চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সহিংসতা ও সঙ্কট

কালবেলা এর ছবি

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: সহিংসতা ও সঙ্কট

উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ:
    ৩রা জানুয়ারি ১৯৭১। রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যরা ‘ছয়দফা’র ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং জনগণের প্রতি আনুগত্য থাকার শপথ গ্রহণ করেন।
    ৫ই জানুয়ারি ১৯৭১। পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের সর্বাধিক আসন লাভকারী পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠনে তার সম্মতির কথা ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিষদের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টারি দলের নেতা নির্বাচিত হন।
    ২৮শে জানুয়ারি ১৯৭১। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন। তিনদিন বৈঠকের পর আলোচনা ব্যর্থ হয়।
    ৩০শে জানুয়ারি ১৯৭১। কাশ্মিরের দু’জন মুক্তিযোদ্ধা একটি ভারতের আভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী বিমানের গতি পরিবর্তন করে লাহোরে নিয়ে আসে। ২রা ফেব্রুয়ারি, লাহোরে বোমা দিয়ে বিমানটি ধ্বংস করা হয়। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ভুট্টোসহ পাকিস্তানের অনেক নেতা সমর্থন করলেও ভাসানা, মুজিবসহ অনেক পূর্ব-বাংলার নেতারা নিন্দা জ্ঞাপন করেন। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
    ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার আহ্বান জানান।
    ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। ভুট্টো ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ না-করার ঘোষণা দিয়ে দুই প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের প্রতি ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবি জানান।
    ১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। ভুট্টোর দাবির তীব্র সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ভুট্টো সাহেবের দাবি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছেই হস্তান্তর করতে হবে। ক্ষমতার মালিক এখন পূর্ব-বাংলার জনগণ।’
১৯৭০-এর বন্যায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অমনোযোগিতাই ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিমত প্রকাশ পায়। জাতীয় নির্বাচনে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হওয়ার পরও তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে রাখতে বদ্ধপরিকর এবং নির্বাচন-পরবর্তী আলোচনায় পূর্ব-বাংলার ন্যায্য দাবি মেনে নিতে রাজি নয়। এর কারণেই বাঙালির মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে যে-অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় এতে পাকিস্তানের দুই অংশ বিভক্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এই বিভক্তি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে টেকানোর জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তার সেনাবাহিনী দিয়ে, পূর্ব-বাংলা থেকে ১,২০০ মাইল দূরে অবস্থিত সেনা-ঘাঁটি থেকে, দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কারণ পূর্ব-বাংলা স্বাধীন হলে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের যে-যে অঞ্চলে অর্থনৈতিক অবস্থা অস্বচ্ছল সেসব স্থানে একইভাবে বিচ্ছিন্নবাদের আন্দোলন সৃষ্টি হতে কতক্ষণ। অন্যদিকে শেখ মুজিব জানেন যে,
‘বাংলাদেশ’ স্বাধীন হলে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
পূর্ব-বাংলার ঘটনাবলি ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিম-বাংলায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলায় মার্কবাদী নেতা জ্যোতি বসু তার নিজস্ব ‘ছয়দফা’র দাবি উত্থাপন করে দিল্লি থেকে পৃথক হওয়ার ঘোষণা করেন।
পূর্ব-বাংলা যখন সঙ্কটের মুখে তখন পশ্চিম-বাংলায় নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। দুই বাংলার মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি দিল্লিকে চিন্তিত করে। চিন্তিত করে পূর্ব-বাংলা ও পশ্চিম-বাংলার রাজনীতি নিয়েও। পূর্ব-বাংলার আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদে বিশ্বাসী; আর পূর্ব-বাংলার আওয়ামী মুসলিম লীগ (নিষিদ্ধ পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির বিকল্প ধারা) মাওবাদী সংগঠন; এর কর্মকা- ছাত্র, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকদের মধ্যে বিস্তৃত। পশ্চিম-বাংলার ‘কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (মার্কসবাদী) নির্বাচনে বিজয়ী হবেই। উভয় বাংলায় একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যই হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে একরকম হতাশা ও স্থবিরতা সৃষ্টি করা। মিসেস গান্ধী ভারতের আঞ্চলিকতাবাদ ও সমন্বয়হীনতার প্রবণতাকে পালটে দিতে কর্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া চীন বর্তমান উভয় বাংলার পরিস্থিতিতে নিজেদের সুবিধা লুটে নিতে ব্যস্ত, যদিও পূর্ব-বাংলার পরিস্থিতির দৃশ্যপট থেকে পিকিং দূরে অবস্থান নিতেই বাধ্য। পাকিস্তানের কোন অংশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে তাই মূল প্রশ্ন। বাঙালির ভাবভঙ্গি―‘কিছুই মেনে নিতে চাই না’ , বিশেষত সভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত ভারতের কাছ থেকে সাহায্য পেলে কাশ্মির-বিতর্ক থেকে নিজেকে প্রত্যহার করবে। আবার বিভক্ত পাকিস্তানের এক-অংশ কাশ্মির-বির্তক নিয়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য অভিন্নমত প্রকাশ করে এবং অন্য-অংশ পশ্চিম-বাংলার সঙ্গে পৃথক থাকার জন্য চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করার কথা বলে। ভারত ও ভারতবর্ষের সাগর অঞ্চলের জন্য, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতা বাংলা-সমস্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 
সমগ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে ‘জাহান্নামে যাও’ বলে বিদায় করতে বদ্ধপরিকর, কিন্তু তাকে যুক্ত পাকিস্তানের জন্য শেষ চেষ্টা চালাতে হবে।
পাকিস্তানের অবহেলিত উপনিবেশ বলে পরিচিত পূর্ব-বাংলাকে পাকিস্তানের সমরনায়কদের অধীন থেকে শোষণ-মুক্ত করতে স্বায়ত্তশাসনই একমাত্র উপায়। তাই তাকে নিখিল পাকিস্তানের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করতে পূর্ব-বাংলার জন্য স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা দিতে হবে।
স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধে মুজিব বলেন, ‘ভারতবর্ষ বিভাজনের আগে যখন ভারতবর্ষীয় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল তখনই পূর্ব-বাংলার জন্য স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে পূর্ব-বাংলাকে ‘প্রতারণা’ করা হয়।’  তিনি আরও বলেন, ‘মার্চ (১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ) মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে ‘স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ’-এর কথা বলা হয়।’ 
পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধানের রূপরেখা প্রণয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, সিন্ধি মুকুটহীন সম্রাট সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং নিখিল পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপর। ভুট্টো এবং মুজিব উভয়ই সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারে আপোষ-মীমাংসায় পৌঁছবেন বলে ১৩ কোটি পাকিস্তানির প্রত্যাশা, কারণ উভয় নেতাই জনগণকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন, তবে তারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নিয়ে পরস্পর বিপরীত অবস্থানে। মূলত উভয় নেতাই মনে করেন যে, নিজেদের অবস্থান থেকে সড়ে এলে তাদের নিজ নিজ জণগোষ্ঠীর প্রত্যাশা মতো সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। ১৩ কোটি পাকিস্তানির প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রাজস্বসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে উভয় নেতার ঐক্যমতে পৌঁছানো আবশ্যক, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় না প্রাদেশিক সরকারের অধীনে এসব থাকবে। এই দুই বিষয়ের সঙ্গে অবশ্য জড়িত ইন্দো-পাকিস্তান সম্পর্ক ও কাশ্মির প্রসঙ্গ, এখানেই তারা পরস্পর বিপরীত অবস্থানে আছেন। এছাড়াও উভয় নেতাই জানেন যে, রাজস্ব বা বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তারা যদি ছাড় দেন তবে তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
রাজস্ব-ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ ৩১০ হাজার বর্গমাইল এলাকার ৫৭ মিলিয়ন মানুষের পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে ৫০ ও ৬০ দশকে নাটকীয়ভাবে উন্নতি ঘটে আর ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গঠিত জলাবদ্ধ, পৃথিবীর পশ্চাদপদ ঘনবসতি, পূর্ব-বাংলা ৭৩ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। শুধু মাত্র পূর্ব-বাংলার উপর নির্ভর করে পাকিস্তানের উন্নয়ন ঘটে; আর কাশ্মির-প্রসঙ্গে ভারতের সঙ্গে সংঘাত ঘটিয়ে পাকিস্তানের অর্থ শুধু মাত্র পশ্চিমাংশে ব্যয় করা হয়। কাশ্মিরিরা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার থাকলেও পূর্ব-বাংলার অর্থ ব্যয় করার অধিকার তাদের নেই। পূর্ব-বাংলা থেকে আদায়কৃত রাজস্বের ৭০-ভাগ সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র ও মুদ্রাবিনিময়ে ব্যবহার করা শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়। একদিকে, কাশ্মির-প্রসঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে সংঘাতে নিয়োজিত থাকা ৩০০ হাজার সৈন্যের সেনাবাহিনীকে পোষার জন্য কেন পূর্ব-বাংলা থেকে সংগ্রহ করা রাজস্ব ব্যয় করা হবে―এই প্রশ্নটিই বাঙালির মনে জেগে ওঠে; আর অন্যদিকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর মন্তব্য যে, কাশ্মির-প্রসঙ্গে পূর্ব-বাংলা কখনই সংশ্লিষ্ট বোধ করেনি। কাশ্মিরে বিপুল পরিমাণের সেনা মোতায়েনে, পাকিস্তানের মোট বাজেটরে অর্ধেক, প্রতিরক্ষা বাজেটে শতকরা ৫০-ভাগ খরচ হয়। পাঞ্জাবিরা বলে, ‘আমরা পাঞ্জাবিরা কাশ্মির নিয়ে অনেক রক্ত দিয়েছি এবং ভুট্টো যদি কাশ্মির নিয়ে ভারতের কাছে কোনো ছাড় দেন তবে তাকে প্রাণ দিতে হবে।’  ভুট্টো অবশ্য বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার তার অর্থনৈতিক সমর্থনের জন্য প্রাদেশিক সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।’  পাঞ্জাবই ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের রাজস্ব-ফর্মুলার বিরোধিতা করে আসে। কারণ, পূর্ব-বাংলা যদি প্রতিরক্ষা-খাতে অবদান রাখতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে কাশ্মির-প্রসঙ্গে মুলতবি টানা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। ‘ছয়দফা’র রাজস্ব-ফর্মুলা কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ-তহবিলে অর্থ-যোগান দেবে না। ‘ছয়দফা’ প্রস্তাব অনুযায়ী ভবিষ্যতে, সৈন্যবল বৃদ্ধির খাতে, প্রত্যেক প্রদেশের অর্থ  নিজ-নিজ প্রদেশেই খরচ করার কথা। শেখ মুজিব অবশ্য ইয়াহিয়ার সঙ্গে একমত যে, প্রাদেশিক রাজস্বের আনুপাতিক হারে একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা-খাতে ব্যয় করা। একথা মেনে নিলে মুজিবকে পাঞ্জাবে বিপুল পরিমাণে সেনা মোতায়েন করতে হবে, এতে অবশ্য ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে বাধ্য। 
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ ভারতের সঙ্গে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধের পর থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাণিজ্য-সম্পর্ক পূর্ণস্থাপনে পূর্ব-বাংলা খুবই আগ্রহী। কারণ, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীন থেকে টনপ্রতি ১৭২ রুপি হারে পূর্ব-বাংলাকে কয়লা কিনতে হয়; একই পরিমাণের কয়লা যদি ভারত থেকে ক্রয় করা হত তাহলে ৫০ রুপি খরচ পড়ত। শেখ মুজিব জাতীয় পরিষদে অংশগ্রহণ করলে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে, সংবিধানকে পরিচালিত করতে সক্ষম হবেন। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রত্যাহার করতে পারেন না। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভুট্টো বাণিজ্য-প্রসঙ্গে আপোষ করতে চান না, বরং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ‘ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ততদিনই অস্বাভাবিক থাকবে যতদিন পর্যন্ত ভারত অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করার আগে কাশ্মির-বির্তকের সমাধান না করে।’  তিনি আরও বলেন, ‘ছয়দফা কাশ্মির-বিতর্ককে চিরকালের জন্য ভারতের পক্ষে নিয়ে যাবে।’  তিনি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য-সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হবেন যদি ভারত কাশ্মির-বিতর্কের সমাধান ‘পর্যায়ক্রমে’ করতে রাজী হয় এবং মুজিবুর রহমান কাশ্মির-বিতর্ককে একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করেন। তবে পাঞ্জাবিরা মনে করে, ‘কাশ্মির-বিতর্কের সমাধান না করেই ভারতের সঙ্গে পূর্ব-বাংলা বাণিজ্য-সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য যদি প্রদেশের অধীনে থাকে তাহলে ভুট্টোকে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের নীতিই মেনে নিতে হবে।’  অন্যদিকে ভারতের মানুষ পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়েই উগ্র মন্তব্য করে, তবে তারা পাকিস্তানকে দুটো পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে আগ্রহী। তারা এও বিশ্বাস করে যে, পূর্ব-বাংলা যদি স্বাধীন হয় তাহলে তার অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। বাস্তবে স্বাধীন পূর্ব-বাংলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ম্লান হবে। পূর্ব-বাংলার বৈদেশিক আয় পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের তুলনায় বেশি হলেও স্বাধীন হওয়ার পর আর এরকম থাকবে না। পূর্ব-বাংলার চাইতে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সার্থক শিল্পপায়ন ঘটানো হয়। ‘উপনিবেশিক শোষণের ক্ষেত্রে’ পূর্ব-বাংলার শিল্প প্রায় পুরোপুরি পাটের ওপর নির্ভরশীল, এর সঙ্গে পূর্ব-বাংলার জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নির্মম আকার ধারণ করবে। ১৯৭১-এর হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বর্গমাইলে ১,৩০০ জন মানুষ বসবাস করে। প্রতি বছর পূর্ব-বাংলার এক-তৃতীয়াংশ ভূ-ভাগ বন্যায় প্লাবিত হয়। অধিবাসীদের অন্যত্র বসতি স্থাপনেরও সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘এসব কারণেই পূর্ব-বাংলার পক্ষে এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সীমিত।’  তবে ভারত-সরকারের পর্যবেক্ষণ দলের অভিমত―‘যদি পাকিস্তানের নতুন জাতীয় পরিষদে মুজিব তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন তাহলে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকবে না।’ 
সংবিধান এককবিশিষ্ট, না দ্বিপক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রণয়ন করবে। ১৯৭১-এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পূর্ব-বাংলা জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সুবাদে পূর্ব-বাংলা জাতীয় সংসদে যে সুবিধা পাওয়ার কথা, এতে এককবিশিষ্ট সংসদ সংবিধান প্রণয়ন করতে সক্ষম। অন্যদিকে, যদি পূর্ব-বাংলার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ না করেন তাহলে পিপলস্ পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পক্ষে সংবিধান প্রণয়ন করা অসম্ভব। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে ভুট্টো ও শেখ মুজিবকে, পরস্পরের সমর্থনে ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অনুমোদনে, একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে; যদিও ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের কারণে উভয় নেতা সমঝোতায় পৌঁছে সংবিধান প্রণয়নের সম্ভাবনা অতি অল্প। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন-তারিখ ৩রা মার্চের মধ্যে ঘোষণা না করলে পাকিস্তানে ব্যাপক বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলন সৃষ্টি হবে।’  ভুট্টো ঢাকায় উপস্থিত না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে ভারত-বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তার অবস্থান সুসংহত করেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা অবশ্য বলেন, ‘ভুট্টো ও পিপলস্ পার্টি সহ বা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে অধিবেশন আহ্বান করতে হবে।’  জাতীয় পরিষদে সংবিধান গৃহীত না করার জন্য পাঞ্জাবির নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করে যুক্তি দেয় যে, অধিবেশন প্রত্যাহার করলে বাঙালি জনগোষ্ঠী সামরিক শক্তির কাছে নতজানু থাকবে। তবে প্রগতিশীল ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের মধ্যে একজন পূর্ব-বাংলার গভর্নর ভাইস এ্যাডমিরাল এস.এম. আহসান, তার পদত্যাগ প্রমাণ করে যে, প্রেসিডেন্টের অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত যুক্তিহীন। তার পদত্যাগ বাংলার পরিস্থিতির অবনতির সত্যতা প্রমাণ করে। এই পদত্যাগের কারণেই প্রেসিডেন্টকে অধিবেশনের একটি নতুন তারিখ ঘোষণা করতে হবে।
কট্টরপন্থী পাঞ্জাবি দ্বারা প্রভাবিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন-তারিখ ঘোষণা করেন তাহলে শেখ মুজিবুর রহমান নির্ধারিত তারিখে এতে অংশগ্রহণ করবেন। ভুট্টো সংসদে ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ হিসেবে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। সংবিধান প্রণয়নের কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী সামান্য কয়েকজন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের গণপ্রতিনিধি নিয়ে পূর্ব-বাংলার ইচ্ছানুসারে সংবিধান প্রণীত করতে পারবেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন-তারিখ ঘোষণা না করেন তাহলে পাকিস্তানে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হবে। ইয়াহিয়া খানের প্রশাসনের সামরিক পর্যবেক্ষরাই স্বীকার করেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠেকানো অসম্ভব এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পূর্ব-বাংলার ৭৫ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীকে শক্তির দাপটে দমিয়ে রাখা চিন্তাতীত।’  কারণ শক্তিপ্রয়োগ করলে যে সঙ্কট সৃষ্টি হবে তা হবে পাঞ্জাব প্রদেশের সঙ্গে পূর্ব-বাংলাসহ উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধুর।
অবশ্য শেখ মুজিব সকল প্রকার আপোষ প্রচেষ্টা বাতিল করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকে, পাঞ্জাবের সম্মতি ছাড়া সংবিধান প্রণয়ন করতে ইচ্ছুক ছোট ছোট প্রদেশের গণপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ও ভুট্টোকে বাদ দিয়ে, সংবিধান রচনা করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গৃহীত করিয়ে নিতে সক্ষম। যদি জাতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসন-সহ সংবিধান চূড়ান্তভাবে গৃহীত করতে সক্ষম। বাঙালির ইচ্ছানুযায়ী ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে যদি সংবিধান গৃহীত হয় তাহলে ভুট্টো, পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর কাছে তা অগ্রহণযোগ্য হবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়বেন। তিনি এমন কোনো সংবিধান অনুমোদন করতে রাজি হবেন না যা ভুট্টো, পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর কাছে অগ্রহণযোগ্য হবে। পাঞ্জাবের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা দুই দশক ধরে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা তাদের অধীনে রাখলে তাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাকিস্তানকে অখ- রাখতে হলে বাঙালির শাসনই মেনে নিতে হবে, কারণ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রায়ে জাতীয় পরিষদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়। প্রগতিশীল ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরাও মনে করেন, ‘বাঙালিকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রাপ্য ভাগ দিতে হবে।’ 
ভুট্টো সংবিধান প্রণয়নে অংশগ্রহণ করলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এমন কোনো সংবিধান অনুমোদন করবেন না যা প্রমাণিত হবে বাঙালি তাদের শক্তির বলে প্রণীত করেছে। ভুট্টোও এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। তিনি ‘পাকিস্তান রেডিও’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি মূলত সংবিধান প্রণয়ন করতে ঢাকায় যাব না, বরং যাব বাঙালির কাছ থেকে তাদের চূড়ান্ত ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবের স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধে আপোষ করতে।’  বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যদি কোনো সংবিধান অনুমোদন করতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ব্যর্থ হন তাহলে পূর্ব-বাংলার প্রতিক্রিয়া কী হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি দ্বারা প্রণীত কোনো সংবিধান পাকিস্তান প্রত্যাহার করলে তা হবে বে-আইনী। আর তখন শেখের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। এই ঘোষণার মাধ্যমে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ পুরোপুরি পূর্ব-বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। চিরতরে পাকিস্তান দ্বিখ-িত হয়ে পড়বে।
শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে তার অবস্থান অপরিবর্তন রাখার ইঙ্গিত দেন। তার দলের ও বামপন্থী দলগুলোর আভ্যন্তরে পাকিস্তান থেকে পূর্ব-বাংলাকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার দাবি তীব্রভাবে প্রকাশ করে। বাঙালির কাছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কেন্দ্রীয় শাসকের প্রতীক হিসেবে পরিণত হয়। তারা এই সেনাবাহিনীকে সমূলে তুলে ফেলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পাকিস্তানের এক তৃতীয়াংশ সেনাবাহিনীর ও পূর্ব-বাংলার পুরো পুলিশবাহিনীর সদস্যরা বাঙালি, তাই করাচির পক্ষে বেশি দিন পূর্ব-বাংলার উপর ক্ষমতা অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। ক্ষমতাবৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যতে যাই করা হোক না কেন, পাকিস্তান অবশ্যই ভেঙে যাবে। পাকিস্তানকে অখ- রাখার একটিই সম্ভাবনা, যদি শেখ মুজিবুর রহমান দুটো পৃথক আঞ্চলিক সংবিধান রচনা করার আহ্বান জানান এবং উভয় অংশই কেন্দ্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আঞ্চলিক স্বার্থ পরিত্যাগ করে শাসনপ্রণালী ও শাসনাঞ্চল নিয়ে আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা যায়। শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তানকে যদি অখ- দেশ হিসেবে রক্ষা করতে হয় তাহলে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছার উপর ভিত্তি করেই সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।’  শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের ‘ছয়দফা’ প্রস্তাবে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর পাঞ্জাবি সমরনায়করা বলে, ‘শেখ মুজিব যদি আপোষের জন্য অপ্রস্তুত থাকেন, তাহলে পাকিস্তান পূর্ব-বাংলার বাঙালিকে ছাড়াই এগিয়ে যাবে।’  সেনাবাহিনী বলে, ‘বাঙালি যদি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তাহলে সামরিক বাহিনীর আকার ছোট করে দেবে এবং ক্ষমতা হ্রাস করা হবে।’  কারণ, সেনাবাহিনীর হাতে এক যুগ ধরে দমন-পীড়নের শিকার বাঙালি জাতি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা যদি পূর্ব-বাংলার দাবি মেনে নিতে রাজি না হয় তাহলে পাকিস্তানের বৃহত্তর মতৈক্যের ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন করা অসম্ভবই বটে। উভয় অঞ্চলের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাই স্বাভাবিক।
নতুন কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে হয়তো-বা পাকিস্তানের সঙ্কটের সমাধান খোঁজা যায়, কিন্তু আওয়ামী লীগের এক কর্মী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নতুন কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, আমরা না-করার পক্ষেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আরেকটি নির্বাচনের অর্থ কী? এই নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব-বাংলার স্বাধীনতার জন্য বাঙালি গণরায় দিয়েছে। আমরা যদি আমাদের স্বায়ত্তশাসন পাই তাহলে শেখ সাহেব স্বাধীনতা নাও চাইতে পারেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট যদি সংবিধানে সাক্ষর না-করেন তাহলে শেখ সাহেব ফিরতি-বিমানে ঢাকায় এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন।’  বামপন্থী থেকে ডানপন্থী, কৃষক থেকে বুদ্ধিজীবী―সার্বজনীন মতামত এ-ই। এ-অবস্থায় দক্ষিণ-এশিয়ার স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেনাবাহিনীর কর্মকা-ের উপর। সেনাবাহিনীকে ১৯৭১-এর পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা ছাড়া অন্যকোনো উপায় নেই; যার অর্থ ৭৫ মিলিয়ন বাঙালিকে বন্দি করা। পাকিস্তান সহিংসতায় ও সঙ্কটে নিমজ্জিত। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’-রাষ্ট্রের দাবিকে এখন পর্যন্ত অবাস্তব বলে মনে করলেও পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধিতা করে বাঙালি যে সহিংসতা ও সঙ্কট অব্যাহত রাখবে তার পালটা জবাব দিতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব-বাংলার হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আঘাত আনবেই।’