একটি জাতিকে হত্যা -আব্দুর রউফ চৌধুরী

কালবেলা এর ছবি

প্রথম অধ্যায় - দুর্দশা ও দুর্যোগ

প্রথম পরিচ্ছেদ
বৈষম্য

আব্দুর রউফ চৌধুরী

১৯৭০-এর শরতে বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাসে ভোলা-হাতিয়া-সন্দ্বীপসহ পূর্ব-বাংলায় যে-বিপর্যয় ঘটে তার চেয়েও মৃত্যু ও দুর্গতির ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে ১৯৭১-এ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মানুষ যে মানুষের প্রতি কীরকম অমানসিক অত্যাচার চালাতে পারে তারই নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা পাঞ্জাব নিয়ন্ত্রিত সামরিকবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় নিরস্ত্র ৭৫ মিলিয়ন বাঙালির ওপর। বাঙালির চাহিদা মেটানোর প্রতি মনোযোগ না দিয়ে, তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে পূর্ব-বাংলাকে শক্তির বলে দাবিয়ে রাখার প্রচেষ্টা চলে। ইয়াহিয়া সরকার পরিচালিত সামরিক-বর্বরতা সর্বকালের বিশ্ব-দৃষ্টান্তকে ম্লান করে দেয়। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, পূর্ব-বাংলার সর্বস্তরের মানুষের জীবনে ভীতিসঞ্চার করে, পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, ইয়াহিয়ার এই আক্রমণ খুবই দুর্বল ও আত্মঘাতী। বিরামহীন-বিরতীহীন সুপরিকল্পিত হত্যাকা- ও আঘাত চালিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না, অসম্ভবই বটে।
জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করতেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা সুনির্দিষ্ট কলাকৌশলে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ চালায়। তারা বুঝতে পারে বাঙালি জাতীয় ও সামাজিক মুক্তির ভালো যোদ্ধা; অন্যদের চেয়ে অধিক প্রগতিশীল, স্বদেশী ও বিপ্লবী। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা ভুলে বসে যে, অন্ধ আবেগ দ্বারা চালিত না-হয়ে সাধারণ মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য; ‘জোর যার মুল্লুক তার’―এই নীতিতে রাষ্ট্র চলে না, এ হচ্ছে প্রাক-সামাজিক স্বার্থপর ও উচ্ছৃঙ্খল মানুষের নীতি। তারা ভুলে যায় যে, সমস্ত রাষ্ট্রকে সদ্ভাবে ও সৎপথে পরিচালনা করতে হলে যে শক্তির প্রয়োজন, তা কতটা শাসকের অধীনে, কতটা জনসাধারণের হাতে থাকা উচিত তা বিচার ও নির্ণয় করতে হয় দক্ষতার সঙ্গে। তারা ভুলে যায় যে, জনসাধারণই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উৎস এবং গণতন্ত্রই রাষ্ট্রপরিচালনার সুষ্ঠু বাহন; আর নির্বাচন দ্বারা দক্ষ ও উপযুক্ত রাষ্ট্রপরিচালক শাসনকার্যে নিয়োগ করাই গণতন্ত্রের কাজ। জনগণের মঙ্গল প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে, রাষ্ট্রের আর কোনো অতিরিক্ত ভূমিকা থাকার কথা নয়। তারা ভুলে যায় যে, জনসাধারণের উন্নতি ও অগ্রগতির ব্যাপারে সহায়তা করাই রাষ্ট্রীয় সংবিধানের লক্ষ্য। নৈতিকতাই রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি। নৈতিকবিধানকে অগ্রাহ্য বা অবমাননা করা হলে রাষ্ট্র নিষ্ফল হওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই। সামরিক বাহিনীর কাজই হচ্ছে দেশের প্রতিরক্ষার কাজে যতœবান হওয়া, রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব তাদের নয়। তাই বাঙালির কাছে প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা স্বৈরাচারী, অন্যায়, নিচ ও ভয়াবহ বলে। অন্যদিকে শাসক-সমরগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যই যেন বাঙালির উন্নতি ও মঙ্গলের পথ সঙ্কুচিত করে তাদের উপর প্রভুত্ব খাটানো; ফলে ঘৃণা, ক্রোধ ও শঠতায় রাষ্ট্রশক্তির অপচয় ঘটতে থাকে, এবং রাষ্ট্রকাঠামো খ-িত, অসংবদ্ধ ও এলোমেলো হতে থাকে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই আগস্টের মধ্যরাতে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে রক্তপাত, পারস্পরিক ঘৃণা ও ধর্মীয় ছলনাময়ী তথাকথিত ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’-এর ভিত্তিতে; সৃষ্টি হয় ‘পাকিস্তান’ ও ‘ভারত’ নামের দুটো রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের বিভাজনের কোলাহলের মধ্য-দিয়ে জন্ম নেওয়া, অযোগ্য রাজনীতিবিদ ও অপরিণামদর্শী সমরনায়কদের নেতৃত্বে খুঁড়িয়ে চলা, জিন্নাহের সৃষ্টি, অস্বাভাবিক ও মৃতপ্রায় রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান বিশ্ববাসীর কাছে আত্মপ্রকাশ করে।
ভারতবর্ষের বিভাজনে বাংলা ভূখ-টি বিভক্ত হয়ে পড়ে পূর্ব ও পশ্চিম অংশে। পূর্ব-বাংলায় থেকে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম-বিভাগ, রাজশাহী-বিভাগের রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলা, প্রেসিডেন্সি-বিভাগের খুলনা জেলা, চারটি থানা ছাড়া সিলেট; আর নদীয়া, যশোর, পশ্চিম-দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও মালদা অঞ্চলকে অঙ্গচ্ছেদ করা হয়। বাঙালি অনেক সম্ভব-অসম্ভবের বুক-বাঁধা আশা নিয়ে, জিন্নাহর উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম উৎপীরণের মিথ্যা অভিযোগ মেনে নিয়ে অস্বাভাবিক ও ‘ধর্মভিত্তিক’ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়। ৪ কোটি ২০ লক্ষ বাঙালি ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল এলাকা পেলেও হারায় তার জন্মভূমির বিশাল অঞ্চল―মিহালয় থেকে বঙ্গোপসাগরের আধিপত্যতা, এবং বিচিত্র্য বৈচিত্র মাটি ঘেঁষা সংস্কৃতি ও গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-বরাকের ঐতিহ্য। এমনকি পাকিস্তান নামটিও পূর্ব-বাংলাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টি করা হয়। ‘প’ অর্থ পাঞ্জাব, ‘আ’ অর্থ আফগান, ‘ক’ অর্থ কাশ্মির এবং ‘স’ অর্থ সিন্ধু, ‘স্তান’ অর্থ বেলুচিস্তান। যে পূর্ব-বাংলাকে লর্ড কার্জনের বিখ্যাত বঙ্গভঙ্গের সময়ে আন্দোলন করে একত্রিত করা হয় তাকেই দেশবিভাগের সময় ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়। অগণিত মানুষের আবাসভূমিও বদলে যায়। মানুষ হয়―এক কোটি গৃহহারা, পঞ্চশ লক্ষ নিহিত, বাইশ হাজার ধর্ষিত, দুই লক্ষ কুড়ি হাজার নিখোঁজ। একটি রাষ্ট্র ও একটি পতাকার প্রতি সার্বভৌমত্বের আনুগত্য প্রকাশে পূর্ব-বাংলার মানুষ প্রথম থেকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। স্বপ্ন দেখতে থাকে একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রের―যেখানে কৃষি ও কুটিরশিল্পের পুনর্বিকাশ ঘটবে, সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রচালিত দেশটি শিল্পায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে যোগ্য মানুষ হিসেবে। কিন্তু সৃষ্টিলগ্ন থেকেই অস্বাভাবিক ও ‘ধর্মভিত্তিক’ পাকিস্তানের―পশ্চিম ও পূর্ব দুটো ভূখ-ের সমন্বয়ে ১,২০০ মাইল ভারত ভূখ- দ্বারা ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত ও ইসলামি ঐক্যে সংযুক্ত রাষ্ট্রের―পূর্ব ও পশ্চিম অংশের র্স্পশকাতর সম্পর্কে উন্নতির চেয়ে অবনতিই বেশি ঘটে।
পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাংলার ভূপ্রকৃতিগত অমিলও অনেক। বাংলার ভূপ্রকৃতিতে নদীর গুরুত্ব সুস্পষ্ট, এমনকি বাঙালির মনমেজাজ, চিন্তাচেতনার আকৃতি-প্রকৃতি নির্ণয় করে বাংলার নদীগুলো। বাঙালি নদী ছাড়া যেমন বাঁচার চিন্তা করতে পারে না তেমনি পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ নদী ছাড়াই জীবন চালায়। গঙ্গা-পদ্মা-ভাগীরথী, মেঘনা-যমুনা-মহানন্দা, সুরমা-বরাক-কুশিয়ারা, ব্রহ্মপুত্র-ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা, অজয়-দামোদর-কাঁসাই, সরস্বতী-দ্বারকেশ-রূপনারায়ণ, তিস্তা-তিতাস-খোয়াই, করতোয়া-পূর্ণভবা-কুর্ণফুলী, মনু-গড়াই-মধুমতী ইত্যাদি নদীর স্রোতধারাই বাঙালিকে দিয়েছে নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তা, নিজস্ব ঐতিহাসিক সত্তা, যা অবাঙালি জনগোষ্ঠী কোনোদিনই বুঝতে পারে না, বোঝা তাদের জন্য সম্ভবও নয়। 
বাঙালিরা নিখিল পাকিস্তানের ১২ কোটি জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের চেয়েও বেশি, কিন্তু তারা বাস করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ছয়-ভাগের এক-ভাগে। পূর্ব-বাংলা সমৃদ্ধ কিন্তু অরক্ষিত ভূমি। ১৯৭০-এর বন্যাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ১২ই নভেম্বর ১৯৭০-এর ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্ব¡াসে―চর কুকুরি-মুকুরি, চর পাতিলা, চর কলমি, চর মানকা, চর শশীভূষণ, চর আইচা, চর নীলকমল, চর মায়া, চর মঙ্গল, চর ভাসাণ, চর স্টিফেন্স, চর জাহাজমারা, চর কাজল, চর ফেশান, চর মাদ্রাজ, চর লর্ডহার্ডিঞ্জ, চর তজুমুদ্দীন, চর চাচরা, চর চৌকিঘাট, চর দৌলতখানা, চার চান্দপুর, মলনাচর, চর সোনাপুর, চর বদরপুর, ধলী গৌড়নগর, চর জামালপুর, চর ভূতা, চর কচ্ছপিয়া, চর মনপুরা, চর পটুয়া, চর লালমোহন, চর জাঙ্গালিয়া, চর জিন্নাহগড়, চর নাজিরপুর, চর উমেদ, চর হাজারিগঞ্জ, চর ওসমানগঞ্জ, চর বিজয়পুর, চর পেয়ারপুর, চর আমিনাবাদ, চর ফকির প্রভৃতি এলাকায়―১০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্টেলিয়া প্রভৃতি দেশ সাহায্যের হাত প্রসারিত করলেও পাকিস্তান সরকার দুর্গতদের সাহায্য ও উদ্ধারের কাজে ক্ষমাহীন ঔদাসীন্যের পরিচয় দেয়। ভাসানীই প্রথম বিশ্ববাসীর কাছে ত্রাণের জন্য আবেদন জানান; আর বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচারণা বাতিল করে দুর্গত এলাকায় এসে উপস্থিত হন এবং আর্থ-মানবতার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের ঔদাসীন্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
এই দ্বিধাবিভক্ত, অস্বাভাবিক ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের দুই অঞ্চলের মধ্যে ঐতিহ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ভাষাতেও হাজার মাইলের দূরত্ব ও ব্যবধান।
পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্য-সভ্যতার অমিলের কারণ―বাঙালির ঐতিহ্য-সভ্যতার অংশ হচ্ছে পা-ুরাজার ঢিবি, তমলুক, চন্দ্রকেতুগড়, জগজ্জীবনপুর, রাজবাড়ি-ডাঙ্গা, বাণগড়, গঙ্গারিঢি, পু-্রবর্ধন, মহাস্থান, পাহাড়পুর, নোয়াপাড়া-ঈশানচন্দ্রনগর, ময়নামতী, লালমাই, মঙ্গলকোট, বরকান্তা প্রভৃতি। অঙ্গ-বঙ্গ-মগধ-কলিঙ্গ-সুহ্ম-রাঢ়-পৌ-্র-সমতট-হরিকেলের জনগোষ্ঠী দ্বারা বৃহৎ বাংলাঞ্চলে বা পূর্ব-ভারতবর্ষে একটি সুসংহত ও ঋদ্ধ রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থা, ঐতিহ্য-সভ্যতা গড়ে ওঠে। বলি, নন্দ, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন বাঙালিরই গৌরব, তাদের ধমনীতে প্রবাহিত হয় বাঙালির আদি রক্তই। বাঙালির প্রথম নির্বাচিত রাজা ‘গোপাল’ দেবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলার বা প্রাচ্যের মাটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক চিন্তার বীজ। বঙ্গ-গৌড়ের প্রথম স্বাধীন সম্রাট শশাঙ্ক, তিনিই স্বাধীন বাঙালির শক্তির পরিচয়। হাজার হাজার বছর ধরে বাঙালির দেহমনে প্রবাহিত হতে থাকে যাত্রা, কবিগান, লোকগাথা, লোকগীতি, পল্লীগীতি, সাঁওতালি-মনিপুরী নৃত্য, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, মসলিনশিল্প, শঙ্খশিল্প, বেতশিল্প, পটশিল্প, রেশমশিল্প, বস্ত্রশিল্প, দারুশিল্প, নৌকাদৌড়-নবান্ন-বৈশাখি-পৌষসংক্রান্তির উৎসব প্রভৃতি। এসব পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্য-সভ্যতার বহির্ভূত অংশ।
অস্বাভাবিক ও ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সংস্কৃতি-কৃষ্টির দিক থেকে দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার কারণ―পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীদের পাঞ্জাব-সিন্ধু-বেলুচিস্তান-সীমান্তপ্রদেশের জাতিসত্তা, গোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য, জীবনপ্রণালী, ধ্যানধারণা, আচারাচরণ, ভাষা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্বাধীন থাকা সত্ত্বেও চৌদ্দ-আনাই এক, অন্যদিকে পূর্ব-বাংলার সঙ্গে পনেরো-আনাই ভিন্ন, এক-আনা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের সূত্রে বাঁধা। পশ্চিমাঞ্চলের সাহিত্য বাঙালি-হৃদয়ে কখনই ছাপ ফেলতে পারেনি, কারণ বাঙালির নিজস্ব সাহিত্য-ধারা হাজার হাজার বছর পুরনো, যা একান্তভাবেই বাঙালির। গবেষণার সন্ধানে পাওয়া যাবে যে, বাংলা-সাহিত্যের পথযাত্রা সেই পা-ুরাজার ঢিবির সময় থেকেই শুরু। এছাড়া চর্যাপদ তো আছেই। কবি জয়দেব সুললিত সংস্কৃত ভাষায় কৃষ্ণলীলা বর্ণনা করে ‘গীতগোবিন্দ’ রচনা করলেও তা শ্রুতি ও শব্দ ব্যবহারে বাংলারই ইঙ্গিত বহন করে; এছাড়াও বাংলা-সাহিত্যের গভীরতা উপলব্ধির জন্য তো আছে বৈষ্ণব-বাউল-বৌদ্ধ-শৈব-শান্ত-সুফী সাহিত্য। মীননাথ, কানপা, তিলপা, শীলভদ্র, দীপঙ্কর, জীমূতবাহন, রাঘুনাথ, রঘুনন্দন, রামনাথ, চৈতন্যদেব, সৈয়দ সুলতান, আলাউল, চ-ীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, কৃত্তিবাস, কাশীদাস, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখের নির্মিত বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্য হয়ে ওঠে বাঙালির গৌরব-মিনার। দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে, বাংলার শক্তিশালী সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সাহিত্যের জন্যেই, নিখিল পাকিস্তানের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ও সাহিত্যে একত্ববোধ কোনোদিন হওয়া সম্ভব নয়; পাকিস্তানের আপন বিশেষত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে, জনগণকে একসূত্রে বাঁধার জন্যে যে জাতীয় গাঁথা ও প্রতীকের একান্ত প্রয়োজন তা দুই অঞ্চলে মিলিতভাবে ছিল না, তা থাকা অসম্ভবই বটে।
বাঙালির জীবন অসহনীয় করে তুলে পাকিস্তানের, বিশেষ করে পশ্চিমাংশের, শাসক ও সমরনায়ক দ্বারা পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের কতগুলো নীতিরীতি, বিশেষ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ-পদ্ধতি।
পাকিস্তানের প্রভুত্বে পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছাকৃত এবং ষড়যন্ত্রমূলক রাজনৈতিক কার্যক্রমগুলো হচ্ছে―উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র, বাংলার সংস্কৃতিকে গলা টিপে মারার দুরভিসন্ধি, শিল্পোন্নয়নে পূর্ব-বাংলার প্রতি বিমাতাসুলভ মনোভাব, কেন্দ্রীয় চাকুরির ক্ষেত্রে পূর্ব-বাংলার অধিবাসীদের উপেক্ষা করা প্রভৃতি। বাঙালির অসন্তোষ যাতে বাঁধ-ভাঙা জলের মতো বেরিয়ে আসতে না পারে সেজন্য পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শাসনযন্ত্রের ঢাকনাটি শক্ত করে স্ক্রুবন্ধ করে দেয়, এরকম অবস্থা চলতে থাকে বছরের পর বছর; তাই তারা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা পরিত্যাগ করে ঝুঁকে পড়ে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের দিকে, ফলে বাঙালির জীবন সর্বক্ষেত্রে উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত হতে বাধ্য করে; তবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থবাদী প্রবণতা পূর্ব-বাংলার জনগণের চোখ খুলে দিতে সাহায্যে করে, তারা বুঝতে পারে, পাকিস্তানের সংহতি ও ধর্মীয় বন্ধন শুধুই গালভরা বুলি ছাড়া অন্যকিছুই নয়, তাই তো শক্তশালী কেন্দ্রীয় শাসকের বিরুদ্ধে বিরূপ হয়ে ওঠে বাংলার মানুষ।
পূর্ব-বাংলার বাঙালির পক্ষে সোহরাওয়ার্দী পূর্ব-বাংলার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশা করাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবে লিয়াকত আলী খানের যোগসাজসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি, হন নাজিমুদ্দীন। সীমিত সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৫৪-এর পূর্ব-বাংলার নির্বাচনে জয়ী যুক্তফ্রন্টও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়কদের যোগসাজসে নৈরাশ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। প্রসঙ্গত, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের জন্ম বাংলায় হলেও বাঙালির উদারতায় দুটোই হাতছাড়া হয়ে যায়, এবং এগুলোর নেতৃত্ব পায় অবাঙালিরাই। এই দুটো দলের বিরোধিতার কারণে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুর যুক্ত, স্বাধীন ও সর্বাভৌম ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবরূপ নিতে পারেনি; এরসঙ্গে যুক্ত হয় ফজলুল হকের ‘সুবিধাবাদী-নীতি’, যা বাঙালি রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে ‘আদর্শভ্রষ্ট’ করে। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বাঙালির সুষ্পষ্ট অভিমত প্রকাশ পায় ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত প্রাদেশিত সাধারণ নির্বাচনে। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচন ছিল ভিন্ন ধরনের, নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। ৩১০-সদস্য বিশিষ্ট পরিষদে ২৩৭টি মুসলিম আসনে যুক্তফ্রন্ট মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, গণতন্ত্রী দল এবং খেলাফতে রব্বানী পার্টির সমন্বয়ে। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত নেতারা ছিলেন―মওলানী ভাসানী, ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী। ২১-দফার মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে অংশ নেয়, ২১-দফার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল―বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারী ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ত উচ্ছেদ ও রহিত করে ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বণ্টন করা, খাল খনন ও সেচের ব্যবস্থা করে দেশকে বন্যা ও দুর্ভিক্ষের কবল থেকে রক্ষা করা, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাপ্রবর্তন ও শিক্ষকের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার প্রর্বতন করা, ‘ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’-এ আইনসহ সকল কালাকানুন বিলোপ করা, প্রশাসনিক ব্যয় সর্বাবিক ভাবে কমানো, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’কে প্রথমে একটি ছাত্রাবাসে এবং পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রূপে গঠন করা, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ ও সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা, ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যারা শহীদ হন তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান করা, সকল নিরাপত্তা ও নিরোধমূলক আইন বাতিল করা ও বিনা বিচারে আটক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া, এবং সর্বোপরি লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আদায় করা; এবং প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রের অধীনে রেখে অন্যান্য সকল বিষয় ইউনিট সরকারের অধীনে আনা এবং সেনাবাহিনীর সদরদফতর পশ্চিম-পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর সদরদফতর পূর্ব-বাংলায় স্থাপনের ব্যবস্থা করা, আনসার বাহিনীকে একটি পূর্ণাঙ্গ মিলিসিয়াতে রূপান্তরিত করা এবং পূর্ব-বাংলায় অস্ত্রনিমার্ণ করার কারখানা প্রতিষ্ঠা করা; প্রভৃতি। ২১-দফা বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ এই ইশতেহার জনগণের দাবিদাওয়া ও আবেগানুভূতির দিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখে সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে মুসলিম লীগ কোনোরকম নির্বাচনী ওয়াদা ছাড়াই নির্বাচনে নামে, তাই ৩১০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৯টিতে মুসলিম লীগ, ২২৩টিতে যুক্তফ্রন্ট, ৫টিতে অন্যান্য দল আর ৭৩টি ঐক্যফ্রন্ট জয়লাভ করে। ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয় সংখ্যালঘুর জন্য সংরক্ষিত আসনের জন্য পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস, তফসিলী ফেডারেশন ইত্যাদি দলের সমন্বয়ে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেসামরিক কোয়ালিশন সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক গোপন বৈঠকে বসে যখন সমঝোতা গড়ে তুলতে সক্ষম হন তখন (২৮শে নভেম্বর ১৯৬৯) এক বেতার ভাষণে ১৯৭০-এর ৫ই অক্টোবর সর্বজনীন এবং প্রত্যক্ষ ভোটে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আইন-পরিষদ গঠন করার ঘোষণা দেন। ৩০শে মার্চ ১৯৭০, ইয়াহিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ‘দি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক ওডার অফ ১৯৭০’, এতে বলা হয় যে, জাতীয় পরিষদের মোট সদস্য-সংখ্যা হবে ৩১৩ জন (১৩ জন মহিলা); পশ্চিম-পাকিস্তানের ‘একক যুক্তাংশ’ কাঠামো ভেঙে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ১৪৪টি আসন নির্ধারণ করা হবে। পাঞ্জাব ৮৫টি (৩টি মহিলা), সিন্ধু ২৮টি (১টি মহিলা), উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ ১৯টি (১টি মহিলা), বালুচিস্তান ৫টি (১টি মহিলা) ও পার্বত্যাঞ্চল ৭টি; আর পূর্ব-বাংলার জন্য ১৬৯টি (৭টি মহিলা) আসন নির্ধারণ করা হবে। ‘আইনগত কাঠামো আদেশ ১৯৭০’-এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ভাসানী বলেন, ‘পাকিস্তানের ভবিষৎ শাসনতন্ত্র অবশ্যই ইসলামি আদর্শ ভিত্তিক হবে এবং তাতে পাকিস্তানের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখ-তা ও জাতীয় সংহতির বিধান থাকবে এবং পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত হবে। ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ব্যবস্থা সংবলিত বিধান থাকবে। শাসনতন্ত্র অনুসারে পাকিস্তানে ফেডারেল পদ্ধতির সরকার, এবং ফেডারেল সরকার ও প্রদেশসমূহের মধ্যে আইন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা বণ্টন করা হবে এবং প্রদেশসমূহ সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন এবং আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতা লাভ করবে।’  পূর্ব-বাংলার বন্যার কারণে অক্টোবরের নির্ধারিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাই সরকার ৭ই ডিসেম্বর (১৯৭০) জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ই ডিসেম্বর (১৯৭০) প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের নতুন তারিখ ধার্য করে।
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের শোষণপোষণ বন্ধ হওয়ার ফলে জনগণের আর্থিক অবস্থা বলিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে এর ফল হয় উলটো। যে-পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ মরুভূমি আর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিল্পক্ষেত্রে পশ্চাদপদ ছিল সে-পাকিস্তান ক্রমাগত ফুলেফেঁপে, ঐশ্বর্য্যে আর বৈভবে ভরে ওঠে; এর পাশাপাশি অগ্রসর পূর্ব-বাংলা ক্রমাগত অর্থনৈতিক দিক থেকে অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত হতে থাকে। এরকম অর্থনৈতিক শীর্ণতা ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয় বাঙালির অন্তরে, ফলে পূর্ব-বাংলায় অসন্তোষ এবং নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়।
১৯৫২-১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয় পূর্ব-বাংলায়, কিন্তু পশ্চিম-পাকিস্তানে তা দেখা দেয়নি, বরং ১৯৪৮-১৯৫৩ সময়সীমায় পশ্চিম-পাকিস্তানের কাছে পূর্ব-বাংলা দ্রব্য আমদানীখাতে ৯০ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা ঋণ করে।  পশ্চিম-পাকিস্তান ১৯৫৩-৫৪ (নয় মাস) সময়সীমায় পূর্ব-বাংলার উপর থেকে বাণিজ্যখাতে ১৬ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা আদায় করে। নিখিল পাকিস্তানে নানারকম প্রকল্পের জন্য নানাসময়ে যে ব্যয়ধার্য করা হয় তা থেকেও স্পষ্টই দেখা যায় দুই অঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান আর্থিক ব্যবধান কী পরিমাণের ছিল। পূর্ব-বাংলা থেকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা মোট রাজস্বের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে কম, উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম, সর্বপণ্যের এক-চতুর্থাংশ এবং বৈদেশিক সাহায্যের এক-পঞ্চমাংশ পেয়ে থাকে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় পুরোটাই আসে পূর্ব-বাংলার পাট থেকে। অবশ্যই এক অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চল সাধারণত দেয় অল্প তাই পায়ও কম, কিন্তু পূর্ব-বাংলার ক্ষেত্রে তা উলটো। পূর্ব-বাংলার দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়া, যেমন চালের দাম পশ্চিমাংশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ, চাকরির ক্ষেত্রে পূর্ব-বাংলার দখলে মাত্র ১৫-ভাগ এবং সেনাবাহিনীতে ১০-ভাগ।  আরও উদাহরণ উল্লেখ করা যায়―
১.    ১৯৪৮-১৯৫০ পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য ৮৮ কোটি রুপি ও পূর্ব-বাংলার জন্য ২৫ কোটি রুপি।
২.    ১৯৫০-৫৫ পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য ১,১২৯ ও পূর্ব-বাংলার জন্য ৫২৪ কোটি রুপি।
৩.    ১৯৫৫-৬০ পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য ১,৬৫৫ ও পূর্ব-বাংলার জন্য ৫২৪ কোটি রুপি। 
৪.    ১৯৬০-৬৫ পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য ৩,৩৫৫ ও পূর্ব-বাংলার জন্য ১,৪০৪ কোটি রুপি।
৫.    ১৯৬৫-৭০ পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য ৫,১৯৫ ও পূর্ব-বাংলার জন্য ২,১৪১ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়।
উন্নয়নপ্রকল্পের ক্ষেত্রে আইয়ুব শাসনামলের ব্যয়ধার্য করার চিত্রটি হচ্ছে―
১.    বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা: পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয় ৮০% এবং পূর্ব-বাংলার জন্য ২০%।
২.    মার্কিন সাহায্য: পশ্চিম-পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৬৬% ও পূর্ব-বাংলায় ৩৪%।
৩.    শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশন: পশ্চিম-পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৫৮% ও পূর্ব-বাংলায় ৪২%।
৪.    শিল্প ঋণ ও বিনিয়োগ: পশ্চিম-পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৮০% ও পূর্ব-বাংলায় ২০%।
৫.    শিল্পোন্নয়ন ব্যাংক: পশ্চিম-পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হয় ৭৬% ও পূর্ব-বাংলায় ২৪%।

৬.    গৃহ-নির্মাণ: পশ্চিম-পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৮৮% ও পূর্ব-বাংলায় ১২%।
৭.    কৃষি বিকাশের ক্ষেত্রে পশ্চিম-পাকিস্তানে বরাদ্দ করা হয় ২২ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা (সিন্ধুপ্রদেশ ৬০ লক্ষ, সীমান্ত প্রদেশ ৪ কোটি ৫২ লক্ষ, বালুচিস্তান শূন্য ও বাদবাকি পাঞ্জাবের জন্য) আর পূর্ব-বাংলার ভাগে পড়ে ১৯.৪ শতাংশ।
১৯৫০, ১৯৫১ ও ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোরিয়ার যুদ্ধের ফলে পাটের দাম বেড়ে যায়। পাট ও চা রপ্তানীর মাধ্যমে পূর্ব-বাংলা যা উপার্জন করে তা ছিল নিখিল পাকিস্তানের বাজেটের চাহিদা ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শতকরা ৭৫ভাগ। পাটশিল্পের ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে পূর্ব-বাংলার স্থান ছিল সবার উপরে। পূর্ব-বাংলায় সুতীবস্ত্র প্রচুর পরিমানে উৎপন্ন হয়। বস্ত্রশিল্পের গুণ, বৈচিত্র ও মূল্যের বিচারে পূর্ব-বাংলার সঙ্গে পশ্চিম-পাকিস্তানের কোনো তুলনাই ছিল না। অতএব পাকিস্তানের পক্ষে পূর্ব-বাংলার ওপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করাই হয়ে ওঠে একান্ত বাঞ্ছনীয়। পূর্বাঞ্চলের জনসংখ্যা যদিও বেশি তবুও সামরিক ও বেসামরিক খাতে পাঁচভাগের চারভাগই ব্যয় করা হয় পশ্চিমাঞ্চলে। আমলাতান্ত্রিক উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবি। প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলিতে আতাউর রহমান বলেন, ‘[...] মুসলিম লীগের নেতারা মনে করেন আমরা হলাম বিজিত এবং তারা হলেন বিজয়ী জাতি।’  চাকরি ও নিয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্যতার চিত্র পাওয়া যায়―
১.    কেন্দ্রীয় বেসামরিক চাকরির ক্ষেত্রে ৮৪% পাকিস্তানি ও ১৬% বাঙালি।
২.    বৈদেশিক চাকরির ক্ষেত্রে ৮৫% পাকিস্তানি ও ১৫% বাঙালি।
৩.    সশস্ত্র-বাহিনীতে ৫ লক্ষ পাকিস্তানি ও ২০ হাজার বাঙালি।
৪.    স্থলবাহিনীতে ৯৫% পাকিস্তানি ও ৫% বাঙালি।
৫.    বিমান বাহিনীতে ৯১% পাকিস্তানি ও ৯% বাঙালি।
৬.    নৌবাহিনীর কারিগরি চাকরির ক্ষেত্রে ৯১% পাকিস্তানি ও ৫% বাঙালি প্রভৃতি।
পাকিস্তানের সংক্ষপ্তি ইতিহাসে ১৯৭১-এ দেশটি সবচাইতে বিপজ্জনক ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক বৈরিতা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও জাতীয় অসন্তোষ থেকেই ১৯৭১-এর সঙ্কট সৃষ্টি হয়। শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জনতা। পাকিস্তানের শোষণ ও দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্তির দুর্নিবার আকুলতা নিয়ে পূর্ব-বাংলার শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী-ছাত্র-পুলিশ-ইপিআর-সৈনিক-শিক্ষিত-গর্বিত মানুষ জীবন বাজি রেখে বুকের রক্তে স্বদেশের মাটি রঞ্জিত করতে মুক্তি-সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ১৯৭১-এর সঙ্কট সম্বন্ধে জেড.এইচ. জাইদি বলেন―
দেশভাগের পর থেকে ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৭ থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাঙালির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইলে এর প্রতিরোধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নতুন শক্তি ও গতির সৃষ্টি হয়। শেষপর্যন্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসন দিতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাধ্য হয়। অবশ্য তা সহজে আসেনি, অর্জিত হয়েছে রক্তপাত-আত্মত্যাগ-আত্মদানের মাধ্যমে। বাংলা ভাষার অধিকার স্লথগতিতে আদায় করলেও বাঙালির ক্ষোভ তাদের অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পারেনি। রাষ্ট্রভাষা-বিতর্কের জের ধরে বাঙালির মধ্যে দ্রুতগতিতে ক্ষোভ প্রকাশিত হতে থাকে।
বাঙালিরা বুঝতে পারে, অতীতে তারা মাড়োয়াড়ি জোঁয়াল কাঁধে নিয়ে জীবনযাপন করছিল, আর ১৯৪৭-এর পর থেকে পাঞ্জাবির। ভারতবর্ষ-বিভাগের সময় অবিভক্ত দেশে বেসামরিক প্রশাসনে একজন মাত্র পূর্ব-বাংলার মুসলমান কর্মকর্তা ছিলেন।
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনে কোটা-ভিত্তিক পদ্ধতিতে পূর্ব-বাংলা থেকে মাত্র তিনজন যুগ্মসচিব, দশজন উপসচিব এবং ৩৮-জন নি¤œপদের সচিব নেওয়া হয়; অন্যদিকে পাকিস্তানিদের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৮-জন, ১২৩-জন ও ৫১০-জন।
ভারতবর্ষ-বিভাগের পূর্বে সামরিক বাহিনীতে পাঞ্জাবি ও পাঠানদের প্রাধান্য ছিল, বিভাগ-পরবর্তী সময়ে তাদের প্রাধান্য আরও বেড়ে যায়। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে এই পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটলেও বৈষম্য ঠিকই থেকে যায়। বেসামরিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পাঞ্জাবের (পাকিস্তানের অংশ) তিনটি শহর।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু, বেলুচিস্তান, সীমান্ত-প্রদেশ ও পাঞ্জাব মিলে একক যুক্তাংশ সৃষ্টি করার পর, ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে, আইয়ুব খানের একক সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত করা হয়; আর পাঞ্জাবেরই আরেকটি শহর রাওয়ালপি-িকে করা হয় সশস্ত্রবাহিনীর হেডকোয়ার্টার। এসব সিদ্ধান্তের কারণে কেবল আন্তঃপ্রদেশের মধ্যে বিরোধই বৃদ্ধি পায়নি, বরং পূর্ব-বাংলা ও পাঞ্জাবের মধ্যে শত্রুভাব বৃদ্ধি পায়।
দেশভাগের পরপরই যে-আইনসভা গঠিত হয় সেখানে ৬৯টি আসনের মধ্যে পূর্ব-বাংলার ছিল ৪৪টি, যা নতুন পদ্ধতিতে পাঞ্জাব দ্বারা নির্ধারিত হত। পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান একক যুক্তাংশ পদ্ধতি ভেঙে সংশোধন করার উদ্যোগ নেন। বেসামরিক সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পদ্ধতি তৈরি হয়। এই পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিটি প্রদেশ জনসংখ্যার ভিত্তিতে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে; এতে ৩১৩টি (১৩টি মহিলা) আসনের জাতীয় আইনসভায় পূর্ব-বাংলার শতকরা ৫৬-ভাগ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়।
দুই অংশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। বিজ্ঞজনরা বলছেন, ‘পূর্ব-বাংলার একমাত্র বিকল্পই হচ্ছে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করা বা পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের সঙ্গে শিথিল ফডোরেশন সৃষ্টি করা।’ তবে বাঙালিরা ব্যাকুলভাবে চায়, পূর্ব-বাংলার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন আদায় করতে।
স্বশাসন বা স্বরাজ যাই বলা হোক-না কেন তাই তারা চায়। যদি বাঙালিকে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে, নিজগৃহে নিজেই প্রভু, তবে তারা পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকার-ব্যবস্থা মেনে নেবে, তবে তা হতে হবে দুর্বল এবং পূর্ব-বাংলার আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বিভক্ত ভূখ-ে গঠিত বহুজাতিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎই নির্ভর করছে উপযুক্ত শিথিল ফেডারেল কাঠামোর উপর। আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক চেতনাকে মর্যাদা দিতে হবে। একে-অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দেশবিভাগ হয়েছিল মুসলমান-অধ্যুষিত প্রদেশগুলোর ওপর বাঙালির আধিপত্যের ভয় থেকে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে পাকিস্তান-আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব-বাংলার দাবিগুলোর মিল ছিল, যেমন: ভাষাকে রক্ষা করা, আইনসভা ও চাকরিতে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা, ফেডারেল কাঠোমো স্থাপন করা, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক ক্ষেত্রে অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতাশীল করা, ইত্যাদি বিষয়।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম এই রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা দুটো অঞ্চলকে একত্রে ধরে রাখার যে-আপোষের নীতি অবলম্বন করে তা ব্যর্থ নীতি; কারণ দুটো অঞ্চলের মধ্যে কোনোরকম স্বার্থের মিলন নেই, পারস্পরিক নির্ভরতা তো নেই, বরং ভূপ্রকৃতি-ঐতিহ্য-সভ্যতা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি-ভাষা-খাদ্যাভ্যাসে অমিল, ধর্মও একত্রে ধরে রাখতে অক্ষম, কারণ ইসলাম কোনো ঐক্যের শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তা প্রমাণিত হচ্ছে, পাকিস্তানেও। অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক কোনো ক্ষেত্রেই আধুনিক রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সমরনায়করা ২৪ বছর ধরে একটি স্থিতিশীল ও স্থায়ী গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থা চালু রাখতে অক্ষম হওয়ায় ১৯৭১-এর সঙ্কট সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সবসময়ই রোগগ্রস্ত ছিল; তবে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে তার অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই। এছাড়া পাকিস্তানের দুটো অংশের মধ্যে সবকিছুতেই বৈষম্য থাকায় ১৯৭১-এর সঙ্কট সমাধান করা অসম্ভব। একমাত্র সমাধানই হচ্ছে পাকিস্তানকে দুই ভাগে বিভক্ত করা। দীর্ঘদিনের সংঘাত জমতে জমতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তা অগ্নিয়গিরীর মতো বিস্ফোরিত হয়। অবশ্য এর জন্য পাকিস্তানের শাসনগোষ্ঠী ও সমরনায়করাই দায়ী।

[  সৈয়দ আবুল মকসুদ, ভাসানী (মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন, কর্মকা-, রাজনীতি ও দর্শন), প্রথম খ-, ১৯৮৬।
  স্টাটিসক্যাল বুলেটিন, ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯।
  নিউ স্টেটসম্যান, ১২ই মার্চ ১৯৭১।

  Dawn, 9th January 1956.
  Reports of the Advisory Panels for the Fourth Five Year Plan 1970-75, Vol. 1, Pakistan.
  Reports of the Advisory Panels for the Fourth Five Year Plan 1970-75, Vol. 1, Pakistan.
  Reports of the Advisory Panels for the Fourth Five Year Plan 1970-75, Vol. 1, Pakistan.
  Reports of the Advisory Panels for the Fourth Five Year Plan 1970-75, Vol. 1, Pakistan.

[1] K. Callard, Pakistan: A Political Study, London, 1975.

দি টাইমস, ১০ই মার্চ ১৯৭১।
দি টেলিগ্রাফ, ১০ই মার্চ ১৯৭১।]

মন্তব্যসমূহ

উর্ধ্বকমা রবি এর ছবি

মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ লেখাটাই পড়ব Smile লেখককে অনেক ধন্যবাদ