তৃতীয় পরিচ্ছেদ -১৯৭০-এর নির্বাচন

কালবেলা এর ছবি

একটি জাতিকে হত্যা -আব্দুর রউফ চৌধুরী

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
১৯৭০-এর নির্বাচন

রাস্তা-ঘাটে লাউড-স্পিকারের সাহায্যে ভ্যান থেকে দীর্ঘ বক্তৃতা প্রচার, সংবাদপত্রে রাজনৈতিক অভিযোগ ও পালটা অভিযোগ তোলা, সবরকম সহিংসতা প্রতিরোধ করার জন্য সরকার সেনাবাহিনী মতায়ন―এসব কথা লিখেন গ্যাভিন ইয়্যাং তার প্রতিবেদনে [দি অবজারভার, ৫ই ডিসেম্বর ১৯৭০]।
৭ই ডিসেম্বর ১৯৭০। পাকিস্তানের ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। ২৩ বছরের মধ্যে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৬ মিলিয়ন ভোটারের এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকবে কিনা। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন―পূর্ব-বাংলা কী নিখিল পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে যাবে? অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে অনলবর্ষী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর। তিনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নিখিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান হন তাহলে পূর্ব-বাংলা পৃথক হবেই, পূর্ব-বাংলার বামপন'ী নেতারাও স্বাধীনতার পক্ষেই।
লাহোরের স্বর্ণোদ্যান শহরের এক প্রাসাদ-উপম বাড়ির ডাইনিং-টেবিলে গ্যাভিন ইয়্যাংয়ের কথা হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতাকর্মী ও কোটিপতি পাঞ্জাবি তরুণ আর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পক্ষে সাধারণ নির্বাচনী প্রচারকর্মী ও উদীয়মান আইনজীবীর সঙ্গে। উভয়ই কেমব্রিজে ছিল। তারা তাদের বাড়ির কাজে সাহায্যকারীদের কাছে বামপন'ী প্রচারপত্র বিতরণে ব্যস্ত। তারা ক্লান্ত হাতে মুখে খাবার তুলে নিতে নিতে আলাপে লিপ্ত হয়। ভুট্টোর দলের সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির পার্থক্য কী গ্যাভিন ইয়্যাং জানতে চাইলে, ক্লান্ত-দৃষ্টিতে তরুণ পাঞ্জাবি বলে, ‘অদ্ভুত, ভুট্টো বামপন'ীর ভক্ত। আমাদের দল অবশ্য মাও-সে-তুং-এর অনুসারী।’ সে শান্তভাবে এ্যাশট্রেতে সিগারেট নিভিয়ে যোগ করে, ‘ভুট্টো মুসলমানদের নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছেন।’ আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে যোগ করে, ‘শ্রমিকরা এখন যে কাঁচা-পাঁকা দাড়িওয়ালা মৌলভীর দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে তা হয়তো আপনি লক্ষ্য করেননি।’
আইনজীবী উত্তর দেয়, ‘পাকিস্তান এখনও সনাতনপন'ী রাষ্ট্র। ধর্মই পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ সেতু সৃষ্টি করেছে। ইসলাম ও সমাজতন্ত্র ব্যবহার করা তাই যৌক্তিক কৌশল মাত্র। মূলস্রোতের বাইরে বামপন'ী ভোটাররা অনিশ্চিত সিদ্ধান্তে আছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা বুঝতে পারবে যে, তারা কী তাদের মনমতো ফলাফল পেয়েছে।’ পাকিস্তানে বামপন'ী রাজনীতি, এক অদ্ভুত ব্যাপার―অপ্রচলিত কিন' অনেক ধারায় বিভক্ত, মাওবাদ থেকে সুকর্ণবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত, তবে কখনও কখনও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে ফিরে আসে। সক্রিয় বামপন'ী নেতারা অবশ্য অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল, কেউই শ্রমজীবী শ্রেণীভুক্ত নন, তবে ইসলামপন'ী দলের বিপক্ষে। আইনজীবী বলে চলে, ‘দেখতেই পারছেন, একদিকে পূর্ব-বাংলায় মুজিব বিজয়ের অপেক্ষায়, আর অন্যদিকে ভুট্টো সনাতনপন'ীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত। একদিকে মুজিবের সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ জয়ের জন্য একত্রিত হচ্ছে, আর অন্যদিকে ভুট্টো একইসঙ্গে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিজয়ের আশায়, নির্বাচনী আইন তাকে এ-সুযোগ দিয়েছে। বিজয়ী হওয়ার জন্য মুজিব সুনির্শ্চিত, কিন' চিন্তিত জয়ের পর কী হবে। ‘ছয়দফা’ প্রস্তাব তাকে পূর্ব-বাংলার জন্য স্বায়ত্তশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে।’
‘ছয়দফা’ পরিকল্পনা হচ্ছে সুকৌশলে স্বাধীনতার সংগ্রামকেই অনিবার্য করে তোলা। ‘ছয়দফা’র প্রস্তাবে বলা হয়―
১.    দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো হবে ফডোরেল শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম।
২.    ফডোরেল সরকারের ক্ষমতা দেশরক্ষা, বৈদেশকি নীতি ও মুদ্রা-ব্যবস'া―এইরকম কয়েকটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, অপরাপর সকল বিষয়ে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা হবে নিরঙ্কুশ।
৩.    দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকবে। এ-ব্যবস'ায় মুদ্রা-ব্যবস'া কেন্দ্রের হাতে থাকবে। কিন' এ-অবস'ায় শাসনতন্ত্রের এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে যাতে পূর্ব-বাংলার মুদ্রা পশ্চিম-পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে। এ-বিধানে পাকিস্তানের একটি ফডোরেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে, দুই অঞ্চলেই দুটো পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং পূর্ব-বাংলার জন্য পৃথক অর্থনীতি প্রবর্তন তরতে হবে।
৪.    সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা, করধার‌্য ও কর-আদায়ের সকল ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। ফডোরেল সরকারের কোনো কর-ধার‌্য করার ক্ষমতা থাকবে না। আঞ্চলিক সরকারের আদায়ী রেভেনিউর নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফডোরেল তহবিলে জমা হবে। এ-মর্মে রির্জাভ ব্যাংক-সমূহরে উপর পরীক্ষামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকবে।
৫.    ফডোরেশনের প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে সমানভাবে অথবা শাসনতন্ত্রের নির্ধারিত হার অনুযায়ী প্রদান করতে হবে। দেশজাত দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর এখতিয়ারাধীন থাকবে। ফডোরেল সরকারের প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমনাদী-রপ্তানী করার অধিকঠর অঙ্গরাষ্ট্রগুলোর হাতে ন্যস্ত করে শাসনতন্ত্রে বিধান করতে হবে।
৬.    পূর্ব-বাংলাকে মিলিশিয়া বা প্যারা-মিলিটারি রক্ষীবাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। পূর্ব-বাংলায় অস্ত্র-কারখানা নির্মাণ ও নৌবাহিনীর সদর দফতর স'াপন করতে হবে।
বাঙালিরা পূর্ব-বাংলার আত্মমর্যাদা রক্ষা ও উপনিবেশ ঠেকানোর জন্য আওয়ামী লীগের ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের ভিত্তিতে পুরোমাত্রায় স্বায়ত্তশাসন চায়। আওয়ামী লীগের একজন কর্মী বলেন, ‘মনে রাখবেন এই ভোট হচ্ছে সত্যিকার অর্থে পূর্ব-বাংলার স্বাধীনতার ভোট। শেখ মুজিব শুধু স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পূর্ব-বাংলার স্বাধীনতা আটকে রেখেছেন।’ শেখ মুজিব অবশ্য ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ করবেন না; বরং রাজস্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রদেশের অধীনে রাখার দাবি করেন। তিনি প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা-ব্যবস'া―এসব বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় দুর্বল সরকারের অধীনে রাখার পক্ষে।
‘ছয়দফা’ প্রস্তাব ভুট্টোসহ বেশিরভাগ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর মনে ভয়ের জন্ম দিয়েছে। ভুট্টো বলেন, ‘[...] ‘ছয়দফা’র সবকিছু আমি গ্রহণ করতে পারি না।’ জাঁদরেল, কিন' সূক্ষ্ম-বুদ্ধি-সম্পন্ন সমরনায়ক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে ‘ছয়দফা’র দাবিগুলো গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ এতে পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পাঞ্জাবি-প্রভুত্ব সেনাবাহিনীর কাছে ‘ছয়দফা’র দাবিগুলো গৃহীত হয়নি; যদিও তারা পূর্ব-বাংলায় গণতন্ত্র চায়, তবে ‘ছয়দফা’র ভিত্তিতে নয়। এমন গণতন্ত্র তারা চায় না যে-গণতন্ত্র তাদেরকে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের প্রতি চিরদিনের জন্য মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। ‘ছয়দফা’ প্রস্তাব স্বায়ত্তশাসনের কারণে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য, যা পূর্ব-বাংলার মতো পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং জাতীয় সংহতি আরও সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে। তাই আইনসভার প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই পাঞ্জাবি সেনাবাহিনীর দাপট বজায় রাখার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অচলাবস'ার সৃষ্টি করে। পাকিস্তানের সমরনায়করা ‘ছয়দফা’র প্রস্তাবে নারাজ থাকলেও রাজনৈতিকভাবে ভারতের বিরুদ্ধে একে রক্ষাকবচ হিসেবে অনুমোদন দিতে রাজনীতিবিদরা বাধ্য; কারণ পাকিস্তানের অর্থনীতি নিয়ে বাঙালিরা কিছু করুক তা শাসকগোষ্ঠী চায় না, পাঞ্জাবিরাও না; তবে নব-নির্বাচিত আইন-পরিষদ যখন নতুন সংবিধান প্রবর্তন করবে তখন বাঙালির সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘাত ঘটবেই, তা ঘটা স্বাভাবিক। তবে এও সত্য যে, সংবিধান অনুমোদন না-করা পর্যন্ত সেনাবাহিনী রাষ্ট্র-ক্ষমতা হাতছাড়া করবে না।
গ্যাভিন ইয়্যাং যখন ঢাকার একটি শদামাটা বাড়িতে শেখ মুজিবুরের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন দেখতে পারেন যে, পূর্ব-বাংলার উদীয়মান তারকা, অপ্রতিরোধ্য, তীব্রভাষী, অন্তপ্রাণ রাজনীতিবিদ পাইপ দিয়ে তামাক খাচ্ছেন। তার কণ্ঠ ভরাট, চোখ তীব্রভেদী। গ্যাভিন ইয়্যাংয়ের মতে, শেখ মুজিবুর রহমান খুবই গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, শিপিং জাতীয়করণ করা নিয়ে আলাপ করেন। মুজিব বলেন, ‘এতদিন পরে পাকিস্তানের ‘উপনিবেশ’ হিসেবে পরিচিত পূর্ব-বাংলা বাণিজ্য-সম্পর্ক স'াপন করবে পশ্চিম-বাংলার (ভারত) সঙ্গে।’ তবে গ্যাভিন ইয়্যাং জানেন না, শেখ মুজিব কী ধরনের প্রধানমন্ত্রী হবেন। অবশ্য তার অনেক সহকর্মীর মধ্যে কেউ কেউ বামপন'ী রাজনীতি থেকে অনেক দূর অবস'ান করেন এবং তাদের দক্ষতা নিয়ে অনেকেই অনিশ্চিত। প্রসঙ্গত, ‘বাংলার বাঘ’ শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে ১৭ই মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ লুৎফর রহমান ও সাহারা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হচ্ছেন তিনি। শেখ মুজিবের শৈশবকাল কাটে টুঙ্গিপাড়ায়। তারপর সাত বছর বয়সে গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা ও নয় বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার লেখাপড়ায় সাময়িক বিরতি ঘটে। চার বছর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পর শেখ মুজিব পুনরায় স্কুলে ভর্তি হন। ১৮ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে সম্পন্ন হয়। তারা দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলের জনক-জননী। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে পদাপণ করলে মুসলিম লীগের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতাস' ‘ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট এসোসিয়েশন’-এর সম্পাদক ও ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র-সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১১ই মার্চ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালন করার সময় বঙ্গবন্ধু সহকর্মীদের সঙ্গে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভরত অবস'ায় গ্রেফতার হন এবং ১৫ই মার্চ মুক্তি পান। ১৯শে এপ্রিল ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ধর্মঘট করার সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং জুলাই মাসের শেষের দিকে মুক্তিলাভ করেন। সেপ্টেম্বরে ১৪৪-ধারা ভাঙার দায়ে গ্রেফতার হন এবং পরে মুক্তি লাভ করেন। ১৪ই অক্টোবর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের আগমন উপলক্ষ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ ভুখা মিছিল বের করার সময় শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন এবং ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। ডিসেম্বরে তিনি পিকিং-এ বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। ৯ই জুলাই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। পাকিস্তান গণপরিষদের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে মওলানা ভাসানী, এ.কে. ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে ঐক্যমত ঘটলে ১৪ই নভেম্বর দলের বিশেষ কাউন্সিল ডেকে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১০ই মার্চ ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টিতে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে (আওয়ামী লীগ―১৪৩টি)। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ১৫ই মে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। ৩০শে মে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিলে বঙ্গবন্ধু করাচি থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হন এবং ২৩শে ডিসেম্বর ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি লাভ করেন। ৫ই জুন ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে, ১৭ জুন ১৯৫৫, ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু আবারও পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানান এবং ২১-দফা ঘোষণা করা হয়। ২৩শে জুন ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগের কার্যকরী পরিষদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্তশাসন প্রদান না-করা হলে দলীয় সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করবেন। ২৫শে আগস্ট ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘স্যার আপনি দেখবেন ওরা পূর্ববাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব-পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটি নিজস্ব ইতিহাস আছে, এর একটা ঐতিহ্য আছে। আপনারা এই নাম আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি এই নাম পরিবর্তন করতে চান তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তন মেনে নেবে কিনা। এক ইউনিটের প্রশ্নটা গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আপনারা এই প্রশ্ন এখনই কেন তুলতে চান? বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কি হবে? যুক্ত নির্বাচনী এলাকা গঠনের প্রশ্নেরই কি সমাধান? আমাদের স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধেই বা কি ভাবছেন? পূর্ববাংলার জনগণ অন্যসব প্রশ্নের সমাধানের সঙ্গে এক ইউনিটের প্রশ্নটাকে বিবেচনা করতে প্রস'ত। তাই আমি আমার এই অংশের বন্ধুদের কাছে আবেদন জানাবো তারা যেন আমাদের জনগণের ‘রেফারেন্ডাম’ অথবা গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া রায়কে মেনে নেন।’ ২১শে অক্টোবর ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহার করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুুক্তির দাবি জানান। ১৪ই জুলাই, আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৪৪-ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখমিছিল বের করা হয়। চকবাজার এলাকায় পুলিশ ভুখমিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করলে তিনজন নিহত হয়। ১৬ই সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধু কোয়ালিশন সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দফতরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। ৩০শে মে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ মুজিব মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ৭ই আগস্ট ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নে সরকারি সফরে যান। ৭ই অক্টোবর ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক-শাসন জারি হওয়ার পর রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তারপর ১১ই অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও একের-পর-এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়। প্রায় চৌদ্দ মাস জেলে থাকার পর তাকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেলগেটেই গ্রেফতার করা হয়। ৭ই ডিসেম্বর ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তি লাভ করেন। সামরিক শাসন ও আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। এই সময় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশিষ্ট ছাত্র নেতৃবৃন্দের দ্বারা ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধুকে জননিরাপত্তা আইনের আদলে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৮ই জুন চার বছরের সামরিক শাসন অবসান (২রা জুন) হওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২৫ই জুন, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস'ার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। ৫ই ও ২৪শে জুলাই, বঙ্গবন্ধু পল্টনের জনসভায় আইয়ুব সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ২৪শে সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধু লাহোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তারপর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় মোর্চ ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ গঠিত হলে তিনি এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পূর্ব-বাংলায় গণসংযোগের কাজে লিপ্ত হন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সোহরাওয়ার্দী অসুস' হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডন আসেন। তখন বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে পরামর্শের জন্য এখানে আসেন। তারপর সোহরাওয়ার্দী বৈরুতে দেহত্যাগ করেন (৫ই ডিসেম্বর)। ২৫শে জানুয়ারি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনে এক সভা ডেকে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান। এই সভায় দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস'া প্রবর্তনের দাবিসহ সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রস্তাব গৃহীত হয়। সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১১ই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন হয়। সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। দাঙ্গার পর, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ১৪ দিন পূর্বে, আইয়ুব বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় এবং পরে তাকে এক বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে র নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু ‘ছয়দফা’ প্রস্তাব পেশ করেন। ১লা মার্চ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। পরে তিনি ‘ছয়দফা’ পরিকল্পনার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূর্ব-বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন। এই সময় তাকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় কয়েকবার (বছরের প্রথম তিন মাসে আট বার) গ্রেফতার করা হয়। ৮ই মে, নারায়ণগঞ্জ পাটকলের শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। ৭ই জুন, বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে পূর্ব-বাংলায় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটের সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে পুলিশের গুলিতে শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। ৩রা জানুয়ারি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫-জন বাঙালি সেনা ও সি.এস.পি অফিসারদের বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ করে। ১৭ই জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হলেও পুনরায় জেল-গেটই গ্রেফতার করা হয়। তারপর ঢাকা সেনাসিবাসে আটকে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র অভিযুক্ত আসামিদের মুক্তির দাবিতে পূর্ব-বাংলায় বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯শে জুন, ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামিদের বিচার কার্য শুরু হয়। পরে তিনি মুক্তি লাভ করেন।
শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করার পর গ্যাভিন ইয়্যাং যান ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করতে। তার কাছে রহস্যাব্রত একমাত্র ভোটপ্রার্থী ভুট্টোকে মনে হয় তিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তি, তবে সৌজন্যপ্রিয় ও বর্ণিল। তার মধ্যে অভিজাত্যের প্রভাব প্রকট। তার অনুসারীরা হাস্যোজ্জ্বলভাবে দলীয় ক্যাপ ও পতাকা নিয়ে মিছিল করে, তবে তাদের কর্মকাণ্ড সিন্ধু-প্রদেশেই সীমিত। ভুট্টো তার দলের পক্ষে সমর্থন বৃদ্ধি করার চেষ্টায় অঙ্গীকার বদ্ধ। পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশে কিছু অনুসারী অর্জন করেন। তিনি চাষীদের মধ্যে ভূমি বণ্টন ও ভূস্বামীদের প্রাধান্য খর্ব করতে চান। পাকিস্তানে পুঁজিতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র পরস্পর বিপরিত অবস'ানে থাকায় ভুট্টোর পদক্ষেপ দ্বিধাগ্রস্তভাবে চাষীদের ঐক্যবদ্ধ করবে। প্রসঙ্গত, জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে লারকানার এক বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী সিন্ধি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা স্যার শাহ নেওয়াজ খান। শাহ নেওয়াজ খান বোম্বে সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৩০-এর দশকে বোম্বে প্রেসিডেন্সি থেকে সিন্ধুকে পৃথক করার আন্দোলনে জরিত ছিলেন। তিনি তার সন্তানকে উচ্চশিক্ষা প্রদান করার জন্য ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ভর্তি করেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভুট্টো অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ থেকে জুরিসপ্রুডেন্সে এম.এ. সম্মান লাভ করেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে লিংকনস-ইন থেকে আইন পাশ করেন। সাউথ-হ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে কিছুকাল কাটান। তারপর তিনি পাকিস্তানে আইন-ব্যবসার মাধ্যমে জনজীবনে অনুপ্রবেশ করেন। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুব সরকারের বাণিজ্য-বিষয়ক ও পরে কাশ্মির-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক নির্মাণ করে ভারতের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ওকালতি করেন। তিনি কট্টর অ্যামেরিকা-বিরোধী ছিলেন।
গ্যাভনি ইয়্যাং ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে দেখা করতে যান আধুনিক ও অসমাপ্ত রাজধানী ইসলামাবাদে। গ্যাভনি ইয়্যাং বলেন, ‘অতীতের ব্যর্থতা, বর্তমানের নিঃসঙ্গতা ও ভবিষ্যতের পরিত্যাজ্য প্রতীক আইয়ুব তার বাসার বাগানে বসে রোদ মাখতে মাখতে চা পান করছিলেন। ভুট্টোসহ তার বন্ধুরা ও শুভার্থীরা তাকে পরিত্যাগ করেছে।’ প্রসঙ্গত, আইয়ুব খান ১৪ই মে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশের হরিপুর জেলার রেহানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতিতে পাঠান। তার শিক্‌ষক্ষাজীবন শুরু হয় সারাই সালেহ স্কুলে, তারপর হরিপুরে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, কিন' লেখাপড়া শেষ না করেই রয়েল মিলিটারি একাডেমীতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চীপ হন। তারপর মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তিনি পাকিস্তানের প্রথম সামরিক-শাসক হন। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখেন ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে গণভোটের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানের ৯৫.৬-ভাগ ভোট পান। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন এফ কেনেডীর স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসার বাঁধনে বন্দি হন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুব খানের পতন ঘটে পূর্ব-বাংলার গণ-আন্দোলনের কারণে।
ভুট্টো এবং পাকিস্তানের বামপন'ী দলের জন্য ১৯৭০-এর নির্বাচনে ক্ষমতালাভের কোনো সম্ভাবনা নেই; কিন' পাশ্চাত্ত্য-বিরোধী মনোভাব এবং পিকিং-প্রীতি বামপন'ীদের জন্য পাকিস্তান উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়। অবশ্য নির্বাচন-পরবর্তী সময় বামপন'ী নেতাদের জন্য বিপদের সম্ভাবনা আশঙ্কা করা যায়, জাতীয় রাজনীতি থেকে তাদের অনেক দূর সরে পড়তে হবে। যদি ইয়াহিয়া খানের শক্তিশালী ব্রিগেড আবার ক্ষমতা দখল করে নেয় তাহলে মুজিব, ভুট্টো এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বহুলপ্রতিক্ষীত রাজনৈতিক স্বাধীনতা না-পেয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং গৃহযুদ্ধ বেছে নিতে বাধ্য হবেন।
৭ই ডিসেম্বর ১৯৭০। রাওয়ালাপণ্ডি, করাচি, পেশওয়ার ও পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে বিচ্ছিন্ন সংঘাতের কিছু ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রথম অবাধ নির্বাচনে একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পূর্ব-বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও গরিব মানুষের কোটিপতি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ইসলামিক সমাজতন্ত্রের ব্যানারে তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালিয়ে ও ভারতের সঙ্গে এক হাজার বছর যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়ে, পাঞ্জাব ও সিন্ধু অঞ্চলে আসন লাভ করেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলেও তিনি সমর্থন অর্জন করেন।
সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় পাকিস্তান সরকার যে-ব্যক্তিকে বিশ্বাসঘাতক বলে উল্লেখ করেছিল, সেই-ব্যক্তিই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম স'ান অধিকার করেন। শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে দিল্লির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স'াপন এবং পাকিস্তানকে সিয়োটা ও সেন্টো চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করবেন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ভারতবর্ষ বিভাজনের পর থেকেই কার্যত পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে পূর্ব-বাংলা বিবেচিত হয়ে আসে, কিন' এই প্রথমবার সরকার-গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। তারা অযোগ্য রাজনীতিবিদ ও হাকারী জেনারেলদের বিরুদ্ধে জবাব দেয়। অবশ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষের শক্তি হিসেবে দলটির জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হওয়ার প্রধান কারণ। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিকিংপন'ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না-করায় শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মাঠ শক্তিশালী হয়। অবশ্য পিকিংপন'ী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ঘূর্ণিঝড়-দূর্গত এলাকায় বাতিল হওয়া নির্বাচনের নয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
তবে আশা করা হয়েছিল যে, পশ্চিম-পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কিন' মিয়া মুমতাজ দৌলতানার এই দলটি ভরাডুবি যায়; ৫০টি আসনে প্রতিযোগিতা করলেও মাত্র ৭টিতে জয়লাভ করে। ডান-কট্টর-পন'ী দল জামায়াতে ইসলামির শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়, আর ধর্মীয়-বামদল হাজারভি জামায়াতে-উলামা পাঁচটি আসনে বিজয়ী হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য ২৩টি দলের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন, এদের মধ্যে আছেন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণ-আন্দোলনের নেতা ও বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এ্যায়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান। তিনি পিপলস পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাওয়ালাপণ্ডিতে পরাজিত হন। অন্যদিকে কিছু কিছু নেতা আবার নিজ-যোগ্যতায় স্ব-স্ব অঞ্চলে জয়ী হন; যেমন পাকিস্তান গণতন্ত্রী দলের নেতা নূরুল আমীন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মিয়া মুমতাজ দৌলতানা, আবদুল ওয়ালি খান প্রমূখ।

১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায় যে, মোট ৩১৩টি (মহিলা ১৩টি) আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি (পূর্ব-বাংলার ১৬৯টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটো আসনের একটিতে পাকিস্তান গণতন্ত্রী দলের নেতা নূরুল আমীন ও অন্যটিতে রাজা ত্রিদিব রায় নির্বাচিত হন), পাকিস্তান পিপলস পার্টি (ভুট্টো) ৮৮টি, মুসলিম লীগ (কাইয়ূম) ৯টি, মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) ৭টি, মুসলিম লীগ (কনভেনশ্যান) ২টি, ন্যাপ (ওয়ালি) ৭টি, জামায়াতে ইসলামি ৪টি, জামায়াতে-ওলেমা ৭টি, জামায়াতে-ওলেমা (থানভি) ৭টি, পিডিপি ১টি ও স্বতন্ত্র ৭টি আসন লাভ করে।
১৯৭০-এর পূর্ব-বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়―আওয়ামী লীগ (মুজিব) ২৯৮টি (১০টি মহিলা), পিডিপি ২টি, ন্যাপ (ওয়ালি) ১টি, জামায়াতে ইসলামি ১টি ও স্বতন্ত্র ৭টি আসনে জয়লাভ করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে। পশ্চিম-পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুপ্রদেশে ভুট্টোর দল, বেলুচিস্তানে ন্যাপ (ওয়ালি) এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে ন্যাপ (ওয়ালি) ও জামায়াতে-ওলেমা (থানভি) কোয়ালিশন সরকার গঠন করার মতো অবস'ান সৃষ্টি করতে পারেনি বলে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় পাকিস্তানের জনগণের মনে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল তা কিছুটা হলেও সি'তিশীল হয়, কিন' রাজনৈতিক জটিলতা বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানের নব নির্বাচিত সাংসদকে জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে, তবে নির্বাচনের ফলাফল ও সাংবিধানিক সংসদের চেহারা যেমন হয় এতে সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া বেশি দূর অগ্রসর হবে না। তবে রাজনৈতিক নেতারা যদি নিজের স্বার্থে নতুন সংবিধান প্রণয়নে সম্মত হন তাহলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। অবশ্য ভুট্টো ও মুজিব নির্বাচনের আগে সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে তাদের বিভক্তি ছিল অতি অল্প, উভয় নেতাই সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে আপোষ করতে আগ্রহী ছিলেন; কিন' নির্বাচন দুই-দল-ব্যবস'া প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, বরং এক-অংশের সঙ্গে অন্য-অংশের সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। তবে পূর্ব-বাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আদায়ের জন্য উপযুক্ত সংবিধানের জন্য লড়বেন। শেখ মুজিব অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও মুদ্রা-ব্যবস'া―এই বিষয়গুলোতে সীমাবদ্ধ রেখে ও অন্যসব ক্ষমতা প্রাদেশিক পরিষদের অধীনে ছেড়ে দিয়ে একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে চান। তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পূর্ব-বাংলার সুযোগ-সুবিধা সুনিশ্চিত করতে চান। এমনকি পাকিস্তানের শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সহজেই বাণিজ্য-সম্পর্ক স'াপন করতে চান। ভুট্টো অবশ্য ক্ষমতাশীল কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে। তিনি চান অর্থনৈতিক ও রাজস্বসংক্রান্ত বিষয়গুলো কেন্দ্রের অধীনে রাখতে। ভুট্টো পূর্ব-বাংলার অধিকার আদায়ের বিরুদ্ধে অবস'ান নেওয়ায় শেখ মুজিবের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো অসম্ভব হবে। এই দুই নেতা যে-দুই অংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন সেই দুই অংশের ভৌগলিক দূরত্বের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির তৎফাত অনেক বেশি।