দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ -প্রাকৃতিক দুর্যোগ

কালবেলা এর ছবি

একটি জাতিকে হত্যা -আব্দুর রউফ চৌধুরী

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ -প্রাকৃতিক দুর্যোগ

বঙ্গোপসাগরের দিকে ধাবমান গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র সৃষ্ট বদ্বীপে ছোট ছোট দ্বীপ ও অসংখ্য খালবিল নিয়ে গঠিত বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল পূর্ব-বাংলা। প্রতি বর্গমাইলে ১২০০ লোক বাস করা এই দেশটির বেশিরভাগ অংশ সমতল ও নিচু, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১.৫ থেকে ২.০ ফুট উঁচু। বঙ্গোপসাগর সাধারণত গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র থেকে জল গ্রহণ করে, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ সে বিদ্রোহী হয়ে বদ্বীপের উপরতল পর্যন্ত ভাসিয়ে নেয়। তখন জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ২০ ফুটের মতো হয়, মাঝেমধ্যে ৫০ ফুটও। এক-একটি জলোচ্ছ্বাস, তার আগমণের আগে যা কিছু বিনির্মাণ করা হয়, সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। তবুও এই নদীমাতৃক দৃশ্যপটে কোটি কোটি পৃথিবীর সবচাইতে দরিদ্র মানুষ বন্যা-খাদ্য-দুর্ভিক্ষ এই তিনটি সমানভাবে খ্যাত সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকে। এসব দ্বীপ অঞ্চলে আধুনিক কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিক অবস্থাই এক-দ্বীপ থেকে অন্য-দ্বীপে যাতায়তের একটি নৌকা পেতে এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। ভূগোল অবশ্য এই এলাকার একমাত্র সমস্যা নয়। ইতিহাস জুড়ে পূর্ব-বাংলার দ্বীপ অঞ্চল হচ্ছে ভারতবর্ষেয় বিভিন্ন সা¤্রাজ্যের উত্থান-পতনের সীমান্তভূমি। এই অঞ্চল সবসময় দূরবর্তী শাসনকর্তা দ্বারা শাসিত হয়েছে, এমনকি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ বিভাজনের পর শাসনকর্তারা ইতিহাসের সবচেয়ে দূরবর্তী শাসনকর্তায় পরিগণিত হয়। কোনো শাসনকর্তাই বন্যা-নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। পূর্ব-বাংলার পাটনির্ভর অর্থনীতিও এ-ব্যাপারে ব্যবহার করা হয়নি। ব্রিটিশরা পাটশিল্প প্রবর্তন করে, কিন্তু দেশবিভাগে সেগুলো কলকাতায় থেকে যায়। পূর্ব-বাংলায় কিছু জুটমিল স্থাপন করা হলেও সরকার প্রবর্তিত কৃষিজ-পণ্যের মূল্য-নির্ধারণ-নীতি ঢাকা ও চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের হাত থেকে চাষীদের শোষিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। পূর্ব-বাংলার পাটনির্ভর অর্থনীতির উদ্বৃত্ত অর্থ পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের নগরাঞ্চলের শিল্পায়ন উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়। পূর্ব থেকে পশ্চিমে সম্পদ স্থানান্তরের বার্ষিক পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫০ মিলিয়ন রুপিতে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ভারতবর্ষ বিভাজনের পর থেকে, বিশেষত ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাশাসন চালু হওয়ার পর থেকে, পূর্ব-বাংলার ক্রমবর্ধমান ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষতির সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয় পূর্ব-বাংলায় বন্যা-নিয়ন্ত্রণের খাতে অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারটিও। বন্যা-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণারত বিশ্বব্যাংক জানায় যে, আনুমানিক ৮০০ মিলিয়ন ডলার খরচে ২০টি বহুমুখী প্রকল্প পূর্ব-বাংলার বন্যা-সমস্যার বৃহত্তর সমাধান দিতে পারে। প্রধানত জাপানি এবং জার্মানি থেকে বিদেশী গাড়ি, রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডশনার এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে পাকিস্তান যা খরচ করে, তার তুলনায় এই খরচ কিছুই না। এই আমদানির ক্ষেত্রে পাাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা যা অর্জন করে তার প্রায় ২০-ভাগ সুদে ব্যয় করে, ফলে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের অধিক বিদেশী ঋণের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যদি ২০টি বহুমুখী প্রকল্প খাতে বিদেশী ঋণের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয় তাহলে পাকিস্তানের যে-কোনো দৃঢ়চেতা সরকার মুদ্রা-সম্পদের সমস্যায় পড়বে না। এছাড়া স্থানীয়ভাবে বিশ্বব্যাংক প্রস্তাবিত কয়েকটি বাঁধ নির্মাণ করার ক্ষমতা পাকিস্তান সরকারের আছে। বিশ্বব্যাংক প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণ না করা সরকারের ইচ্ছার ব্যর্থতা, অর্থের নয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক প্রয়োজনীয় ৮০০ মিলিয়ন ডলার দিতে চাইবে না; কারণ সিন্ধুর পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা নিষ্পন্ন করার জন্য এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। অবশ্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান বন্যা-নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণা করেন, ‘আমার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশন এই কর্মসূচীতে আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য বন্ধুভাবাপন্ন সব দেশ থেকে সহায়তা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আমি নিশ্চিত যে আন্তর্জাতিকগোষ্ঠী পূর্ব-পাকিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি এই সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে।’  কিন্তু প্রেসিডেন্ট সমস্যার ভয়াবহতাকে জাতীয় পর্যায়ে স্থান দেননি। বন্যা-নিয়ন্ত্রণে আভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহার এবং বন্যার ধ্বংসাত্মক আক্রমণকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা সরকারের এজেন্ডার মধ্যে আনা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিশেষ তহবিল গঠনের ইচ্ছা আছে। পাকিস্তান নিজেই যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ প্রদান করবে।’ 
২৩শে অক্টোবর ১৯৭০। একটি সাইক্লোন আঘাত হনে। রেডিও সম্প্রচার বন্ধ রেখে বারবার উপকূলবর্তী অঞ্চলে সতর্কবাণী প্রচার করায় মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যায়, তবুও ৩০০-জন মারা যায়। 
১২ই ও ১৩ই নভেম্বর ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ২৫০ মাইল বেগে সাইক্লোন আঘাত হানার আগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকার পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও রাডার স্টেশনগুলো সক্রিয়ভাবে প্রতি দিনের মতোই কাজ করে যায়। আবহাওয়াবিদরা ‘হারিকেন ডেঞ্জার’ এবং ‘হারিকেন গ্রেট ডেঞ্জার’ সম্বন্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করলেও দুঃখের বিষয় যে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এ-ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেনি।
১২ই নভেম্বরে সতর্কবাণী প্রচার করলেও সরকারি কর্মকর্তা ও শাসকগোষ্ঠীর অসতর্কতা ও অবহেলা রয়ে যায় অপরিসীম। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২৫০ মাইল বেগে ঘুর্ণিঝড় ধেয়ে আসার চিত্রটি পাওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তার অসতর্কতা ও অবহেলার দুটো উদাহরণ দেওয়া যায়―
১.    সমুদ্র-জাহাজের জন্য চালনা সমুদ্রবন্দরে সর্বোচ্চ ১০-নম্বর ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে সর্বোচ্চ ৯-নম্বর বিপদ-সংকেত দেখানো ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
২.    জাহাজসমূহ নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে গেছে অনুমান করে উপকূল থেকে দূরবর্তী দ্বীপসমূহের নিকট সাইক্লোন আসার পর বিপদ-সংকেত প্রত্যাহার করে নেয়।
কর্মকর্তার অসতর্কতা ও অবহেলার কারণে পূর্ব-বাংলার সাধারণ মানুষ ভাবতে পারেনি যে, সাইক্লোনটি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সাইক্লোনটি দিক পরিবর্তন ও শক্তিসঞ্চয় করে যথাসময়ে পূর্ব-বাংলার উপকূলে আঘাত হানে। সাইক্লোনের সঙ্গে ধেয়ে আসে জলোচ্ছ্বাসও। এই আঘাতের পর, চট্টগ্রামের ভূমিকম্প-পরিমাপ স্টেশনের কর্মকর্তারা জলোচ্ছ্বাসের উপরিভাগের পরিমাপ প্রকাশ করতে সমর্থ হলেও, সরকারি কর্মকর্তারা বা শাসকগোষ্ঠী জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও গভীরতার পরিমাপ অনুমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস সঠিকভাবে প্রচার করলে বাস্তব কারণেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অর্ধেকের চেয়েও কম হত। জলোচ্ছ্বাসের আঘাতের ১২-ঘণ্টা পর, প্লাবিত দ্বীপ হাতিয়া থেকে ওয়ারলেস বর্ণনায় জানা যায় যে, অনেক লোক মারা গেছে। এই খবরে প্রকাশিত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য ভুল বলে চট্টগ্রামের আবহাওয়া অফিস ওয়ারলেস বর্ণনা বন্ধ করে দেয়; বরং তারা প্রচার করতে থাকে যে, ভোরবেলা দেখা যাবে এই স্বল্প উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে কীরকম ক্ষয়ক্ষতি করেছে। বাস্তবে, পূর্ণিমার কারণে বঙ্গোপসাগরে বিশাল উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়। এই আঘাতের পর, সরকারি কর্মকর্তারা সরকারের, সরকার স্থানীয় এজেন্সির, স্থানীয় এজেন্সি সরকারি কর্মকর্তার ঘাড়ে দোষ চাপাতে ব্যস্ত। দায়িত্বে থাকা অলস ব্যক্তিরা তাদের দোষ এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলে, ‘সাইক্লোন আঘাত আনার কয়েক ঘণ্টা আগে আমরা রোজা ভাঙার জন্য ইফতারী করতে গিয়েছিলাম। এজন্য আমরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলাম।’  সাইক্লোন আঘাত হানার পর দুর্যোগের প্রকৃত মাত্রা বোঝা যায়নি। ঢাকার এক পত্রিকা লিখে, ‘এ-হচ্ছে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়।’ 
১৩ই নভেম্বর ১৯৭০। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃতসংখ্যা ৫০ হাজার। সরকারি হিসেবে আস্তেধীরে বাস্তবতার ছোঁয়া লাগলে, ফলে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৭৫ হাজার। ১৪ই নভেম্বর ১৯৭০, মৃতসংখ্যা অনুমানিক ২০০ হাজারে পৌঁছে। সঠিক সংখ্যা পাওয়া অসম্ভব, তবে বিশ্বের সামনে আস্তেধীরে পূর্ব-বাংলার ধ্বংসলীলার বাস্তব চিত্রটি দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করে।
ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সাহয্য আসে মাত্র ত্রিশ হাজার পাউন্ড, পরে এর পরিমাণ এক মিলিয়ন পাউন্ডে বৃদ্ধি করা হয়। এক মিলিয়ন অতিরিক্ত পাউন্ড দেওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়। এরকম পরিমাণের ত্রাণ-উদ্যোগ ব্রিটেনের ইতিহাসে এই প্রথম। লীগ অফ রেডক্রস সোসাইটি ও জাতিসংঘের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য পাকিস্তান আবেদন জানালে, বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো বাতিল করে ঢাকা বিমানবন্দরে ত্রাণসামগ্রী বহনকারী বিমানগুলো অবতরণ করতে অনুমতি দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেরি হওয়ায় পূর্ব-বাংলায় দ্রুত সাহায্য পাঠানো সম্ভব হয়নি। সরকারের অনুমতি আদায় করতেও বেশ বেগ পেতে হয়। সরকার যখন রাজি হয় তখন সাহায্যের বিরাট অংশ পূর্ব-বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে জমা হয়। সরকারের সঠিক নীতিমালা না থাকায় উপকূল অঞ্চলে সেসব ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে আরেক সময় লাগে। অল্প পরিমাণের যে ত্রাণসামগ্রী রেডক্রসের মাধ্যমে উপকূল অঞ্চলে পৌঁছে তা বিতরণ করতে বিরাট ঝামেলা সৃষ্টি হয়; কারণ, একদিকে যেমন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা-পাওয়া রাস্তাগুলো নরম পলির দখলে, তেমনি অন্যদিকে জলপথে সচল নৌকাগুলোর অভাব। এই ঝামেলা অতিক্রম করতে প্রয়োজন হেলিকপ্টার ও ইঞ্জিল-চালিত নৌকার, কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীর কাছে থেকে এসব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানের সামরিক সরকারের কাছে এ-ধরনের মহাদুর্যোগ সামাল দেওয়ার সুব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও দ্রুতগতির যানবাহন থাকা সত্ত্বেও পূর্ব-বাংলার বেলায় শুধু পাঁচটি ইনফ্যান্টরি ডিভিশন আংশিকভাবে ব্যবহার করা হয়।
১৬ই নভেম্বর ১৯৭০। সামরিক বাহিনী ত্রাণকার্গো বহন ও বিতরণ বিতরনের ব্যাপারে সক্রিয় থাকার আদেশ পায়। তারা পাঁচ হাজার জীবিত-দূর্গতদের কলেরা ও টাইফয়েডের প্রতিষেধক ও মৃতদের কবর দেওয়া এবং রাস্তাঘাট পুননির্মাণে নিয়োজিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন এবং রেডক্রসের মধ্যে কর্ম-ব্যবস্থায় সমন্বয় না থাকায় আবারও ঝামেলা সৃষ্টি হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়―
ব্রিটিশ উদ্ধারকারী বিমানগুলো ঢাকায় আটকা পড়ার কারণ―রেডক্রস না সেনাবাহিনী রিলিফ-কাজ পরিচালনা করবে এ-বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকা। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নিদের্শ দেওয়া হয় যে, রিলিফ কমিশনার হিসেবে একজন বেসামরিক-ব্যক্তির পরিবর্তে একজন সেনা-কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অধীনে ২৫টি হেলিকপ্টার থাকা সত্ত্বেও অল্প ওজন বহনকারী মাত্র একটি হেলিকপ্টার জীবিত-দুর্গতদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। বেশি ওজন বহনকারী হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করা উচিত ছিল। এ-বিষয়ে রিলিফ কমিশনার জানান, ‘পাকিস্তান থেকে বেশি ওজন বহনকারী হেলিকপ্টার আনা সম্ভব নয়, কারণ ভারত তার ওপর দিয়ে এগুলো উড়ে আসতে অনুমতি দেয়নি।’  অন্যদিকে ভারত বলে, ‘আমাদের অনুমতির জন্য কখনই বলা হয়নি।’  আসলে, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অধিকাংশ ঘাঁটিই পাকিস্তানের পশ্চিামাংশে, আর সেখান থেকে হেলিকপ্টারগুলো পূর্ব-বাংলায় আনতে হলে অনেক ব্যয় হবে, আর শত্রুদেশ ভারতের ঘাঁটিতে অবতরণ করতে হবে। তাই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ সেগুলোকে ত্রাণকাজে ব্যবহার করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে নঙ্গর ফেলা একটি জাহাজ থেকে ব্রিটিশ হেলিকপ্টার ও এসল্ট নৌকাগুলো ব্যবহার করা হয়। অ্যামেরিকান হেলিকপ্টারগুলোও আসতে শুরু করে। আশা করা যায় যে, ত্রাণবিতরণ ঠিকমতো পরিচালিত হবে, এবং জীবিত-দুর্গতদের কাছে ত্রাণসামগ্রী একসময় পৌঁছবে।
১৮ই নভেম্বর ১৯৭০। দুই সপ্তাহ পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা মাথায় রেখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ব-দ্বীপ অঞ্চল হেলিকপ্টার যোগে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। রাওলাপি-ি সরকার এই ভ্রমণকে পূর্ব-বাংলার ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট বলে মনে করে। সাইক্লোনের আগে, পূর্ব-বাংলার প্রধান নির্বাচনী ইস্যু ছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, কিন্তু সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের পর, পূর্ব-বাংলার এগারোটি দলের নেতৃবৃন্দ ত্রাণবিতরণ ও মানব-ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাকৃতিক-দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে নির্বাচন বাতিল করার দাবি তুলেন। অবশ্য নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ কোনো মন্তুব্য করেনি। পিকিংপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি তার প্রার্থীদের নাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। বিপদজনক পদক্ষেপ হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো দল জাতীয় নির্বাচন স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। পূর্ব-বাংলার নেতারা সুস্পষ্ট ভাষায় দাবী করেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ে কত লোক মারা গেছে এর হিসেব সরকারকে দিতে হবে।’  জবাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘দুই লাখ।’  আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মীরা বলে, ‘দশ লাখ।’  সঠিক সংখ্যা কী এ-নিয়ে তর্কের তুফান তুলে লাভ নেই, কারণ একজন সচতেন ব্যক্তি জানেন যে, ত্রাণবিতরণ এবং বন্যা-উপদ্রুব ব-দ্বীপকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যদি সামরিক সরকারের পক্ষে সম্ভব না হয় তাহলে অসহায়ত্বের চিহ্ন ধারণ করে বেঁচে থাকা দুর্গতদের বাঁচিয়ে রাখা পূর্ব-বাংলার মানুষের পক্ষে একা সামাল দেওয়া অসম্ভবই বটে, বরং বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো থেকে সাহায্য নেওয়া উচিত।
২২শে নভেম্বর ১৯৭০। প্রলয়ঙ্ককরী ঘূর্ণিঝিড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ‘বিরান ভূমি’ বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল অঞ্চল সফর শেষে পল্টন ময়দানের এক জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘বাঙালির জীবনে আজ মহাদুঃখের দিন। আমাদের জীবনে নেমে এসেছে মহাদুর্যোগ। বিধ্বস্ত বিরান ভূখ-ে, উন্মুক্ত আকাশের নীচে, আমাদের অগণতি মা-বোন উলঙ্গ হয়ে পড়ে রয়েছে। বিরান জনপদের কোথাও কোনো ঠাঁই নেই। এই শীতের দিনে ধনী-গরিব কারও মাথা গোঁজার ঘর নেই। [...] পূর্ব-বাংলার উপকূলের ১০ থেকে ১২ লক্ষ নরনারী ও শিশু এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছে, কিন্তু মহাধ্বংসযজ্ঞের ১০-দিন পরও প্রায় ৪ লক্ষ মানুষরে লাশ পড়ে আছে। এদের দাফনের কোনো ব্যবস্থা নেই।’  সরকার ও সরকারি প্রচারযন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ লক্ষ ভাইবোনদের মৃত্যুর সংবাদ রেডিও পাকিস্তান ও সরকার আমাদের জানায়নি। আট হাজার মাইল দূর থেকে বিবিসি মারফৎ আমরা এই দুঃসহ সংবাদ জানতে পারি। এছাড়া দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সাংবাদিক ও আলোকচিত্র শিল্পীরা এগিয়ে এলেও আমাদের ইসলামাবাদের সরকার দুর্গত বাঙালির সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।’  ভাসানী সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, ‘বাঙালির দুঃখের দিনে সরকার সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেনি, অথচ কথায় কথায় জাতীয় সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের কথা বলা হচ্ছে। এইসব সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব বোগাস।’  কেন্দ্রীয় বাঙালি মন্ত্রীদের হৃদয়হীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাঙালি মন্ত্রীরা এমন হতে পারে তা আমি কোনোদিন কল্পনাও করেনি। বাঙালির দুঃখের দিনে তারা কেউই এসে আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।’  ভাসানী নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের [ন্যাপের] কাছে নির্বাচনের চেয়ে মানুষ বড়ো তাই আমরা নির্বাচন করব না। দুর্গত মানুষের সেবায় আমরা সর্বশক্তি নিয়ে এগিয়ে যাব। এই অবস্থায় কেউ যদি নির্বাচন করতে চায় তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’ 
‘দি টাইমস’ পত্রিকার একজন প্রতিনিধি ফরাসী হেলিকপ্টার যোগে, ১২ই নভেম্বর ১৯৭০, জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত বৃহত্তম দ্বীপ হাতিয়ায় যান। তার বিবৃতি―
এই বিরান ভূখ-ে গবাদিপশু ও মানুষের মৃতদেহের স্তূপ দেখতে পেয়েছি। জীবিত মানুষ এখানে-সেখানে, গাছের নীচে, ভিড় জমিয়ে আছে। তাদের কেউ কেউ, বিশেষ করে শক্তসমর্থ পুরুষরা, পর্বত-পরিমাণ ধাবমান জলের হাত থেকে বাঁচার জন্য গাছে উঠেছিল। সৌদি আরব থেকে আসা ‘ওইতে’-নামের হেলিকপ্টারটি ব্রিটেনসহ আটটি দেশের সমন্বিত ত্রাণবিতরণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিমানযোগে পূর্ব-বাংলার রাজধানী ঢাকায় খাবার, কাপড়, জল-পরিষেধক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য জিনিশ এসে জমা হচ্ছে। পাকিস্তানের সৈন্যরা এসব রক্ষার জন্য পাহারা দিচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে ত্রাণসামগ্রী সাধারণত হেলিকপ্টারযোগে সরবরাহ-ডিপতে আনা হচ্ছে। তারপর উপকূল ও বন্যায় ভেসে যাওয়া দ্বীপগুলোতে নেওয়া হবে। ব্রিটিশ কমান্ডো হেলিকপ্টারগুলো পটুয়াখালী-সাপ্লাই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪,৫০০ টন চাল, তেল, ময়দা, বিস্কুট, চিনি, আলু, গুঁড়ো-দুধ এবং কাপড়-চোপড় উপদ্রুব অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রিটিশের ত্রাণ-সরবরাহের কাজে রেডক্রস ও অন্যান্য সংস্থা সন্তুষ্ট।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার সরকারের ‘ভুল ও বিলম্বে নেওয়া পদক্ষেপ’ স্বীকার করে আন্তর্জাতিক সাড়াকে অভূতপর্ব বলে বর্ণনা করেন, তবে তিনি বিদেশী সাহায্য কতদিন পর্যন্ত প্রয়োজন এ-ব্যাপারে নীরব থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এই সাহায্যের প্রয়োজন অন্তত দুই বছর লাগবে, কারণ একটি কানাডিয়ান সংস্থা দ্রুত-জরিপের মাধ্যমে সরকারকে ঘূর্ণিঝড়-উপদ্রুব অঞ্চলকে ‘স্বাভাবিক’ করে তোলার জন্য দুই বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার পরামর্শ দেয়। অবশ্য পাকিস্তান বিশ্বব্যাংকের কাছে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডের জরুরি উন্নয়ন প্রকল্প-প্রস্তাব পেশ করে। এ-নিশ্চিত যে, সর্বগ্রাসী সমুদ্র অঞ্চলের ব-দ্বীপগুলোর কৃষিভূমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আরও সময়ের প্রয়োজন, কারণ―
১.    ত্রিশ মাইলব্যাপী উপদ্রুব-এলাকায় কোনো বাড়িঘরই রক্ষা পায়নি।
২.    ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষিজমি পূর্বের উৎপাদন ক্ষমতায় ফিরে আনতে তিন বছর সময় লাগবে।
৩.    বিশুদ্ধ জল সরবরাহের ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে এবং কৃষিভূমিকে সমুদ্রের হাত থেকে রাক্ষা করার জন্য নতুন বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
এই ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ব-বাংলায় একটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। একদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিজের দোষ ঢাকার জন্য বলেন, ‘পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ভারত দ্বারা বিভক্ত পূর্ব-বাংলার ধ্বংসলীলা মোকাবেলায় উদাসীনতা ও অবহেলার পরিচয় দিয়েছে।’  অন্যদিকে, বাঙালি বলে, ‘পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে ত্রাণসামগ্রী পূর্ব-বাংলায় আসার আগেই বহির্বিশ্ব থেকে হেলিকপ্টার, খাদ্য ও অর্থ এসে পৌঁছে, এমনকি ত্রাণের জন্য বরাদ্দ ৪.৪ মিলিয়ন টাকা ঘোষণা করতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার দশ দিন সময় লেগেছে।’  এছাড়াও প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, মৃতদের সৎকারের জন্য পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিবর্তে তিনি ব্রিটিশ নাবিকদের ব্যবহার করেন।
কিছুদিন পর, সাংবিধানিক আইন-পরিষদের জন্য পাকিস্তানে নির্বাচন (১৯৭০) অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ব-বাংলায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের আশি শতাংশ ভোট পাওয়ার কথা। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে ঘূর্ণিঝড়-দুর্গতদের অবহেলা ও বঞ্চনা করার জন্য অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে পূর্ব-বাংলার বাঙালি জনগণের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবী করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ঘূর্ণিঝড়-দুর্গতদের সমস্যা সমাধান করার ব্যর্থতা তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে সাহায্য ও বাধ্য করবে। প্রথমবারের মতো ঢাকার পোস্টারে দেখা যায়, ‘সব নির্বাচিত সদস্যকে অবশ্যই রাওয়ালপি-ি থেকে নয়, ঢাকা থেকে শাসনকার্য চালাতে হবে।’  প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই বিরোধিতার মোকাবেলায় সতর্ক করে দেন, ‘যদি নব নির্বাচিত আইন-পরিষদ এমন একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে যা মূলনীতির সঙ্গে অমিল থাকে, তাহলে সামরিক-শাসন অব্যাহত থাকবে।’  মূল নীতিগুলোর একটি হচ্ছে শুধু পূর্ব-বাংলার ক্ষেত্রে সীমিত স্বায়ত্তশাসন স্থাপন করা হবে।

 

  দি গার্ডিয়ান, ১৬ই নভেম্বর ১৯৭০।
  দি গার্ডিয়ান, ১৬ই নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দৈনিক পাকিস্তান, ২৪শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দৈনিক পাকিস্তান, ২৪শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দৈনিক পাকিস্তান, ২৪শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দৈনিক পাকিস্তান, ২৪শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দৈনিক পাকিস্তান, ২৪শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি টাইমস, ২৯শে নভেম্বর, ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।
  দি ইকোনমিস্ট, ২৮শে নভেম্বর ১৯৭০।