেমিক ছাত্রসমাজকে আজাদী রক্ষার দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। ছাত্রসমাজকে আজাদীর রক্তাক্ত ইতিহাস জানাতে হবে।’  একই সমাবেশে ঢাকা শহর ইসলামি ছাত্রসংঘের সভাপতি মোহাম্মদ শামসুল হক ও সাধারণ সম্পাদক শওকত ইমরান বক্তৃতা করে। সামাবেশ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন থেকে মিছিল বের করা হয়। ছাত্রসংঘের নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসার ছাত্রদের এই মিছিলটি ‘আমাদের রক্তে পাকিস্তান টিকবে’, ‘পাকিস্তানের উৎস কি―লা ইলাহা ইল্লালালাহ’, ‘ইসলামি শিক্ষা কায়েম করো’, ‘ভারতের দালাল খতম করো’ ইত্যাদি শ্লোগান দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও পুরানো হাইকোর্ট ভবনের সামনের পথ ধরে বায়তুল মোকাররম এসে মিছিলটি শেষ হয়।
১৪ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানের আজাদী দিবস। কার্জন হল। কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির সমাবেশ। নূরুল আমীন বলে, ‘আজ আজাদীর দিন। খুশির দিন। আনন্দের দিন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেকের মন আজ চিন্তায় ভারাক্রান্ত। কেননা পাকিস্তানকে বর্তমান তার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা চরম সঙ্কটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। [...] পাকিস্তানকে যারা ভালবাসেন ও পাকিস্তানের স্থায়িত্ব কামনা করেন তাদের মনের ব্যথা-বেদনা আমি উপলব্ধি করতে পারি। তবে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। পাকিস্তানকে যারা ধ্বংস করতে চায় তাদের মোকাবেলা অবশ্যই করা হবে। [...] জাতির এই দুর্যোগের দিনে সবাইকে অতীতের ভুল-ভ্রান্তি বিস্মৃত হয়ে একতাবদ্ধ হতে হবে। সবার ঈমানকে দৃঢ়তর করতে হবে। [...] একদিকে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ, অপরদিকে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আমরা জয়ী হয়েছিলাম। উপমহাদেশের মুসলমানদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা পাকিস্তান অর্জনে সক্ষম হয়েছিলাম। [...] একটি জাতির ইতিহাসে ২৪-বৎসর কিছুই না। যে-উদ্দেশ্যে পাকিস্তান হাশেল করা হয়েছিল ইনশা-আল্লাহ আমরা সেই লক্ষ্যে কামিয়াব হবে। [...] বৃহৎ শক্তিবর্গ পাকিস্তানকে তাদের লীলাভূমিতে পরিণত করতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের যে শক্তি রয়েছে, সেই শক্তির বলে খোদার রহমতে তাদের মোকাবেলা করা যাবে।’ 
১৪ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানের আজাদী দিবস। কার্জন হল। কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির সমাবেশ। পূর্ব-পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামির আমির অধ্যাপক গোলাম আযম বলে, ‘পাকিস্তান টিকে থাকলে বাঙালি মুসলমানদের হক একদিন আদায় হবে। আর যদি পাকিস্তান না থাকে তবে বাঙালি মুসলমানদের অস্তিত্বই থাকবে না। যারা একথাটি বুঝতে চায় না, পাকিস্তানের মাটি হতে তাদের উৎখাত করতে হবে। [...] আজ আজাদী বার্ষিকীয় গুরুত্ব যতটা উপলব্ধি করছি ইতিপূর্বে কখনও এরকম করিনি। মনে হচ্ছে পাকিস্তান নূতন করে জন্মলাভ করেছে। [...] পাকিস্তানকে যারা ভালবাসতে চায় না তারা আজ ভীত ও সস্ত্রস্ত হয়েছে। [...] পাকিস্তান একটি গুণবাচক শব্দ। পাকিস্তান শব্দের অর্থ হচ্ছে একটি পবিত্র দেশ। ২৪-বৎসর আগে এই দেশ ছিল না। বিশ্বের অনেক দেশ ম্বাধীন হয়েছে। একসময় তারা পরাধীন ছিল। তখনও সেই দেশগুলো ছিল। আবার যদি পরাধীন হয় তবুও সেই দেশসমূহ থাকবে। খোদা না করুক, পাকিস্তান পরাধীন হলে পাকিস্তান থাকবে না। তার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে। যে আদর্শকে সম্মুখে রেখে পাকিস্তান অর্জন করা হয়েছি, তার প্রতি আস্থা ছাড়া পাকিস্তান টিকে থাকতে পারে না।’
১৪ই আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানের আজাদী দিবস। কার্জন হল। কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির সমাবেশ। পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম বলে, ‘হিন্দু ও মুসলমান সভ্যতার মধ্যে কোনোদিন মিলন হতে পারে না। কাজেই লক্ষ লক্ষ মুসলমানের জীবন কোরবান ও হিজরতের বিনিময়ে মুসলমানের পৃথক আবাসভূমি পাকিস্তান অর্জন করা হয়েছে। কিন্তু কুচক্রমহলের ষড়যন্ত্রের ফলে গত ২৪-বৎসরে পাকিস্তানে ইসলাম কায়েম করা সম্ভব হয়নি। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে নূতন প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। পাকিস্তানকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য এক কেন্দ্রীক সরকার গঠন, পৃর্থক নির্বাচন, ঢাকা ও ইসলামাবাদ―এই দুটো জায়গায় দুটো রাজধানী নির্মাণ এবং ঢাকায় রাজধানীর নাম সলিমাবাদ রাখার দাবি জানাচ্ছি।’ 
১৫ই আগস্ট ১৯৭১। ‘শান্তি কমিটির কর্তব্য ও গুরুত্ব’-শীর্ষক সম্পাদকীয়তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পূর্ব-পাকিস্তান শান্তিকমিটির বয়স আজ সাড়ে চার মাস অতিক্রম করে চলেছে। তবে শান্তিকমিটির অপ্রশংসনীয় কাজ যে আদৌ নেই তাও বলা চলে না। কারণ দেশের মানুষ দিয়েই শান্তিকমিটি গঠিত। আকাশের ফেরেশতাদের দ্বারা নয়। তাই দেশের মানুষও যেমন ভুল ত্রুটি মুক্ত নয়, তেমনি মুক্ত নয় তাদের নিয়ে গড়া শান্তিকমিটি। এ কারণেই কোথাও বা শান্তিকমিটি নাকি অশান্তিকমিটিরই নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। [...] অঘোষিত রণাঙ্গনে দু’মুখো গোলাগুলির মাঝখানে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যারা দেশের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য কাজ করেছে আর একে একে আত্মোৎসর্গ করেছে তাদের প্রতি কি দেশের সরকার ও জনগণের কোনো কর্তব্য নেই? দেশ ও জনতার নিরাপত্তার ব্যাপারে শান্তিকমিটির বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে কি তারা দেশের নরকার ও জনতার কাছে নিজেদের নিরাপত্তাটুকু আশা করতে পারে না? যদি তারা তাদের সে ন্যায্য পাওনাটুকু পেত, তাহলে কি আর তাদের এভাবে প্রাণ দিতে হত? ভারত ও তার চরদের অঘোষিত যুদ্ধ যতদিন শেষ না হয় ততদিন শান্তিকমিটি দেশ ও জনতার উভয় স্বার্থেই প্রয়োজন। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখা ও সুসংগঠিত করার গুরুত্ব অনেক। শান্তিকমিটির শূন্যতা দেশ ও জনতা দুটোই বিপন্ন করতে পারে, তা উপলব্ধি করা না গেলে মারাত্মক ভুলই করা হবে। ভুলে গেলে চলবে না, পাকিস্তানের নেতা, উপনেতা খতম হলে জনতাও হতাশ হয়ে পড়বে। তখন শুধু সেনাবাহিনী পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবে না। এ-কারণেই আজ সবচেয়ে প্রয়োজন হচ্ছে নিখুঁত ও এককেন্দ্রী শান্তিকমিটি ও তার অধীনে প্রয়োজনীয় নির্ভেজাল রাজাকার-বাহিনী। এ দুটো সংগঠন যদি সুষ্ঠুভাবে চালু হয়ে যায় তাহলে সেনাবাহিনী যেমন বহিঃশত্রুর মোকাবেলায় পূর্ণ আত্মনিয়োগ করতে পারবে তেমনি শান্তিকমিটি ও ‘রাজাকার বাহিনী’ পঞ্চমবাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হবে। প্রসঙ্গত, উল্লেখযোগ্য, ভারতীয় গেরিলাদের বিরুদ্ধে পালটা গেরিলাবাহিনী গড়ে তোলার ব্যাপারেও গভীর ভাবে বিবেচনা করা উচিত।
১৬ই আগস্ট ১৯৭১। গোলাম আযম বলে, ‘বিছিন্নতাবাদীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য শান্তিকমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শান্তিকমিটি যদি দুনিয়াকে জানিয়ে না দিত যে, পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ দেশকে অখ- রাখতে চায়―তাহলে পরিস্থিতি হয়তো অন্যদিকে মোড় নিত। [...] দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব শান্তিকমিটির। তাই দেশের মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব শান্তিকমিটির হাতে তুলে দিতে হবে। [...] পাকিস্তান টিকে থাকলে আজ হোক বা কাল হোক বাঙালি মুসলমানদের হক আদায় হবে। কিন্তু আজাদী ধ্বংস হলে মুসলমানদের শৃগাল-কুকুরের মতো মরতে হবে।’ 
১৮ই আগস্ট ১৯৭১। গোলাম আযম বলে, ‘হিন্দুদের সঙ্গে এক জাতি হয়ে এবং হিন্দু-ভারতকে বন্ধু মনে করে অদূরদর্শী কতক মুসলিম নেতা বাঙালি মুসলমানদেরকে সর্বক্ষেত্রে বহু পেছনে ঠেলে দিয়েছে। এর ধাক্কা সামলিয়ে বাঙালি মুসলমানকে আবার অগ্রগতি লাভ করতে হলে মুসলিম জাতীয়তাবোধকেই জাগ্রত করতে হবে। আসুন আমরা অতীতের ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে ঐ প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দান করার দৃঢ় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সত্যিকারভাবে আজাদী দিবস পালন করি। [...] দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের নামই স্থান, ভাষা, জাতি বা ঐতিহাসিক কোনো নাম থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানের নাম এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম। এ নাম যা বিশেষ একটি উদ্দেশ্যের প্রতি সুসম্পর্ক ইঙ্গিত দান করে। এ নামের অর্থ হল পবিত্র স্থান।’ 
১৮ই আগস্ট ১৯৭১। লাহোর। জামায়াতে ইসলামি কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভা। উদ্বোধনী ভাষণে মওলানা আবদুর রহিম বলে, ‘দলের একজন সদস্যও পূর্ব-পাকিস্তানে ‘বাংলাদেশ আন্দোলন’-এর সঙ্গে নিজেকে কোনো ক্রমেই জড়িত করেনি। এর ফলে এটাই প্রমাণিত হয়েছে, সকল প্রকার তুচ্ছ মত-বিরোধ বর্জিত আদর্শিক আন্দোলনের সঙ্গেই জামায়াতে ইসলামি জড়িত। [...] ভারত দুষ্কৃতিকারীদের সাহায্য করছে। তাই পাকিস্তানের উচিত কাল বিলম্ব না করে ভারত আক্রমণ করা এবং আসাম দখল করা।’
১৯শে আগস্ট ১৯৭১। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা স্বাধীনতা-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ১৯৪-জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের পদ শূন্য বলে ঘোষণা করে।
১৯ই আগস্ট ১৯৭১। জামায়াতে ইসলামি কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির শুরার প্রস্তাবে নিন্দা করা হয় এই বলে, ‘ভারতীয় যুদ্ধবাজ কর্তৃক পূর্ব-পাকিস্তানে অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে লুটতরাজ, ধ্বংস সাধন, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করছে। দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে বিশ্বশান্তিকে চরম লঙ্ঘন করছে।’  এই প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘পাকিস্তানের জনগণকে সঙ্কটজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত এবং যুগে যুগে মুসলমানরা যে কুরবানীর নমুনা দেখিয়েছেন তা পুনরুজ্জীবিত করা।’ 
২০শে আগস্ট ১৯৭১। জামায়াতে ইসলামি কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়, ‘ভারতীয় যুদ্ধবাজ ও তাদের চরদের যোগসাজসে পূর্ব-পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্যক্তিদের দমন করার কাজে সরকার যে-সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, মজলিসে শুরা তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছে।’
২১শে আগস্ট ১৯৭১। জামায়াতে ইসলামি কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রস্তাবে বলা হয়, ‘আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ৬০ ও ৭৮ নং বিধি জারি করেছে। কিন্তু প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ উক্ত বিধিগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে না পারায় সেগুলো অকার্যকরী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে তা জনগণকে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশ করবে এবং দেশের সঙ্কট অব্যাহত থাকবে।’ 
২১শে আগস্ট ১৯৭১। প্রাদেশিক সরকার ‘রাজাকার বাহিনী’ গঠনের উদ্দেশ্যে এক অর্ডিন্যান্স জারি করে, যা ‘পূর্ব-পাকিস্তান রাজাকারস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১’-নামে পরিচিত। এই অর্ডিন্যান্স জারি করার মাধ্যমে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ‘আনসার এ্যাক্ট’ বাতিল করা হয় এবং ‘আনসার সংস্থা’র যাবতীয় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, তহবিল, দেনা ও কাগজপত্র নূতন অর্ডিন্যান্স কার্যকরী করার দিন থেকে ‘রাজাকারস সংস্থায়’ স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাদেশিক সরকারের নিদের্শ অনুযায়ী ‘রাজাকার বাহিনী’র সদস্যরা কর্তব্য সম্পাদন করবে। প্রাদেশিক সরকারের জেনারেল কন্ট্রোল ও নির্দেশ অনুযায়ী ‘রাজাকার বাহিনী’ পরিচালিত হবে। 
২৩শে আগস্ট ১৯৭১। রাজাকারদের কর্মকা-ের প্রশংসা করে ‘রাজাকার অর্ডিন্যান্স’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
সম্প্রতি রাষ্ট্র-দ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পর সরকার বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে দেশ ও দেশের সম্পদকে রক্ষা করতে আগ্রীম লোকদের রাজাকার হিসেবে ট্রেনিং দিয়েছেন এবং দিয়ে যাচ্ছেন। [...] রাজাকার বাহিনীর কর্ম তৎপরতাকে অধিকতর ফলপ্রসূ করে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার প্রতিটি সফলকামে মানুষের প্রশংসাভাজন হয়েছেন। বর্তমান সঙ্কট মুহূর্তে দেশের আভ্যন্তরীণ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও দুষ্কৃতিকারীদের দমনের জন্য রাজাকারদের মতো একটি ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। 
২৩শে আগস্ট ১৯৭১। লন্ডন। পিডিপি নেতা মাহমুদ আলী বলে, ‘পূর্ব-পাকিস্তানের ঘটনাবলী সম্পর্কে পাশ্চাত্ত্য সংবাদপত্রসমূহ ইউরোপ ও অ্যামেরিকায় বসবাসকারী পাকিস্তানিদের সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্ত করেছে। এই ব্যাপরে আমি তাদের অনেকের সঙ্গে আলাপ করেছি। তারা জানান যে, এখন পর্যন্ত তারা এই ব্যাপারে অন্ধকারে রয়েছেন।’  সে তার পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে পাকিস্তানিদের অভিযোগের কারণ বিশ্লেষণ করে। সে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর সফর করে এবং সেখানে বসবাসকারী পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। পাকিস্তানিদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সমাধানে সে বলে, ‘পশ্চিম-পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ এবং সেইসঙ্গে সরকারও বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবী স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্রটি শুধু প্রদেশের স্বায়ত্তশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন নিয়েও, যা কোনো দেশপ্রেমিক পাকিস্তানিই মেনে নিতে পারে না। তথাকথিত ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টি বাঙালির সমস্যার সমাধন নয়, এর ফলে তাদের মূল অস্তিত্বই বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান থেকেই বাঙালি লাভবান হতে পারে। [...] গত ২৪-বৎসরে পাকিস্তানে প্রায় ৮০টি পাটকল স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ইস্পাত কারখানা, সার কারখানা, বিরাট ডকইয়ার্ড ও অন্যান্য শিল্প-কারখানাও স্থাপন করা হয়েছে। বাঙালি অফিসারদের দ্বারা এসব পরিচালিত হয়ে আসছে। কেন্দ্রে কতিপয় উচ্চপদে বাঙালি নিয়োগ করা হয়েছে। [...] বাঙালির আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে―গত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও তাকে কেন শাসনের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না, পরিবর্তে তাকে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে। এর উত্তর হচ্ছে―শাসনতন্ত্র রচনার জন্য গণপরিষদ গঠন করা হয়। শাসনতন্ত্র রচনার পর উক্ত শাসনতন্ত্রের অধীনে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যেতে পারে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল শাসনতন্ত্র রচনা করতে সক্ষম হয়নি। এই পরিস্থিতিতে উক্ত দল কীভাবে ক্ষমতা লাভ করতে পারে! [...] ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান ব্যতিরেকে অন্যকোনো সমাধানই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ 
২৭শে আগস্ট ১৯৭১। ‘পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ বিদ্রোহ করেনি’-শীর্ষক প্রতিবেদনে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের মীরজাফরী ভারতের দুরভিসন্ধির হাত থেকে সশস্ত্র-বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানিকে রক্ষা করেছে। [...] দুষ্কৃতিকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের ধ্বংস করার কাজ পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ সশস্ত্র-বাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছে। [...] লুপ্ত আওয়ামী লীগের কর্মীদের ত্রাসের রাজত্ব সম্পর্কে তিনি [গোলাম আযম] বলেন যে, পূর্ব-পাকিস্তানের সরলমনা জনগণকে ভয় দেখিয়ে তাদের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করার জন্য এরা ফ্যাসিবাদী পন্থা অবলম্বন করেছিল। [...] লুপ্ত আওয়ামী লীগ বিচ্ছিন্নতার জন্য পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের কাছ থেকে ভোট পায়নি, তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই জনগণ তাদের ভোট দিয়েছিল। 
২৮শে আগস্ট ১৯৭১। ব্রিটেনে বসবাসরত বাঙালিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক অভিযান চালায়। কিন্তু তাদের এই ভূমিকা প্রসঙ্গে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
ব্রিটেনে বসবাসরত পূর্ব-পাকিস্তানি মুসলমানদের মধ্যে তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যেসব চক্র মুরব্বীর ভূমিকা পালন করে বেশিরভাগই হচ্ছে ইহুদি সম্প্রদায়ভুক্ত এবং অবশিষ্ট ভারতীয় হিন্দু। ‘বাংলাদেশ আন্দোলন’কে পূর্ব-পাকিস্তানিদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে হৈচৈ থেকে শুরু করে ইহুদি প্রভাবিত সব পত্রিকাগুলোর একটানা পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণা, রিলিফ সংস্থা গঠনের নামে গুপ্তচর বৃত্তি এবং ভারতীয় এজেন্ট ও অনুপ্রবেশকারীদের নানাভাবে উৎসাহিত করা―সবই এই ষড়যন্ত্রের অন্তর্গত।
৩০শে আগস্ট ১৯৭১। ‘জাতীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক দল’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] ছাত্র ও শ্রমিক মহলের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাতীয় আদর্শ ভিত্তিক সংস্থাগুলোই ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে সংগ্রাম করে যাচ্ছে এবং সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থকরা বিচ্ছিন্নতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। এ থেকে এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পাকিস্তানের জাতীয় অখ-ত্ব ও স্থায়িত্ব একমাত্র জাতীয় আদর্শের উন্নতি ও জাতীয় আদর্শ-ভিত্তিক দলগুলোর আন্তরিক প্রচেষ্টার দ্বারাই বহাল অন্যদের দ্বারা নয়। বরং যখনই তাদের হাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অর্পিত হবে তখন এদেশের অস্তিত্বই খান খান হয়ে যাবে, এখানকার কোটি কোটি মুসলমানকেও বিজাতীয় চরদের হাতে জীবনহুতি দিতে হবে। আর এর বড় প্রমাণ হচ্ছে হিন্দু-ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের প্রচারক আওয়অমী লীগ নেতা ও সমাজতন্ত্রী ভাসানী-মুজাফফর, তাদের অনুসারীদের অসহযোগ আন্দোলন যার শিকার হয়ে এদেশের নারী পুরুষ শিশুর রক্তে লালে লাল হয়েছে।
৩০শে আগস্ট ১৯৭১। বাংলাদেশের শত্রু রশীদ মিনহাজের জয়গান গেয়ে ‘আমরা গর্বিত’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
[...] পকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলট অফিসার রশীদ মিনহাজ জাতির জন্য নিজের জীবন কোরবানী দিয়ে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের এক অতুজ্জ্বল নিদর্শন আমাদের সামনে রেখে গেলেন। [...] পাকিস্তান সরকার সাহসিকতার জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ খেতাব ‘নিশানে হায়দার’ দিয়ে মরহুম মিনহাজকে সম্মানিত করেছে। [...] মরহুম মিনহাজের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কাহিনী যখন আমরা শুনেছি তখন আমাদের বুক গর্বে, আনন্দে ভরে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিয়ুর রহমান পাকিস্তানের করাচির মাসরুর বিমান-ঘাঁটি থেকে একটি জেট বিমান নিয়ে পাকিস্তান থেকে আসার সময় শিক্ষানবীশ পাইলট মিনহাজ রশীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিমনটি বিধ্বস্ত হয়ে উভয়ই নিহত হলে পাকিস্তান সরকার মিনহাজকে নিশাহে হায়দার খেতাবে ভূষিত করে, এবং মতিউর রহমান নিজামী মিনহাজের পিতার নিকট শোকবার্তা পাঠায়, এতে বলা হয়, ‘মহান মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধ পরিকর’; যা ‘দৈনিক সংগ্রাম’ ৪ঠা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ‘মিনহাজের পিতার নিকট ছাত্রসংঘ প্রধানের তারবার্তা’-শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশ করে।

‘শহীদ মিনহাজের জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত’-শীর্ষক শিরোনামে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ লিখে―
‘আমাকে হাইজ্যাক করা হচ্ছে’―এই ছিল তার শেষ কথা, যা টেপ-রেকর্ডে ধরা পড়েছে। এই কণ্ঠস্বর ছিল অনুমান করার মতো। ঠিক যখন বিশ্বাসঘাতক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিয়ুর রহমান তাকে ক্লোরোফোম দিয়ে কাবু করার চেষ্টা করেছিল। এই উচ্চারণ শুনে মনে হয় তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু যখন তার কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তার ইনস্টাক্টর বিমানটিকে ভারতে নিয়ে যাবেই তখন তিনি শেষ বারের মতো প্রাণপণ চেষ্টা করে বিমানটিকে দুর্ঘটনা-কবলিত করেন। এইভাবে তিনি দেশ ও নিজ কর্তব্যের প্রতি চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করে গেলেন।

ভোট: 
Average: 10 (1 vote)