অচল পত্র -পার্থসারথি চৌধুরী

কালবেলা এর ছবি

অচল পত্র
-পার্থসারথি চৌধুরী

আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু নাকি একদা গাছের প্রাণ-স্পন্দন শোনতে পেলেন। ছোটবেলায় আমাদের কত মুখস্থ করতে হয়েছিল, “গাছেরও প্রাণ আছে”। যথা সময়ে যথাযথ উত্তর নিতে না পারায় স্যারদের হাতে কত যে নিগৃহীত হয়েছি তার বিস্তৃত বর্ণনার প্রয়োজন নেই। কারণ বয়স বাড়ার সাথে সাথে বড় হয়ে গেছি আর বুঝেছি ভাবাবেগ একজন কবিকে মানায় বটে কিন্তু একজন বৈজ্ঞানিককে একেবারেই মানায় না। স্যার জগদীশ চন্দ্র যা‘ই বলুন আসলে গাছের কোনো প্রকার ‘প্রাণ-টান’ নেই। বড়ো-বড়ো গাছ চিড়ে আমরা আমাদের আবশ্যকীয় আসবাবপত্র বানাবো চেয়ার-টেবিল বানাবো দরকার হলে কাঠের ঘর বানাবো রান্নার কাজের জন্য লাকড়ী বানাবো। আমরা কি ব্যক্তিরা জগদীশ চন্দ্র বসুর সমস্যাটা বুঝি কিন্তু তিনি তো আর আমাদের সমস্যাটা বুঝতে পারলেন না। আজকাল রাজনৈতিক দলগুলোর  দলীয় শ্লোগান খুবই মজার এবং কার্য্যকর। ‘নানান জনের নানান মত, সবাই মিলে ঐক্য মত’। এই হবিগঞ্জ শহরে ষ্টেডিয়াম সংলগ্ন একটা ঐতিহাসিক নাম ছিল “শিরীষ তলা”। শিরীষ গাছ না কড়ই গাছ ছিল তা আমি বলতে পারব না। আমরা শিরীষ গাছ বললেও আমার স্যার তৎকালীন বৃন্দাবন মহাবিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক প্রয়াতঃ আব্দ-আল করিম স্যার বলতেন এটি আসলে কড়ই গাছ। তা’ কড়ই আর শিরীষই হোক- এ স্থানটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল মওলানা ভাসানী থেকে শুরু করে মতিয়া চৌধুরী- রাশেদ খান মেনন- খালেদা জিয়া- শেখ হাসিনাসহ আরো অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দের আগমনে। পাকিস্থানী আমলে আওয়ামী লীগের ৬ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৮-৬৯ এর গণআন্দোলনও অভ্যুত্থান এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক মুহুর্তের প্রতিটি দিন এই শিরীষ তলা হয়ে উঠেছিল মুক্তমঞ্চ। বড়ো বড়ো সভা ছাড়াও অনেক ধরণের মুক্তসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে থাকতো শিরীষ তলা। কবি এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এসব অন্ষ্ঠুানে আমার অংশগ্রহণ ছিল অবধারিত। ১৯৮৪ সালে আমার আবেগ আমাকে দিয়ে লিখিয়ে ফেলল আমার দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ “শিরীষ তলার গাঁথা”। আর ১৪০০ সালের শুভ নববর্ষে নতুন শতাব্দীকে বরণ করার জন্য যে প্রলম্বিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল সেটাই ছিল আমার শিরীষ তলার সর্বশেষ অবগাহন। এখন নাকি সেই রামও নেই- সেই অযোধ্যা নেই। আমাদের ধনবান, ভাগ্যবান, স্বাস্থ্যবান সমাজের মানুষদের জন্য বিনোদনের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে শিরীষ তলা নামক স্থানটি। আলো-ঝল-মল স্থানে এখানে স্থাপন করা হয়েছে লন-টেনিস কোর্ট। শিরীষ গাছটি সেই সময় জীবন্ত হয়ে পাতা ঝড়াতে শুরু করে। কোর্ট ভরে যায় পাতায়-পাতায়। টেনিস খেলোয়াড়দের ভীষণ অসুবিধে হয় তাতে। কাজেই প্রকান্ড কাজটিকে কেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। স্রোতের বিরুদ্ধে তো কেউ যেতে চায় না। বড় যে কষ্ট। সেদিন আমিও যেতে পারিনি। তবে গিয়েছিল কেউ-কেউ। হবিগঞ্জের সাংস্কৃতিক-সাহিত্য অঙ্গনের আপোষহীন যোদ্ধা তোফাজ্জল সোহেল, সিদ্দিকী হারুন এবং দীপুল রায় সহ দু’একজন। তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। নানান ধরণের হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। হবিগঞ্জের রথী-মহারথীরা বিভিন্নভাবে তাদেরকে আন্দোলন বিমুখ করার প্রয়াস নেন। অবশেষে শিরীষ গাছটির পতন ঘটানো হয়। গাছটির রক্তস্রোত আমি দেখতে যাইনি। সম্ভবতঃ আচার্য্য বসু দূর আকাশের তারা হয়ে কেঁদেছেন একটি প্রাণকে হত্যার জন্য। একটি শিরীষ গাছের জন্য এত হাহাকার কি আমাকে মানায়? প্রতিদিনই শত শত গাছ কেঁেট ফেলা হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বত্র। তা হলে? হ্যাঁ, আমি আমার স্বার্থের জন্যই কাঁদি। আমার “শিরীষ তলার গাঁথা” এর কি হবে? শিরীষ তলার গাঁথায় ছিল বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, জিয়াউর রহমান, সিরাজ শিকদার, শহীদ আসাদসহ অনেক আবেগী নাম। শিরীষ তলার গাঁথায় ছিল আমার প্রেম-অপ্রেম এর কাহিনী। শিরীষ তলার গাঁথায় ছিল প্রকৃতির কান্না-ভালবাসা-সাহস আর প্রত্যয়ের দৃপ্ত অহংকার। শিরীষ তলার গাঁথায় ছিল কবি দিলওয়ার এর অভিনন্দন পত্র। কবি দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা বলেছিলেন ঃ পার্থ, তুমি শিরীষ তলাকে ঐতিহাসিক করে তুলবে।
এখন আমি কি করব? শিরীষ গাছ নেই। আমার কবিতা গ্রন্থের অস্তিত্ব কি হুমিকর সম্মুখীন নয়? স্যার জগদীশ চন্দ্র বস, আমাকে ক্ষমা করবেন। বৃক্ষের প্রাণ-স্পন্দন কিংবা বৃক্ষেরও জীবন আছে। একথা আমাদেরকে কেন শোনালেন? পৃথিবীটা এমন জানলে আমিতো কোনদিন “শিরীষ তলার গাঁথা” লিখতাম না লিখতাম “টেনিশ তলার গাঁথা”।

২০-২২-০৯

ভোট: 
Average: 9.5 (4 votes)