আমাদের বাংলা স্যার

Nuzmus Sadat Sompod এর ছবি

আমাদের বাংলা শিক্ষক, তার সম্পর্কে বলতে গেলে একটা কথায় বলতে হয় তিনি একেবারে বাংলা শিক্ষকের মতই ছিলেন।
তিনি যখন আমাদের কোন চরিত্র নিয়ে পড়াতেন, তখন তিনি যেন সেই চরিত্রকে তার চোখের সামনে  দেখতে পারতেন। তিনি এমনভাবে বর্ণনা করতেন যেন তিনি তার সাথে কয়েকদিন থেকে এসেছেন।

আমি স্যারের ভাষ্যমতে তার বর্ণনা দেই; তিনি আমাদের বাংলা শিক্ষক ছিলেন। তাহার মধ্যে তেমন কোন বৈচিত্র্য ছিল না। তাহার মাথার চুলগুলো পরিপাটি করিয়া একপাশে ফেলিয়া রাখিতেন। বাংলার শিক্ষক তবে তাহাকে কখনও পাঞ্জাবি পড়িতে দেখিনি। তবে তাহার মাঝে একটা বৈচিত্র্য  ছিল। তিনি বড় ভালো কবিতাবৃতি করিতে পারিতেন। ইহাকে   বৈচিত্র্য বলা যাবে কিনা জানিনা। হয়তো সকল বাংলা শিক্ষক ইহা ভালভাবেই পারেন।

স্যার শুধু ভালো কবিতাবৃতি করতে পারতেন তা না। তিনি লোক হাসতেও ওস্তাদ ছিলেন। বাড়ি থেকে যেন সাজিয়ে নিয়ে আসতেন, আমাদের ক্লাসে কী বলবেন। একদিন এসে বললেন, আজ টাইটা পড়ে আসলাম না। সামনে বসা কতিপয় ছাত্রছাত্রী জিজ্ঞেস করল, কেন?
স্যার বলল, নেই তাই।

স্যার একটা কবিতা আমাদের ক্লাসে প্রায়-প্রায়ই আবৃতি করতেন। কবিতাটা সম্ভবত চণ্ডিদাসের। এতবার শুনেছি যে প্রথম কয়েক লাইন আমার এখনও  মনে আছে-

সই, কেমনে ধরিব হিয়া?
আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যায়
আমার আঙ্গিনা দিয়া!
সে বঁধু কালিয়া না চায় ফিরিয়া
এমতি করিল কে?
আমার অন্তর যেমন করিছে
তেমনি হউক সে!

এই কবিতার কারণেই হোক  আর অন্য কারণেই হোক। আমাদের বান্ধবী- মহলে স্যারের সম্পর্কে একটা গুজব চালু ছিল। গুজবটা থাকার পেছনে অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল, স্যার ছিলেন ব্যাচেলর।

স্যার নিজে আমাদের বিনোদনের অনেক ব্যবস্থা  করতেন। কিন্তু  তাছাড়াও তিনি নানা ভাবে বিনোদন খোঁড়াক  হতেন। একটা ঘটনা বলি। এটা আমরা অন্য স্যারের থেকে শুনেছি।
বাংলা স্যার একদিন ঐ স্যারের কাছে কয়েকটা ছবি দিয়ে বললেন দেখেনতো এর মাঝে কাকে পছন্দ হয়। আসলে ছবিগুলো ছিল স্যারের বিয়ের পাত্রীর।
পাত্রী পছন্দ করে দেওয়ার জন্য  কলিগকে বলবে অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু  অস্বাভাবিক যেটা সেটা হল, সবগুলো ছবিই ছিল একজনের। বিভিন্ন ভঙ্গিতে ওঠা ছবি, স্যার বুঝতেই পারেনি যে এইগুলো আলাদা কোন মেয়ে না একজনই।

স্যার সম্পর্কে একটা কথা আমার খুব ভালো মনে আছে। একদিন আমি কলেজ থেকে ফিরছি একটা ছেলে আমার পিছু নিয়েছে। ছেলেটা কয়েকদিন ধরেই আমাকে বিরক্ত করছিল। ঠিক বিরক্ত করা বলা চলে না। কেননা ভদ্রভাবেই সে আমাকে প্রেম নিবেদন করছিল।
একটু ফাঁকা রাস্তায় আসতেই  আমাকে দাড়াতে বলল।

ছেলেটা কাছে আসতেই দেখলাম তার হাতে একটা ব্লেড। সে বলা শুরু করল, ‘ভেবেছ, তোমার সাথে আমি ফাজলামি করছি। তোমার ধারনা ভুল। বিশ্বাস না করলে এ দিকে দেখ। এই বলে ব্লেড দিয়ে হাতে পোঁচ দিতে লাগল। দুই-তিন বার পোঁচ দেওয়ার পরেও যখন রক্ত বের হচ্ছিল-না। তখন তার মাথায় খুন চেপে গেল। সে ক্রমাগত ফেসাতে লাগল। আর রক্তও ঝরতে লাগল।
আমি মনে হয় কাটখোট্টা ধরনের মেয়ে। যে কোন মেয়ে এ বিষয়টা দেখলে নার্ভাস হয়ে যেত। আমি স্বাভাবিক ভাবে তার হাত থেকে ব্লেডটা নিয়ে ভেঙ্গে ফেললাম। ব্লেড ভাঙ্গতে গিয়ে নিজের আঙ্গুলটাও কেটে গেল।

এরকম সময় স্যার রিক্সা নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি রিক্সা থেকে নেমে আমাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। আমার অল্প কেটেছিল একটা ছোট ব্যান্ডেজ লাগিয়ে চলে আসলাম। ছেলেটার হাতে মনে  হয় সেলাই দিতে হয়েছিল। ড্রেসিং করিয়ে স্যার তার নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। যাতে ছেলেটার বাড়িতে ব্যাপারটা জানতে না পারে।
ছেলেটা আর আমাকে কখনও বিরক্ত করেনি।

এত বড়  একটা কাণ্ড ঘটানোর পরও যে মেয়ে রেসপন্স করে না , তার পেছনে থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। এখানে আমার কোন দোষ নেই। আমি নিরুপায় ছিলাম। বাবা-মা ছিলেন না। মামার বাড়িতে থাকতাম। এরকম সময় এরকম প্রস্তাবে রাজি হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তারপর বছর-খানিকের মত চলে গেছে। মামা বদলি হয়ে অন্য এলাকায় এসেছেন। ইন্টার পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ হলেও, কোথাও ভর্তি হতে পারলাম না। তাই মামা মামীর কথা মত ঘাড় থেকে আপদ বিদায় করতে চাইলেন। আজ আমার বিয়ে হয়েছে, কাকতালীয়-ভাবে এই বিয়ের বর আমাদের বাংলা স্যার।
মামা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এসে আমাকে ডেকে বললেন, ‘মা কিছু মনে করিস না। আজ তোকে দেখতে আসবে, সম্ভবত আজই বিয়ে হয়ে যাবে। ধুম-ধাম করার সামর্থ্য আমার নেই।
নিজের বিয়ের কথা শোনার পর কিরূপ  অনুভূতি হওয়া উচিৎ বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এটাই বুঝতে পারছিলাম যে আমার  মানসিক  অবস্থা ঠিক বিয়ের কনের মত না।
হয়তো এটাই সত্যি মা বেঁচে না থাকার দরুন, আমার মানসিক বিকাশ ঠিক মত হয়নি। আর এতিম হওয়াই, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। তাই এরকম পরিস্থিতির সাথে আমি খুব একটা পরিচিত না।

বিয়ে হয়ে যাবে। সম্ভবত এখান থেকে চলে যাব। তার জন্য মন খারাপ  হওয়া উচিৎ। কিন্তু হচ্ছে না। আসলে এদের প্রতি আমার মনে কোন মায়াই জন্মায়নি। মন খারাপ অবশ্য হচ্ছে, কিন্তু অন্য কারণে। বিয়ের কনের মত অনুভূতি হচ্ছে না তাই।
ছোট  মামাতো বোনটা এসে বলল, আপু আজ নাকি তোমার বিয়ে।
-হুম
-তোমার বরের নাকি বয়স একটু বেশি।
ও ছোট মানুষ বুঝতে পারেনি। মামা-মামী বলাবলি করেছে সেখান থেকে  শুনেছে। বাবা-মার জন্য সত্যিই মন খারাপ হল। হয়ত বাবা মা বেঁচে থাকলে এরকম হত না।
আমি যখন বরপক্ষের সামনে গেলাম, তখন স্যারকে দেখে  সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। যখন বুঝতে পারলাম বিয়ের পাত্র স্যারই, তখন নিজের অজান্তেই মনের ভিতর কৌতুকবোধ জন্ম নিলো।

আজকে স্যার আর আমার একত্রিত জীবনের প্রথম রাত। স্যার মনে হয় একটু অস্বস্তিবোধ করছেন। তিনি অবশ্যই এ রাতে নিজের সঙ্গী হিসেবে তার কোন ছাত্রীকে কল্পনা করেননি।
আমিই তার অস্বস্তি ভাঙ্গার জন্য বললাম। ঐ কবিতাটা একবার শোনান।
-না, আজ মনে হয় মান বিষয়ক পদ ভাল যাবে না। তারচেয়ে বরং এটা শোন-

পিরীতি নগরে
                                             বসতি করিবো
                            পিরীতে বাধিব ঘর
পিরীতি দেখিয়া
                                           পড়শী করিবো
                            তাবিনে সকলি পর
পিরীতি ঘরের
                                         কবাট  করিবো
                                 পিরীতে বাঁধিব চাল
পিরীতি মজিয়া
                                         সদাই থাকিব
                                    পিরীতে গোঙ্গাব কাল। ।

বি দ্রঃ- গল্পটি কাল্পনিক। কারও সাথে মিলে গেলে তা কাকতালীয়। আমার গল্পে এটা না লিখলেও চলে,  আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি না। তবে আমি এখনও কলেজে পড়ি, এবং আমার বাংলা স্যার আছে।
* গল্পে  উল্লেখিত দুটি পদই দ্বিজ  চণ্ডীদাসের। (মজার ব্যাপার হল মধ্যযুগে পাওয়া একাধিক বাঙ্গালী কবির নাম  চণ্ডীদাস)।

ভোট: 
Average: 7.7 (3 votes)