অনুপ্রাণন'এর এগিয়ে চলা

আবু এম ইউসুফ এর ছবি

অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার ফেব্রুয়ারী-এপ্রিল'২০১৩ সংখ্যাটি এখন পাওয়া যাচ্ছে বাংলা একাডেমী অমর একুশে বই মেলার লিট্যাল ম্যগ চত্বরে। নতুন প্রাণের স্পন্দনকে সঙ্গী করে, ‘অনুপ্রাণন’ ১৪১৯ এর ১৭ কার্তিক তার সুচনা সংখ্যায় তারুন্যের উচ্ছাসে ভরপুর নবীনদের লেখায় সমৃদ্ধ ও আলোকিত হয়ে যে পথ চলা শুরু করে, এখন তার এগিয়ে চলার প্রশস্ত সোপান। ‘অনুপ্রাণন’এর সুচনা সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কক্সবাজার, ঢাকায় এবং সিলেটে। বিশিষ্ট কবি নুরুল হূদা, কবি কামরুল হাসান ও কবি তুষার কর অনুপ্রাণনের সুচনা সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানগুলিতে উপস্থিত থেকে এবং মোড়ক উন্মোচন করে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। এসব অনুষ্ঠানে যোগ দেয় এক ঝাঁক তরুন। নবীন লেখক ও পাঠকদের পদচারনায় অনুপ্রাণনের উঠান হয়ে ওঠে মুখরিত। ঢাকা সহ সারা দেশ থেকে সুচনা সংখ্যার একটি কপি পাওয়ার জন্য অনুরোধ আসতে থাকে ই-মেইলে, ফোনে, ফেইসবুকে। প্রত্যেকের অনুরোধে ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে এক একটি সংখ্যা এক একটি আগ্রহী পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা সচেষ্ট থাকি। আমাদের বিকাশ একাউন্টে প্রত্যেকে মূল্য পরিশোধ করতে থাকেন যথাসময়ে। অনুপ্রাণনের সুচনা সংখ্যায় যাদের আমরা সাথে পেয়েছি, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায়, প্রকাশনা কাজের সহায়তা ও সঙ্ঘটনে, আর যারা ছিলেন সুচনা সঙ্খ্যাটির লেখক ও পাঠক - সবাইকে জানাই আমাদের প্রাণঢালা কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা। আমাদের আগামীর পথ চলায় এভাবেই আমরা সবসময় তাদের সবাইকে সঙ্গে পাবো এবং আরো অনেক নতুন ও নবীন লেখকদের অব্যহতভাবেই আমরা আমাদের পাশে পাব, এই কামনাই করি।  

ফেব্রুয়ারীর মহান ভাষা আন্দোলনকে স্মরণের এই মাসে প্রকাশিত হল অনুপ্রাণনের দ্বিতীয় সংখ্যা। শহীদের শোক, মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ ও উচ্ছ্বাস এবং সেই পথ ধরে হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙ্গালী জাতির মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার ৪১ বছর পর আজ বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে অর্জন করার হয়তো অনেক কিছুই ছিল অথচ যা আমরা অর্জন করতে পারিনি। নতুন করে ঔপনিবেশিক মানসিকতার অনুপ্রবেশ বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে চালু ও অপরিহার্য্য করার লক্ষ্য অর্জনে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে। এই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদেরকে করতেই হয় যে, বিশ্বে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা ভাষাভাষীদের সংখ্যা চতুর্থ স্থানে থাকলেও গুরুত্বের দিক দিয়ে কি বাংলা ভাষা বিশ্বে তার যথাযথ স্থানটি অর্জন করতে পেরেছে? বিশ্বায়নের প্রতিযোগীতায় আন্তর্জাতিকভাবে যোগ্য স্থান করে নেয়ার জন্য বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কতটুকু প্রস্তুত? বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে বাংলা ভাষার স্থান সম্মানের সাথে ধরে রাখার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? ২১ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করতে পেরেছে, এটা আমাদের গর্বের বিষয় কিন্তু জাতিসঙ্ঘের দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করে বসে থাকলে চলবে না কেননা সেই দাবী অর্জনের জন্য বাংলা ভাষার আন্তর্জাতিক উপস্থিতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে ঘাটতিগুলো পূরণ করার কাজ বাকী রয়ে গেছে সেই কাজগুলি সম্পাদন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য দরকার, (১)বাংলাভাষার প্রতিটি শব্দের নিখুঁত, আধুনিক ও প্রমিত বানান, ধ্বনি ও উচ্চারণ নির্ধারণ এবং উচ্চারণসহ লিখিত ও ডিজিটাল অভিধান রচনা করা, (২) বাংলা লিপি ও বর্ণমালার সংখ্যা, শ্রেনি, ধ্বনি ও উচ্চারণ আধুনিকীকরণ, সংস্কার ও প্রমিতকরণ করা, (৩)বাংলা লিপির প্রমিত গঠন নির্ধারণ করা, (৪)বাংলা লেখার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা, (৫)বাংলা ভাষায় শব্দ প্রক্রিয়া, দলিল, গবেষনা জার্নাল ও পুস্তক প্রকাশনা, হিসাব ও অন্যান্য পেশাগত ব্যবহারিক কাজ, বানিজ্য ও যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রচলিত কাজের উপযোগী  কম্পিউটার, অন্তর্জাল ও মোবাইল ফোনের জন্য উপযুক্ত সফটওয়্যার বাংলা সকল ফন্টে সহজে রূপান্তরযোগ্য বাংলা ইউনিকোড ওপেন টাইপ ইউ.আই ফন্ট তৈরি করা, (৬)অভিন্ন বাংলা কম্পিউটার কিবোর্ড/কিপ্যাড নির্ধারণ করা, (৭)বাংলা বানান শোধন সফ়্টওয়্যার (স্পেলচেকার) নির্মাণ করা, (৮)বাংলা যুক্তবর্ণের গঠন ও লেখার পদ্ধতি নির্ধারণ করা, (৯) ডিজিটাল আঙ্গিকে ব্যবহার উপযুক্ত বাংলা ইঞ্জিনিয়ারিং(Engineering) বর্ণমালা ও ভাষার কারিগরি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা, (১০) সকল তাত্বিক, পেশা ও ব্যবহারিক জ্ঞান ও শিক্ষার শাখা ও উপশাখার তৃত্বীয় (Tertiary) ধাপ পর্যন্ত এবং উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা উপযোগী পাঠ্য ও পাঠ-সহযোগী অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশের জন্য পূর্নাঙ্গ প্রমিত পরিভাষা অভিধান নির্মাণ করা, (১১)বাংলাভাষা, লিপি ও বর্ণমালার  উদ্ভব-ইতিহাস উদ্ধার করা ও প্রমিতকরণ করা, প্রত্নেষণা তথা আবীত(অতীত) গবেষণা, বাংলাভাষার প্রসার, প্রচার, বিকাশ, উন্নয়ন ও গবেষণা ইত্যাদি কাজগুলি পরিচালনা করা। (১২) আন্তর্জাতিক ভাষা ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে অবিলম্বে বাংলাদেশে বসবারত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষার লিপি, বর্ণমালা, লেখন-পদ্ধতি, শব্দকোষ ও অন্ততপক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার জন্য পাঠ্য বই প্রকাশের সুনির্দিষ্ট প্রকল্প হাতে নেয়া।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিকভাবে যে ইংরেজি ভাষার আজ এত রমরমা, তা এককালে ছিল খুবই গেঁয়ো এক ভাষা পরে প্রবল উদ্যোগ, আন্দোলনসনিষ্ঠ প্রয়াসের ফলেই বিশ্ব পরিসরে আজ তা আজকের এই শক্তিশালী জায়গায় এসে পৌঁছেছে, তবুও এই সনিষ্ঠ প্রয়াস তাদের আজ অব্দি সমান বজায় আছে। আমাদের দেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের নানা উদ্যোগের মধ্যে কি আমরা এই চলমান সনিষ্ঠ প্রয়াসের প্রতিফলন দেখতে পাই না? পক্ষান্তরে, আমরা গত ৪১ বছরে আমাদের প্রচেষ্টার সার্বক্ষণিক  চলমানতা ও সনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে যে ঘাটতি দেখাচ্ছি তাতে করে ইংরেজী ও হিন্দী ভাষার সাথে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পরে আমরা কি আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাকে ক্রমে ক্রমে অসম্মানজনক এক পরিনতির দিকেই ঠেলে দিচ্ছি না ?

দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘নরগোষ্ঠী’ ও ‘সম্প্রদায়’ কেন্দ্রিক চলমান বিতর্ক রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি অনাকাঙ্খিত মনস্তাত্বিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক নরগোষ্ঠীবাদী তত্ব ও বিদ্যার উদ্ভব হয় ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ও উপনিবেশবাদী পরিবেশে। এই তত্ব আমাদের শেখায় যে, মনুষ্যজাতি পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশ ও অঞ্চলে বিভিন্ন নরগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েই উদ্ভুত হয়েছে। এই মতবাদ, চেতনায় প্রোথিত করার প্রয়াস পায় যে, গাত্রবর্ণ, শারীরিক গঠন ও আচার-ব্যবহারে ভিন্নতার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে বিভাজিত এই নরগোষ্ঠীর পরস্পরের মাঝে বংশ ও গোষ্ঠীগতভাবেই বুদ্ধি, মেধা, নৈতিকতাবোধ ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিকাশের ক্ষেত্রে স্তরের ভিন্নতা নির্ধারিত। আর, এই স্তর ভিন্নতা কোন নরগোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক ও জৈবিক কারনেই উন্নত এবং কোন নরগোষ্ঠীকে অনুন্নত গোষ্ঠী অথবা জাতি হিসাবে সৃষ্টি করেছে। তাই, এটা যেন প্রাকৃতিকভাবেই নির্ধারিত যে, একটি উন্নত নরগোষ্ঠী একটি অনুন্নত নরগোষ্ঠীকে শাসন করবে। এই সকল ভ্রান্ত তত্ব ও বিদ্যার কুফলে মধ্যযূগের বর্বরতা নতুন চেহারায় সারা বিশ্বে দাসত্ব, বর্ণবাদী হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ ও গনহত্যার বীভৎস রূপ নিয়ে মানবিক বিপর্যয় প্রসারিত করে প্রবেশ করেছে ইতিহাসের আধুনিক কালের অধ্যায়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই মতবাদের চূড়ান্ত বিকৃতরূপে তথাকথিত নরডিক আর্য্যবাদ সৃষ্ট রক্ত-ধর্মবাদীতার যূপকাষ্ঠে বলি হয় নারী ও শিশুসহ লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষ। তার ধারাবাহিকতা দেখি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী পাঞ্জাবী সামরিক চক্র ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক হিংসায় প্ররোচিত বর্বর গনহত্যায়। 

কিন্তু, সর্বাধুনিক জীববিজ্ঞান বিশেষ করে জীনবিজ্ঞান এটা প্রমান করতে সমর্থ হয়েছে যে, সারাবিশ্বে এইভাবে শ্রেণিকৃত ভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মাঝে জীনগত পার্থক্য মাত্র শতকরা ছয় ভাগ এবং এই শতকরা ছয়ভাগ পার্থক্যের মাঝে একই অভিন্ন নরগোষ্ঠীর মাঝে প্রজননশাস্ত্রীয় কারনেই জীনগত এই পার্থক্য ওই শতকরা  ছয়ভাগের শতকরা পঁচাশি ভাগ অথচ দুইটি ভিন্ন নরগোষ্ঠীর মাঝে এই পার্থক্য শতকরা ছয় ভাগ পার্থক্যের শতকরা পনের ভাগ মাত্র। অর্থাৎ বাস্তবে মানুষ একটি অভিন্ন প্রাণী প্রজাতি এবং প্রাকৃতিক কারনে ভিন্ন নরগোষ্ঠীগত যেটূকু পার্থক্য রয়েছে সেটুকু খুবই সামান্য এবং এর গভীরতা ‘ত্বকের পুরুত্বের’ চাইতে বেশী নয়। যা কিনা সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার বছর ভিন্ন জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারনে। তাই, উল্লেখিত এইসকল বাহ্যিক ভিন্নতার সাথে বুদ্ধি, মেধা অথবা শারীরিক যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিন্নতা যে প্রাকৃতিক, জৈবিক অথবা বংশগত কারনে সৃষ্ট, এই মতবাদ সম্পূর্ণ ভুল বলেই প্রমানিত হয়েছে।  

অর্থাৎ এক একটি জনগোষ্ঠীর সাথে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাঝে যে ভিন্নতা আমরা দেখতে পাই, সেটা মূলত ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারনে বিরাজমান এবং এই ভিন্নতা সম্পূর্ণভাবেই সমাজসৃষ্ট। এই ভিন্নতার মাঝে অভিন্নতার উপাদানই বেশী। প্রেম, সুন্দর, সাম্য ও  সহমর্মিতা; মানবিক চেতনা ও মূল্যবোধের এই অভিন্ন উপাদানগুলি শক্তিশালী করে মানবতাবিরোধী ভেদ চিন্তা ও চেতনাকে পরাজিত করার মধ্য দিয়েই মানুষ তার ভবিষ্যৎ নির্মান করতে চায়। এই কারনেই, গোষ্ঠীগত, সম্প্রদায়গত ও জাতিগত সংকীর্ণ ও পশ্চাদপদ চিন্তা ও চেতনাগুলোকে বর্জন করে মুক্ত, উদার, গনতান্ত্রিক ও অসম্প্রাদায়িক চেতনা, যে চেতনাটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েও উৎসারিত, সেই বৈশ্বিক ও সর্বজনীন মানবতাবাদী চিন্তা ও চেতনাকে ধারণ করেই আমরা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই। এই কারনেই আমাদের মানচিত্রে যে ভৌগলিক দেয়ালটি রয়েছে, সেই দেয়ালটি আমাদের চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে যেমন প্রতিবন্ধকতার দেয়াল হয় না, আবার এই দেয়াল অতিক্রম করে আমাদের জাতীয় মানবতাবাদী দর্শন বিরোধী কোন অপশক্তি ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারিত করলে সেটাও আমরা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শারীরিক গঠনের মিশ্রতা ও ত্বকের বর্ণের বৈশিষ্টের বিচারে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী বৃহত্তর অস্ট্রিক নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হিসাবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। যে নৃগোষ্ঠীর বসবাস মধ্য ও দক্ষিন এশিয়া, দক্ষিন চীন ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরাও এই নরগোত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে প্রমান পাওয়া যায়। সুতরাং, দক্ষিন এশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের ভূসীমার ক্ষুদ্র পরিসরে নৃগোষ্ঠী-কেন্দ্রিক বিতর্কের আদৌ কোন সুযোগ আছে কিনা- এটাই প্রশ্ন। তাছাড়া, আমরা যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চাই তার মধ্যে ধর্ম, ভাষা অথবা সাংস্কৃতিক বিচিত্রতা থাকতে কোন বাধা নেই কিন্তু তার উপর ভিত্তি করে কোন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ভেদাভেদের স্থান থাকতে পারে না, কেননা একটি উদার গনতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে দেশের প্রতিটি নাগরিক একান্ত ব্যক্তিগতভাবেই সম-স্বীকৃতির দাবিদার। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান হওয়া জরুরী। তাই সমাজের প্রতিটি পক্ষকে, প্রতিটি সদস্যকে এই  বিষয়টি বুঝে নেয়া দরকার যে, কারো সম-অধিকার খর্ব করে এইরূপ কোন মানসিকতা সংরক্ষন, বক্তব্য প্রদান অথবা কোন কার্যকলাপ, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী এবং যা কিনা আমাদের রাষ্ট্রীয় ঐক্যকেই অহেতুক দুর্বল করবে।  

বাংলাদেশের নবীন ও তরুণ শিল্পী ও লেখকেরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে বৈষম্যহীন একটি শক্তিশালী মানবিক সমাজ গড়ার এই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুকুল শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল গড়ে তোলার কাজটি  নিরলস ও সনিষ্ঠভাবে সম্পাদন করতে কালানুক্রমে প্রতিটি ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সকল শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির উদ্যোগে সক্রিয়ভাবেই নিয়োজিত থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। নতুন ও নবীনেরাই পারে জাতীয় ও বিশ্ব পরিমন্ডলে প্রচলিত তত্ব, মত ও মতবাদের ধারাবাহিক গবেষণা কার্য্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তার যৌক্তিক পুনঃ বিশ্লেষণসহ সঠিকটিকে গ্রহন ও ভুলগুলোকে বর্জনের মাধ্যমে মনুষ্যজাতিতে শান্তি, সাম্য ও সর্বজনীন ঐক্যের মানবতাবাদী নৈতিক মুল্যবোধের ধারাটিকে শক্তিশালী করতে সমর্থ এবং ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী সঠিক ও সৃষ্টিশীল ব্যখ্যাসমুহ উপস্থাপন করতে। অন্বেষণের এই পথটি ধরেই ‘অনুপ্রাণন’ দেশের তরুণ ও নবীন লেখক ও শিল্পীদের হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাবে, এটাই অনুপ্রাণনের অঙ্গীকার।

বাংলা সাহিত্যে অসম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার ধারাটি যারা প্রোথিত করেছেন তাদের মাঝে মধ্যযূগের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ্‌কে  অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় আমরা বিশেষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী প্রকাশ করে তাঁর জীবনী ও তাঁর লেখার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়াস পাঠকদের বিশেষ করে নবীন পাঠকদের বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করবে। কিছুদিন আগেই আমাদের দেশের সাহিত্য অঙ্গনের বরেন্য ব্যক্তিত্ব আব্দুশ শাকুর’কে আমরা হারিয়েছি। বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে তাঁর হাত ধরে অনেক লেখক-সাহিত্যিক বিচরনের জমিন খুঁজে পেয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী- একজন জ্ঞানী শিক্ষকের মতই তিনি নবীন লেখকদের পথ পরিদর্শকের কাজটি নীরবে করে গেছেন। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে, একনজরে তার কর্মজীবনের একটি চিত্র পত্রিকার এই সীমাবদ্ধ পরিসরে তুলে ধরা, আমাদের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। পাশাপাশি আমরা স্মরণ করছি সদ্য প্রয়াত পাঠকপ্রিয় সাহিত্যিক হূমায়ুন আহমেদ’কে। যার সাহিত্যকর্মের উপর একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিল্প সৃষ্টিতে লেখকের সংবেদনশীল মনের মুক্ত প্রকাশ ও আনন্দ বিতরনের কর্মের বাইরে হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসে চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি নিয়ে তার সাহিত্যকর্মের উপর বিস্তর আলোচনা সমালোচনা আছে। কোন সুনির্দিষ্ট মতবাদের বাধা ছকের বাইরে এসেও মুক্তভাবে এইসব আলোচনা ও সামলোচনার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। সমাজ বিচ্ছিন্ন ভাবসমৃদ্ধ সাহিত্যকর্ম নান্দনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী না হলে, পাঠক ও লেখকের মধ্যে খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম হতে পারে। ২০১২ সনে বাংলা সাহিত্যের আর একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’কে আমরা হারিয়েছি। অনেকের মতে, বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম নেয়া প্রতিভাবান এই গুনী কবি, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট দুই বাংলা মিলিয়ে একজন অন্যতম সফল কবি হিসাবে জীবনান্দ পরবর্তী কালে তার স্থান সংহত করতে সমর্থ হয়েছেন। তাছাড়া তার লিখিত কাহিনী বরেন্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হওয়ার ফলে তাঁর হাতে ‘অরন্যের দিনরাত্রি’ উপন্যাসটির কাহিনী অবলম্বনে ছায়াছবি নির্মিত হয়। ১৯৭৭ সনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব সুভাষ দত্তকেও আমরা বিগত ২০১২ সনে হারিয়েছি। একজন সফল অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকার হিসাবে তাঁর পদচারনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনকে দীর্ঘদিন আলোকিত করে রেখেছে। বাংলাদেশের কোন একক  চলচ্চিত্রে একযোগে বানিজ্য ও শিল্প সৃষ্টির সফল সংযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি তাঁর অন্যন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেমন রেখেছেন, ১৯৭২ সনের জানুয়ারীতে ঢাকার মিরপুরে পাক হানাদার বাহিনীর দোসরদের গুলিতে নিহত শহীদ জহির রায়হান। যার সাহিত্যকর্মে ও চলচ্চিত্রে সবসময় উঠে এসেছে সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী অপশক্তির ঘৃন্য বর্বরতার আঘাতে বিপন্ন মানবতা এবং সেই সব অপশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামী মানুষের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের সাবলীল, নিখুঁত ও সুনিপুণ চালচিত্র। তাঁর অন্যতম সাহিত্যকর্ম ‘আর কত দিন’ এর উপর আলোচনা অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত করে আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

দেশের সাহিত্য অঙ্গনে সমকালীন দশকগুলোতে এক ঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল, মেধাবী ও সৃষ্টিশীল তরুন ও নবীন কবি নিরলস কর্মের মধ্য দিয়ে তাদের উপস্থিতি সংহত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই সব কবিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত আটজন কবির দশটি করে কবিতা ও তাদের কবিতার উপর আলোচনা অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় একটি অন্যতম সংযোজন। এইভাবে আরো নুতন নুতন  নির্বাচিত কবিদের কবিতাগুচ্ছ প্রকাশের কার্য্যক্রম আমাদের পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে অব্যহত থাকবে। তাছাড়া, নবীনদের লেখা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা-প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, অনুবাদ গল্প ও কবিতা, মুক্তগদ্য, বই ও সাহিত্য ম্যগাজিন নিয়ে আলোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়া ইত্যাদী অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশের লিট্যাল ম্যগাজিন বা ছোট কাগজ, মেধাবী ও প্রতুশ্রুতিশীল নবীন ও উদীয়মান লেখকদের সাহিত্য চর্চার একটি বিরাট ক্ষেত্র। কিন্তু, সাহিত্য চর্চার মান উন্নয়ন, পরিক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা, প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা পালনে নিয়োজিত এই পরিমণ্ডলটিকে আরো সংহত, শক্তিশালী ও প্রসারিত করার জন্য সহযোগীতা ও প্রতিযোগীতার ক্ষেত্রটিও সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন। এই কাজটি করতে চাইলে, পরস্পরের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার উপর গঠনমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা ও সমালোচনা হওয়াটি জরুরী। এর ফলে সারাদেশের তরুন ও নবীন লেখকেরা যেমন পরস্পরের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার সাথে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ পাবে তেমনি দেশের যে অঞ্চলেই থাকুক না কেন, একজন নবীন লেখকের লেখাটি মুল্যায়নের ক্ষেত্রটি সারা দেশে সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ লাভে সক্ষম হতে পারে। অনুপ্রাণন, এই লক্ষ্যে আগামী সংখ্যাগুলোতে তরুন ও নবীন লেখকদের লেখাসমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি, নবীন ও তরুন লেখকদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় প্রকাশিত অপরাপর ম্যগাজিনগুলির প্রকাশনাকর্ম নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রটি বিস্তৃত করতে চায়। আশা করি, এই বিশেষ উদ্যোগটির গুরুত্বটি অনুধাবন করে এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য মুক্তমনে সকলেই এগিয়ে আসবেন।    

ভোট: 
Average: 10 (2 votes)